ইরানের সাথে চুক্তিতে বাধা দিলে ওমানে হামলার হুমকি ট্রাম্পের

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তিতে ওমান ‘বাধা দিলে’ দেশটিতে বোমা হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সাথে প্রায় ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধে তেহরানকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। যুদ্ধটি এখন ক্রমেই তার জন্য রাজনৈতিক বোঝা হয়ে উঠছে।

ইরানের সাথে যুদ্ধ অবসানে নির্ধারিত ৬০ দিনের সময়সীমা শেষ হওয়ার দিন সোমবার এ হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্পের দূত ও জামাতা জ্যারেড কুশনার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ‘খুবই ইতিবাচক ও সক্রিয় আলোচনা’ চলছে। তবে তিনি উল্লেখ করেন, ‘দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সত্যিকার অর্থে খুব বেশি আস্থা নেই।’ কুশনার ফক্স নিউজকে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ধৈর্য ধরবেন। তিনি কোনো চুক্তিতে দ্রুত পৌঁছাতে চান না। সঠিক চুক্তি যখন প্রস্তুত হবে, তখনই তিনি চুক্তিতে পৌঁছাবেন।’

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই সোমবার বলেন, জুনের সমঝোতা স্মারকে আলোচনার জন্য নির্ধারিত ৬০ দিনের সময়সীমা ‘অপ্রাসঙ্গিক’। কারণ যুক্তরাষ্ট্র শুরুতেই চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো আলোচনা শুরু করিনি। কারণ চুক্তি স্বাক্ষরের কয়েক সপ্তাহ পরই ব্যাপকভাবে চুক্তি লঙ্ঘন শুরু হয়। ফলে ৬০ দিনের বিধানটি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে।’

জ্বালানির দামে ব্যাপক ওঠানামা এবং যুদ্ধ নিয়ে জনমতের বিরোধিতার কারণে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানরা চাপের মুখে রয়েছে। ফলে প্রায় ছয় মাসের অচলাবস্থার অবসানে ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়ছে।

ইরান ও ওমানের মধ্যে প্রণালীটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলমান আলোচনার প্রসঙ্গে ফক্স নিউজের সাংবাদিক ট্রে ইংস্টকে ট্রাম্প বলেন, ‘ওমান যদি পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, আমরা তাদের ওপর ভয়াবহ বোমা হামলা চালাব।’ উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ওমান ট্রাম্পের মন্তব্যের বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। প্রণালীটি দিয়ে ভবিষ্যতে জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা নিয়ে তেহরান ও মাসকাট কয়েক সপ্তাহ ধরে আলোচনা করছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সোমবার জানিয়েছে, দুই পক্ষ একটি যৌথ ঘোষণা নিয়ে কাজ করছে। হরমুজের উত্তর পাশে ইরানের উপকূল। আর দক্ষিণ পাশে ওমান।

প্রণালীটি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তির উদ্যোগ বিফলে যাওয়ার পর তাদের মধ্যে এ আলোচনা শুরু হয়। ইংস্টকে দেয়া সাক্ষাৎকারের বিবরণ অনুযায়ী, ট্রাম্প আরো বলেছেন, ‘ইরানের উচিত আত্মসমর্পণের জন্য সাদা পতাকা ওড়ানো।’ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেলেও ট্রাম্প বারবার দাবি করে আসছেন, হরমুজের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রয়েছে। শুক্রবার তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালীকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডের অংশ ঘোষণা করবেন। জবাবে ইরান বলেছে, গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি পরিবহন পথ ‘ইরানেরই থাকবে।’

২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজকে উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশসহ বিভিন্ন পণ্য এই প্রণালী দিয়ে পরিবহন করা হতো। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন প্রচেষ্টায় ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস এবং বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি পরিত্যাগে বাধ্য করার বিরুদ্ধে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে তেহরান প্রণালীটির ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করছে। যুদ্ধটি জনপ্রিয় না হওয়া এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়ার চেষ্টা সত্ত্বেও ট্রাম্প বলেন, তিনি চুক্তিতে পৌঁছাতে তাড়াহুড়ো করছেন না। ইংস্টকে তিনি জানান, তার প্রশাসন ও ইরানের বিপ্লবী গার্ডের কর্মকর্তাদের মধ্যে সরাসরি একটি গোপন যোগাযোগের পথ রয়েছে। তার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, ‘তারা ভালো পোকার (দর কষাকষিতে) খেলোয়াড়, কিন্তু তারা মারা যাচ্ছে।’

মিত্র দেশগুলো আলোচনার জন্য চাপ অব্যাহত রাখার সময় ট্রাম্পের এ মন্তব্য এলো। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলু জানিয়েছে, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়ব এরদোগান ফোনে ট্রাম্পের সাথে সঙ্ঘাত নিয়ে আলোচনা করেছেন। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে ‘কূটনীতির পূর্ণ ব্যবহার’ করার গুরুত্ব তুলে ধরেন এরদোগান। শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় আঙ্কারা সমর্থন অব্যাহত রাখবে বলেও জানান তিনি। সঙ্ঘাতের কেন্দ্রীয় উত্তেজনার বিষয় হয়ে রয়েছে হরমুজ প্রণালী। সঙ্কীর্ণ এই নৌপথ উপসাগরীয় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করেছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে প্রণালীটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেলের দাম বেড়ে যায়। সরবরাহে বিঘœ ঘটার আশঙ্কায় বড় আমদানিকারক দেশগুলো সতর্ক করে দেয়।

ইরান হরমুজে জাহাজ চলাচল সীমিত রাখার পাশাপাশি ইয়েমেনে তাদের মিত্র হাউছিরা লোহিত সাগরে সৌদি আরবের বন্দরগুলোর ওপর সমান্তরাল নৌ অবরোধ ঘোষণা করেছে। তেল রফতানির জন্য এটিই সৌদি আরবের একমাত্র বিকল্প সমুদ্রপথ। ইয়েমেনের হাউছি বিদ্রোহীরা সোমবার জানায়, সৌদি আরবের নৌ অবরোধের অংশ হিসেবে তারা লোহিত সাগরে সৌদি আরবের একটি সামরিক জাহাজ ও তার সাথে থাকা চারটি নৌযানকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। হাউছিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেন, ‘ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে মোখা উপকূলের কাছে লোহিত সাগরে সৌদি শত্রুর একটি সামরিক অবতরণকারী জাহাজ এবং তার সাথে থাকা চারটি সামরিক টহল নৌযানকে লক্ষ্য করে সফলভাবে হামলা চালানো হয়েছে।’