ভারতে ‘তেলাপোকা’ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছে স্কুলে স্কুলে
আলজাজিরার বিশ্লেষণ
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
‘তেলাপোকা’ আন্দোলন মোদির বিরুদ্ধে স্কুলগুলোকে পরবর্তী যুদ্ধক্ষেত্র বানিয়েছে। তেলাপোকা নেতারা তাদের সমর্থকদের নিকটতম সরকারি স্কুলগুলো নিরীক্ষা করার জন্য বলেছেন। কিন্তু এর শুরুটা হয়েছে একটি হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে।
গত ১৩ আগস্ট, পূর্ব ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বাঁকুড়া জেলার কারিসুন্ডা গ্রামে আব্দুল হাফিজ তার একসময়ের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ফিরে যান। ২৬ বছর বয়সী এই যুবক দেশের স্বল্প-তহবিলপ্রাপ্ত, প্রায়ই জরাজীর্ণ সরকারি স্কুলগুলোর অবস্থা নিরীক্ষা করার জন্য জনপ্রিয় ভারতীয় চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’র একটি প্রচারণার অংশ হিসেবে তার পুরনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়েছিলেন।
কিন্তু বাঁকুড়ায় পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ নেয়। স্কুলে হাফিজের পরিদর্শনের কয়েক ঘণ্টা পর তিনি অভিযোগ করেন যে, মোদির হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) স্থানীয় কর্মীরা তার বাড়িতে এসে তাকে এবং তার বাবা মোহাম্মদ মাফিককে মারধর করেছে। দু’দিন পর, হাফিজের ৫১ বছর বয়সী বাবা আঘাতজনিত কারণে মারা যান।
গত রোববার, বিজেপি-শাসিত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, হামলাকারীরা “বিজেপির সাথে কোনো সম্পর্ক নেই এমন অপরাধী” এবং তিনি ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন।
কিন্তু বাবাকে দাফন করার একদিন পর, হাফিজ আলজাজিরাকে বলেন যে তিনি সরকারি স্কুলগুলোতে জবাবদিহিতা ও সংস্কারের দাবিতে অটল। তিনি বলেন, “আমরা আমার বাবার জন্য ন্যায়বিচারের লড়াই করব, কিন্তু এই হামলাগুলো আমাদের উন্নত শিক্ষার দাবি থেকে বিরত রাখতে পারবে না।”
এই দাবিটি সিজেপির জন্য একটি নতুন সীমারেখা তৈরি করেছে। মোদি ও তার সরকারকে সফলভাবে রক্ষণাত্মক অবস্থানে যেতে বাধ্য করার পর তেলাপোকা পার্টি এখন তাদের পরবর্তী যুদ্ধক্ষেত্র ঘোষণা করেছে সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত স্কুলগুলো।
সিজেপি নেতারা তাদের সমর্থকদের, যারা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নয়াদিল্লির বিক্ষোভে ভিড় জমিয়েছিলেন, তাদের নিকটবর্তী স্কুলগুলো পরিদর্শন করে সেগুলোর অবস্থা নিরীক্ষা করার জন্য অনুরোধ করেছেন।
সিজেপি তাদের ‘স্কুলগুলো ঠিক করো’ অভিযানের জন্য একটি মৌলিক চার-দফা চেকলিস্টকে কেন্দ্র করে কাজ করছে : পানীয় জল ও কার্যকরী শৌচাগার; বিদ্যুৎ ও ব্যবহারযোগ্য শ্রেণিকক্ষ; সীমানা প্রাচীর ও ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা; এবং মধ্যাহ্নভোজ ও শিক্ষকদের উপস্থিতি।
আর হাফিজের বাবার হত্যাকাণ্ড মোদির বিজেপির সুসংগঠিত কাঠামো এবং সাংগঠনিকভাবে দুর্বল ও নবীন সিজেপির মধ্যকার এই লড়াইয়ে আগে থেকেই বিদ্যমান উচ্চ ঝুঁকিকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে বলেছেন, ‘শুধুমাত্র ভালো স্কুলের দাবি করার জন্য মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে, এটা আমার রক্ত গরম করে দেয়।’
‘একটি বিঘœ সৃষ্টিকারী পরিবর্তন’
ককরোচ গোষ্ঠীর একজন সহ-আহ্বায়ক আশুতোষ রাঙ্কা সোমবার হাফিজের পরিবারের সাথে দেখা করার পর আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন যে, দলটি সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণের জন্য চাপ দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে; তবে, হাফিজ তার বাবার নামে একটি স্কুলের নামকরণের অনুরোধ করেন।
পশ্চিম ভারতের রাঙ্কার নিজ রাজ্য রাজস্থানে, দলটি অন্যান্য চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। মোদির বিজেপির নেতৃত্বাধীন রাজস্থান সরকার শিক্ষার্থীদের গোপনীয়তার কথা উল্লেখ করে সরকারি স্কুলে তথাকথিত বহিরাগতদের প্রবেশ এবং ছবি ও ভিডিও তোলার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। রাঙ্কা রাজ্যজুড়ে সিজেপি স্বেচ্ছাসেবকদের পরিদর্শনের ঘোষণা দেয়ার পরই সরকারের এই বিজ্ঞপ্তিটি আসে, যেখানে স্কুল কর্তৃপক্ষকে এই ধরনের সমীক্ষার বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়।
শিক্ষানীতি বিশেষজ্ঞ সামিনা বানো, যিনি ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্যকে সংস্কারের বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন, আলজাজিরাকে তিনি বলেন, ‘মূলত ব্যবস্থাটিই এখন আর জনগণের জন্য কাজ করছে না’। বানো বলেন, গত ১০ বছরে তিনি ‘হঠাৎ পরিদর্শনের সময় দায়িত্বে থাকা মদ্যপ শিক্ষক’, গ্রামীণ এলাকায় ভুয়া নিয়োগ যেখানে অনেক শিক্ষক যেতে চান না এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা দেখেছেন, যা তার মতে ভারতীয় সরকারি স্কুল ব্যবস্থায় একটি সাধারণ ঘটনা। সরকারি স্কুলগুলোতে শিক্ষার অবস্থা খুবই শোচনীয়। এর জন্য একটি আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন।
বানো আরো বলেন, ‘আসল সমস্যা হলো শিক্ষার মান, শেখার ফলাফল ও খাবার।’ সংস্কারের দাবিগুলোকে মূলধারার রাজনীতিতে নিয়ে আসার জন্য তিনি ‘ককরোচ’ চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীকে কৃতিত্ব দেন। তিনি বলেন, তারা বিষয়টি আলোচনায় আনছে, কিন্তু মানুষ যখন দাবি জানাতে শুরু করবে, তখন প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরির প্রয়োজন হবে, আর সেটা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি কাজ। ভারতে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবার একটি আগ্রহ তৈরি হতে হবে।
‘শক্তির সদ্ব্যবহার’
নয়াদিল্লিতে জেন জি বিক্ষোভকারীরা রাস্তা থেকে ফিরে আসার পর, ইন্টারনেট বিভিন্ন রাজ্যজুড়ে স্কুলগামী শিশুদের উন্নত সুযোগ-সুবিধার দাবির ভিডিওতে ভরে গিয়েছিল। তারা রাস্তা অবরোধ করছিল, স্থানীয় প্রশাসনিক কার্যালয় প্রদক্ষিণ করছিল এবং আমলাদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছিল। নয়াদিল্লির রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিম আলী বলেন, ‘ককরোচ পার্টি’ এই গতিকে কাজে লাগিয়ে তাদের স্মার্ট গণসংহতি কৌশলের পরবর্তী ধাপ ঘোষণা করেছে, এটি সোস্যাল মিডিয়াকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে তাদের শক্তিরই একটি প্রকাশ। অনেক স্বেচ্ছাসেবক ছাড়াই, তারা তৃণমূল স্তরের কাজ সোশ্যাল মিডিয়ার অনুসারীদের দিয়েই করিয়ে নিতে পারে।
আলী বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ার শক্তিকে কাজে লাগিয়ে, যার প্রভাব এখন ভারতের প্রত্যন্ত কোণায়ও অনুভূত হয়, তেলাপোকা পার্টি একটি আন্দোলনের সাংগঠনিক খরচ নাটকীয়ভাবে কমিয়ে এনেছে। কিন্তু আলী সতর্ক করে দেন যে, রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক দক্ষতা, প্রতিবাদের অভিজ্ঞতা বা প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন ছাড়া স্বেচ্ছাসেবকদের ওপর নির্ভর করার এই পদ্ধতি তাদের সহিংসতার মুখেও ফেলে দেয়, যেমনটা পশ্চিমবঙ্গে হাফিজ পরিবারের ক্ষেত্রে ঘটেছিল।
তবুও, পূর্বাঞ্চলীয় এই রাজ্যে ঝরে পড়া রক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহি চাওয়ার জন্য সিজেপির জেদকে ম্লান করতে পারেনি। মঙ্গলবার, রাঙ্কা এক্সে ঘোষণা করেন যে পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার একাধিক স্থান সিজেপিকে ছাত্রদের সাথে সভা করার অনুমতি বাতিল করেছে বা দিতে অস্বীকার করেছে। তিনি লেখেন, ‘এটি কেবল এই সত্যকেই আরো শক্তিশালী করে যে বিজেপি তেলাপোকাদের ভয় পায়। বাংলার তেলাপোকারা সরকারি স্কুলে যাওয়া চালিয়ে যাবে এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে সেগুলো ঠিক করার জন্য চাপ দেবে। আপনারা আমাদের যত থামাবেন, আমরা তত বড় হবো।