সত্যের জয় মানে মিথ্যার পরাজয়। ইদানীং সমাজ-সংসার, রাষ্ট্র ও সরকার, রাজনীতি ও অর্থনীতি, সত্য-মিথ্যার মধ্যে চিরকালীন শান্তি ও সংঘর্ষের, নীতিনৈতিকতার অন্তর্দ্বন্দ্ব বা দড়ি টানাটানি একটু বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। এখন মানুষকে সত্য এবং শয়তানকে মিথ্যার প্রতিভূ প্রতিপন্ন করার মধ্যেও পাল্টাপাল্টি প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে। আদমকে জ্ঞান বা শিক্ষাদানের মাধ্যমে ফেরেশতাদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান এবং আদমকে সিজদা করার নির্দেশদানের তাৎপর্য উপলব্ধি করতেও মানুষের মধ্যে বিপত্তির উদ্ভব হচ্ছে। ইবলিশ আদমকে সিজদা করতে অস্বীকৃতি জানানোয় তাকে বহিষ্কার করা এবং পৃথিবীতে মানুষের প্রতিপক্ষ সাব্যস্ত করে পাঠানোর মধ্যেও সবার জন্য রয়েছে উপলব্ধির যৌক্তিকতা। কেননা, শয়তানের প্ররোচনায় আদম আ: ও বিবি হাওয়া আ: আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করার প্রথম যে অন্যায় করেছিলেন, তার পরিণতিতে আদমকে বেহেশত থেকে বিতাড়িত হতে হয়েছিল। আদমকে বেহেশতচ্যুতি করা ছিল শয়তানের প্রথম এবং বড় বিজয়। এরপর আল্লাহ বলেছেন, পৃথিবীতে তোমরা (শয়তান ও মানুষ) পরস্পরের শত্রু হিসেবে অবস্থান করবে। আল্লাহর কাছ থেকে শয়তান মানুষকে প্রতারিত করার ক্ষমতা অর্জন করে। আল্লাহ বলেছেন, ‘তিনি যুগে যুগে সত্যপথের দিকনির্দেশনা দেবেন। যারা সে মতো অনুসরণ করবে; তাদের কোনো ভয় বা দুঃখ থাকবে না। আর যারা শয়তানের প্ররোচনায় সত্য পথের নৈতিক বিধিবিধানকে প্রত্যাখ্যান করবে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে বা জাহান্নামের আগুনে পুড়বে’। অর্থাৎ, শয়তান যে চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছিল তাতে সে জয়লাভ করতে থাকলে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত তো হবে এবং সবার ওপর আল্লাহ যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন শয়তানের প্রতি তাও বাস্তবায়িত হবে। এ ব্যাপারে সবসময় তাই সবার সচেতন থাকা উচিত। দৈনন্দিন জীবনে যখন অন্যায় অনিয়ম মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে, তখন শয়তানের পোয়াবারো। সুতরাং শয়তান যেন বারবার জিতে না যায়, সে দিকে সজাগ এবং সক্রিয় থাকা প্রকারান্তরে শান্তি ও সত্যের জয়ের পথে থাকা।
শিক্ষাবিদ, সমাজসেবক ও সুফি হিসেবে খ্যাত খানবাহাদুর আহছানউল্লাহ তার ‘আমার জীবন ধারা’ গ্রন্থের পরিশিষ্টে ‘কতিপয় কূট প্রশ্নের সমাধান’ শীর্ষক অধ্যায়ে ‘শয়তান বলিতে কি বুঝি’ পরিচ্ছেদে যা লিখেছেন তার উদ্ধৃতি এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক প্রতীয়মান হয়- ‘খোদা আদমের মধ্যে প্রবৃত্তির সৃষ্টি করিয়াছিলেন এই উদ্দেশ্যে যে, আদম জাত অহরহ প্রবৃত্তির সম্মুখীন হইয়াও শয়তানের ধোঁকা খাইয়াও ফেরেশতার ঊর্ধ্বতন স্থান অধিকার করিবে। আর জ্ঞানময় খোদা আদমকে ওই জ্ঞান দিলেন, যে জ্ঞান দ্বারা আদম সৃষ্টির মধ্যে খোদার যে সকল রহস্য প্রচ্ছন্ন আছে, তাহা উদঘাটন করিতে পারে ও খোদার মাহাত্ম্য উপলব্ধি করিতে পারে।
আমি রিপুকে শত্রু মনে করি না; মানুষের মধ্যে রিপু না থাকিলে, কুপ্রবৃত্তি না থাকিলে তাহার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হইত না। যিনি যত পরিমাণে কুপ্রবৃত্তিকে দমন করিতে পারেন, নফসকে বশীভূত করিতে পারেন, তিনি ততই খোদার নৈকট্য লাভ করিতে পারেন। এই রিপু না থাকিলে মানুষের মাহাত্ম্য আমরা কিরূপে উপলব্ধি করিতাম? বলিতে গেলে, শয়তান খোদার নৈকট্য লাভের সহায়-স্বরূপ। খোদা শয়তানকে সৃষ্টি করিয়াছিলেন, আমাদেরই মঙ্গল হেতু। মঙ্গলময় খোদা সৃষ্টির উদ্দেশ্যকে নষ্ট করিতে শয়তানকে সৃষ্টি করেন নাই। অন্ধকার না হইলে আলোকের বাহার কোথায়? কদাকার না হইলে সুন্দরের প্রশংসা কোথায়? বদি না হইলে নেকির বাহাদুরি কোথায়? দোজখ না হইলে বেহেশতের শান্তি কে বুঝিত? খোদার অসীম শক্তি, অফুরন্ত দয়া; তাই মাটির মানুষের মধ্যে শয়তানকে ভরিয়া দিয়া তাহাকে উচ্চতম স্থান দান করিয়াছেন। ধন্য তাঁহার মহিমা ধন্য তাঁহার সৃষ্টি কৌশল।’
সমাজে অর্থনীতিতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির যে চেষ্টা তা সে নিরিখে দেখার অবশ্যই অবকাশ রয়েছে। অশরীরী অপশক্তিকে রুখে দেয়ার নাম করে প্রকারান্তরে শারীরিক অপশক্তির উদ্ভব ঘটে। একই সাথে সে অগ্রযাত্রায় আপ্লুত বোধ করা হয়। কল্পিত অপশক্তির অর্থায়নে বাধা দেয়ার নিয়তে আসল অপশক্তির দ্বারা লাখো কোটি টাকা লোপাটের মহা উৎসব চলে। মিথ্যাকে পরাভূত করতে গিয়ে সত্যেও অবক্ষয় ঘটতে থাকে , তাকে থামানো যায় বা যাচ্ছে না। ‘ঠাকুর ঘরে কে রে?’ সমস্বরে সুচতুরতায় উত্তর আসে ‘আমি কলা খাই না’।
শয়তানের প্ররোচনায় দৈনন্দিন জীবন যাপনে নির্ধারিত ও নিয়মিত করণীয় বিষয় (যেমন- ইবাদত, উপাসনা, শরীরচর্চা, পড়াশোনা, দাফতরিক দায়িত্ব) পরিপালনে অনিয়ম এবং মনোযোগে শৈথিল্য লক্ষ করা গেলে, প্রাত্যহিক কর্মভাবনা ও সম্পাদনে শ্লথ হওয়ার লক্ষণ দেখা গেলে, হাতে প্রচুর কাজ থাকা সত্ত্বেও যেন সেগুলোতে যথা মনোযোগ সমর্পিত হয়নি বলে মনে হলে একধরনের অবসাদ, অতৃপ্তি ও উৎকণ্ঠা সেখানে উপস্থিত হয়। মহৎ চিন্তাভাবনা ও কার্যকর কর্মপরিকল্পনার ক্ষীণ স্রোতধারা প্রবাহিত হতে চেয়ে হঠাৎ লাপাত্তা হয়ে যেতে পারে। সুশৃঙ্খল কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে দৃশ্যমান শিথিলতা মনকে পীড়া দিতে পারে। সে কারণে সামনের দিনগুলো বেশ অগোছালো মনে হতে পারে। আশঙ্কা এই থেকে যায় যে, এর জন্য পরে অনুশোচনা বাড়বে, আক্ষেপ অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠবে। কার্যকর ও সৃজনশীল কিছু করতে না পারার অতৃপ্তির সাথে সাথে কিছু করতে না পারার বেদনাও প্রায়শ মনকে পীড়া দেবে। এসবের ওপর যুক্ত হচ্ছে অপরিকল্পিত অবয়বের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
ভেবে দেখা জরুরি হয়ে পড়েছে যে, বর্তমানে দেশ সমাজ ও অর্থনীতির যে ক্রান্তিকাল বিরাজ করছে- এ অবস্থার কী কী কারণ হতে পারে। হয়তো দেখা যাবে- কর্মপরিবেশে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা, কারো অসমর্থনযোগ্য আচরণ দ্বারা আহত হওয়া, সময় ও সুযোগের সদ্ব্যবহার করে নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে ব্যর্থতা, অনিয়ম ও ক্ষমতা অপব্যবহারের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ ছাড়া কিছুই করতে না পারা ইত্যাদি। নিজের ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদা সমুন্নত রেখে, সঙ্কোচের বিহ্বলতায় নিজেকে অপমানিত হতে না দিয়ে, আশপাশে ঘটে যাওয়া অন্যায় ও অনিয়মকে প্রশ্রয় দেয়া দেখে হতাশ না হয়ে; বরং নিজের কাজে, পড়াশোনায়, চিন্তাভাবনায় একাগ্র হওয়াই বাঞ্ছণীয়। জীবন সংগ্রামে যথাযথভাবে টিকে থাকতে হলে চাই সুস্থ ও সবল মনোবল। এর জন্য সাধনা ত্যাগ ও সহিষ্ণুতা সহকারে অধ্যবসায়ের প্রয়োজন। আপনা-আপনি আত্মশক্তির বিকাশ হয় না। ছেলের হাতের মোয়ার মতো সহজপ্রাপ্য নয় সব সমস্যার সমাধান। জীবনের কৈশোর তারুণ্য ও যৌবনের কর্মচাঞ্চল্য বয়ঃক্রমকালে লোপ পেতে পারে বৈকি; কিন্তু অর্জিত অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা কাজে লাগানোর সুযোগ কেন হবে লাপাত্তা। এ জন্য চাই সময় ও সুযোগের সক্রিয় ও সুচিন্তিত সদ্ব্যবহার। অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে তুলে নিতে হবে কাজ। সেই সাথে একে একে সম্পাদন হবে লক্ষ্য, মন হবে তারুণ্যে টগবগ। বিশ্রাম যতটুকু প্রাপ্য ও প্রয়োজন সেটুকু থাকবে। শয়তানের ইন্ধনে খোঁড়া যুক্তিতে সমর্পিত হলে চলবে না। সমর্পিত হলে চলবে না শৃঙ্খলাবিহীনতায়। আনন্দ সর্বনাশ, ভালো-মন্দ, উত্থান-পতনের সময় ও কর্মপ্রবাহে উজ্জ্বল সূর্যের ও চেতনার আকাক্সক্ষা থাকতে হয় সদা জাগ্রত। ব্যর্থতার গ্লানিতে আকণ্ঠ হয়ে নয়, ব্যর্থতা জয় করে এগোতে হবে। নিজের মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না হতে হয়, কোনো অবস্থাতে ছিন্ন না হয় সে দিকে সজাগ দৃষ্টি রেখে একে মজবুত করতে হবে। ভারসাম্য থাকতে হবে। সমন্বয় সাধনের অবকাশ তৈরি হতে হবে চিন্তায়-চৈতন্যে, আবেগ-উৎকণ্ঠায়, কর্ম-প্রণোদনায়। সময়ের ও সুযোগের সদ্ব্যবহারে হতে হবে সুগ্রথিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত। আত্মবিশ্বাসে হতে হবে উচ্চশির। সবসময় খেয়াল রাখতে হবে শয়তান যেন জিতে না যায়।
লেখক : অনুচিন্তক