কাল সেই ভয়াল ২৯ এপ্রিল

৩৫ বছর পর এখনো আঁতকে ওঠেন উপকূলের লাখ লাখ মানুষ

Printed Edition
3rd-5
দক্ষিণ চট্টগ্রামের নদী ভাঙন প্রতিরোধের কাজ চলছে। ছবিটি রায়পুর থেকে তোলা : নয়া দিগন্ত

এস এম রহমান দক্ষিণ চট্টগ্রাম

আগামীকাল সেই ভয়াল ২৯ এপ্রিল। যে যেখানেই থাকুক না কেন বছর ঘুরে এই বিশেষ দিনটি এলেই আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন উপকূলের লাখ লাখ মানুষ।

১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পর থেকে আজও পর্যন্ত বঙ্গোপসাগর, কর্ণফুলী ও শঙ্খ নদী বেষ্টিত দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালী থেকে বোয়ালখালী হয়ে পূর্ব কালুরঘাট পর্যন্ত প্রায় ২০০ কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকার অধিকাংশই এলাকাই অরক্ষিত। এর ফলে প্রতি বছর বর্ষা এলেই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে ওঠে পুরো উপকূলের মানুষ।

সেই ভয়াবহ স্মৃতির ৩৫ বছর পরে এবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে উপকূলের মানুষ। সাগর-নদী বেষ্টিত দক্ষিণ চট্টগ্রামে ভাঙন ও জলোচ্ছ্বাস ঠেকাতে এখন চলছে দুই হাজার ২৯৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকার টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ আর এ কারণেই টেকসই বেড়িবাঁধের আশার আলো দেখছে আতঙ্কিত উপকূলবাসী।

গতকাল সরেজমিন উপকূলের কয়েকটি এলাকা পরিদর্শনকালে স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, প্রায় আড়াই যুগ পরে এখন টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ চলছে এতে আমাদের মাঝে নতুনভাবে বেঁচে থাকার আশার আলো জেগে উঠেছে।

৩৫ বছর আগে ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের এই দিনের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও ঘূর্ণিঝড়ের সাথে ২৫ থেকে ৩০ ফুট উচ্চতার জলোছ¡াসে বঙ্গোপসাগর উপকূলীয় পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রাম লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল। ওই সময় জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ে ভেসে যায় উপকূলীয় বিস্তীর্ণ এলাকা। ওই দিন বিকেলের পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত একটানা ঝড়ের তাণ্ডবে বঙ্গোপসাগর, কর্ণফুলী ও শঙ্খ নদী উপকূলীয় বাঁশখালী, আনোয়ারা, পটিয়া, বোয়ালখালী, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও কর্ণফুলীসহ আট উপজেলার অন্তত ৫০ হাজার নারী-পুরুষসহ কয়েক লাখ গবাদিপশু প্রাণ হারিয়েছিল। এ ছাড়া কয়েক লাখ ঘরবাড়ি, গাছপালা উপড়ে যায়। স্মরণকালের ভয়াবহ এ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ওই দিন এ অঞ্চলের প্রায় কয়েক হাজার কোটি টাকার ক্ষতি সাধিত হয়েছিল।

সেই দিনের ভয়াবহ স্মৃতির কথা আজও ভুলতে পারেনি উপকূলীয় এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ। তাই এ দিনটি সামনে এলে স্বজন হারানোর বেদনাবিধুর হয়ে ওঠে উপকূলীয় এলাকার হাজার হাজার হাজার পরিবার।

২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডব এত ব্যাপক হয়েছিল যে, ঝড় শুরু হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর থেকে পরদিন ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত দক্ষিণ চট্টগ্রামসহ পুরো চট্টগ্রামের সাথে সারা দেশের যোগাযোগব্যবস্থা পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছিল। সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে টেলিফোন ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার। ফলে সরকারি- বেসরকারিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধার তৎপরতাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়ে পড়েছিল।

২৯ এপ্রিলের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে চট্টগ্রামের বাঁশখালী, আনোয়ারা ও পশ্চিম পটিয়ায়। বাঁশখালী উপজেলার পুকুরিয়া, বাহারছড়া, খানখানাবাদ, ছনুয়া, শেখেরখীল, পুঁইছড়ি, সরল, গন্ডামারা, কালিপুর, সাধনপুর, বৈলছড়ি, চাম্বল, জলদি, শিলকুপ, আনোয়ারা উপজেলার জুইদন্ডি, রায়পুর, বারশত, চন্দনাইশের বৈলতলী, বরমা, দোহাজারী, কর্ণফুলীর জুলধা, চরলক্ষা, শিকলবাহা, পাথরঘাটা, পটিয়ার শোভনদন্ডী, খরনা, বোয়ালখালীর পূর্ব কালুরঘাট, গোমদন্ডী, সাতকানিয়ার কালিয়াইশ, নলুয়া, আমিলাইশ, চরতী, ধর্মপুর, খাগরিয়া ও পুরো লোহাগাড়া উপজেলার অন্তত অর্ধলক্ষ নারী, পুুরুষ ও শিশু প্রাণ হারায়। বাঁশখালীর ছনুয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান রেজাউল হক চৌধুরী জানান, ২৯ এপ্রিলের ঝড় জলোচ্ছ্বাসে বাঁশখালীর প্রায় ৪০ হাজার মানুষ ও শিশু প্রাণ হারায়।

আনোয়ারার রায়পুরের সাবেক চেয়ারম্যান আবু ছৈয়দ ও জুইদন্ডির সাবেক চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক হোসাইনি জানান, ২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে আনোয়ারা উপকূল লণ্ডভণ্ড হয়ে ১৬ হাজারেরও অধিক নারী-পুরুষ প্রাণ হারায়।

এ দিকে দক্ষিণ চট্টগ্রামে ভাঙন প্রতিরোধে বাঁশখালী ও আনোয়ারা উপজেলায় একই প্রকল্পে ৮৭৪ কোটি ৫৭ লাখ, পটিয়া উপজেলায় এক হাজার২৯১ কোটি ১২ লাখ টাকা ও বোয়ালখালী উপজেলায় ১৩৪ কোটি ৯ লাখ টাকায় টেকসই ভাঙন প্রতিরোধ প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলছে। ইতোমধ্যে বঁাঁশখালী ও আনোয়ারা উপজেলার কাজ গড়ে ৩৩ ভাগ সম্পন্ন হয়েছে।

কাল ২৯ এপ্রিল দিবসটি উপলক্ষে পুরো উপকূলীয় এলাকায় মসজিদ, মাদরাসা, মন্দির, প্যাগোডায় ধর্মীয় আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।