৫ আগস্ট পাসপোর্ট নিয়েই দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা
পুরনো এয়ারপোর্টের ‘তালতলা গেট’ দিয়ে লাগেজ প্রবেশের অডিও ও চাঞ্চল্যকর সিডিআর উন্মোচন
Printed Edition
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এটি ছিল ৩ আগস্ট থেকে নিখুঁতভাবে পরিকল্পিত একটি ‘সেফ এক্সিট’ (নিরাপদ প্রস্থান) অপারেশন। বিশেষ সামরিক ও বেসামরিক সিকিউরিটি প্রোটোকল ব্যবহার, সমস্ত ট্রাভেল ডকুমেন্ট ও পাসপোর্ট সংগ্রহ এবং বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে এই মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়িত হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাইবার ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ও প্রসিকিউটর তানভীর আহমেদ জোহার এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার, টাওয়ার ডাম্প ডেটা, এটিএস (এয়ার ট্রাফিক সার্ভিসেস) রাডার ট্র্যাকিং, ওয়ারলেস ট্রাফিক বিশ্লেষণ এবং তদন্তকারীদের জব্দ করা একাধিক বিস্ফোরক অডিও কল রেকর্ড পর্যালোচনায় এসব আলামত উঠে এসেছে।
আইনি ও সামাজিক অঙ্গনে শেখ হাসিনার পাসপোর্ট ছাড়াই প্রস্থান নিয়ে নানা গুঞ্জন থাকলেও ডিজিটাল ফরেনসিক ও অডিও আলামত সেটিকে মিথ্যা প্রমাণ করেছে। ফরেনসিক বিশ্লেষণে পাওয়া অডিও ক্লিপে দেখা যায়, ৫ আগস্ট সকালে শেখ হাসিনার পাসপোর্ট সংগ্রহের জন্য তার তৎকালীন প্রটোকল অফিসার শামীম মোশফিক, তৎকালীন লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাজীব (বর্তমানে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল) এবং গণভবনে দায়িত্বরত এক সেনাসদস্যের মধ্যে দ্রুত সমন্বয় ঘটে।
জব্দকৃত ফোনালাপের একটি অংশ নি¤œরূপ:
শামীম মোশফিক: ‘...মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পাসপোর্টটা কার কাছে?’
লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাজীব : ‘হ্যাঁ, আমার কাছে ভাই, আমার কাছে।’
শামীম মোশফিক : ‘আপনার অবস্থান কোথায়? আমি আপনার কাছে কোথায় যাব ভাই? আপনি এখন লোকেশন কোথায় বলেন?’
লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাজীব : ‘আমি এই জাহাঙ্গীর গেটের এদিকে ভাই।’
শামীম মোশফিক : ‘হ্যাঁ, জাহাঙ্গীর গেটে। আপনি সোজা বঙ্গবন্ধু বেজে চলে আসেন টান দিয়ে... ভিআইপি কমপ্লেক্সে আসেন।’
ফরেনসিক টাওয়ার লোকেশন বিশ্লেষণ নিশ্চিত করেছে যে, ওই সেনাসদস্য গণভবন থেকে পাসপোর্টসহ মূল ট্রাভেল ডকুমেন্ট ফাইল সংগ্রহ করেন। এরপর কচুক্ষেত ও জাহাঙ্গীর গেট হয়ে তা বিমানবাহিনীর ‘বঙ্গবন্ধু বেজ’-এর ভিআইপি কমপ্লেক্সে হস্তান্তর করা হয়।
একই সময়ে গণভবন ছেড়ে বের হওয়া অন্য এক সামরিক কর্মকর্তার লাগেজের অবস্থান সংক্রান্ত অডিওতে পাওয়া যায়:
প্রথম কর্মকর্তা : ‘লাগেজ নিয়ে আমি রওনা দিয়েছি। এয়ারপোর্টের (পুরনো) কোন গেইট খোলা আছে?’
দ্বিতীয় কর্মকর্তা : ‘তালতলা দিয়ে।’ আরেকটি ফোন কলে আব্দুর রহমান নামের একজনকে ১১ জনের জিও পাবলিস্ট করার নির্দেশ দিতে শোনা যায় প্রধানমন্ত্রীর ঊর্ধ্বতন অফিসারের কাছ থেকে।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর উদ্ধার করা অন্য একটি গোপন ভিডিও কনফারেন্স থেকে ৫ আগস্টের সঙ্কটকালীন চিত্র স্পষ্ট হয়। সেখানে এক সেনাকর্মকর্তা অপরজনকে জিজ্ঞেস করেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কি মহামান্যের কাছে (রাষ্ট্রপতির কাছে) যাবেন?’ জবাবে অন্যজন জানান, ‘১১টার দিকে যাওয়ার কথা।’
এরপর মাঠপর্যায়ের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে টেলিকমে অপর কর্মকর্তা আশঙ্কাজনক চিত্র তুলে ধরে বলেন, ‘পরিস্থিতি ভালো না। উত্তরা থেকে হাজার হাজার মানুষ আসতেছে। তারা ৩টার মধ্যে গণভবনে পৌঁছাবে।’
সাইবার ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ তানভীর আহমেদ জোহা এ প্রসঙ্গে স্পষ্ট জানান, ‘তদন্তে পাওয়া ডিজিটাল প্রমাণাদি সাক্ষ্য দেয় যে সম্পূর্ণ প্রোটোকল মেনে ও আইনি কাগজপত্র সাথে নিয়েই তিনি দেশ ছেড়েছেন। উনার পাসপোর্ট নিয়ে যাওয়া সংক্রান্ত অডিও আলামত ও লোকেশন ট্রেস ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় সংরক্ষিত রয়েছে। ফলে পাসপোর্ট ছাড়া যাওয়ার দাবিটি আইনি ও বস্তুগত দিক থেকে টিকছে না।’
তদন্ত কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা যায়, আগস্টের শুরু থেকেই শেখ হাসিনা ডিজিটাল মনিটরিংয়ের শঙ্কা বোধ করেন। ৩ আগস্ট থেকেই বিমানঘাঁটিতে কর্মরত কর্মকর্তা ও সিকিউরিটি প্রোটোকলদের কাছে বিশেষ সতর্কতামূলক বার্তা দেয়া শুরু হয়।
তিনি অফিশিয়াল মোবাইল ব্যবহার না করে গণভবনের অর্ডিন্যান্স, বাবুর্চি ও কর্মচারীদের নামে নিবন্ধিত ভুয়া/বেনামী সিম ব্যবহার করেন। টাওয়ার ডাম্প অ্যানালিসিসে দেখা গেছে, ৩ আগস্ট থেকেই পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে আশ্রয় নিশ্চিতের লক্ষ্যে গণভবনের ওই সব বিকল্প সিম থেকে ভারতের একাধিক মোবাইল নম্বরে নিয়মিত যোগাযোগ করা হয়েছিল।
৫ আগস্ট সকালে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে শেষবারের মতো কথা বলেন। বাংলাদেশে ব্যবহৃত নম্বর থেকে তার সর্বশেষ ফোনালাপটি রেকর্ড করা হয় তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধানের সাথে। এর পরপরই তার ফোন নম্বরটি আন্তর্জাতিক রোমিং মোডে চলে যায়।
এভিয়েশন ও রাডার ট্র্যাকিং অনুযায়ী, বিকেল ৩টার পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনাকে বহনকারী হেলিকপ্টারটি তেজগাঁও/বঙ্গবন্ধু বেজ থেকে ভারতের উদ্দেশে টেক-অফ করে। ভারতে অবতরণের পর সেদিন সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত রোমিং নেটওয়ার্কে তিনি একাধিক ভারতীয় নম্বরে যোগাযোগ করেন। পরে তদন্ত এড়াতে রহস্যজনকভাবে রোমিং পরিষেবাটি বন্ধ করে দেয়া হয়।
৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম স্পষ্ট ভাষায় জানান, শেখ হাসিনা ৫ তারিখে দেশ ছাড়েন। কালকে (আজ) স্বৈরাচার পতন দিবসে দেশজুড়ে যখন ধিক্কার কর্মসূচি ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান হবে, তখন আলোচনা ভিন্ন খাতে নিতে নানা অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, যা একটি ব্যর্থ আস্ফালন মাত্র।
পলাতকদের গ্রেফতার ও সাজা প্রদান প্রসঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘দেড় বছরের কম সময়ে ট্রাইব্যুনাল ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায় দিয়েছে, যা নজিরবিহীন। পলাতক আসামিদের গ্রেফতারের জন্য সরকারের আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। নির্দিষ্ট তথ্য দিলে আমরা সাথে সাথে ব্যবস্থা নেব। এছাড়া বিচারে সাজার বিষয়ে অপরাধের মাত্রা ও ‘সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটি’ অনুযায়ী প্রপোর্শনেট বিচার করা হয়। সরকারপ্রধান হিসেবে শেখ হাসিনার অপরাধের দায় এবং অন্য সহযোগীদের দায় কখনোই এক হতে পারে না। বিচারকের বিচারিক এখতিয়ার অনুযায়ী আইনি ধারাতেই অপরাধের মাত্রা বিচার করে সাজা নির্ধারণ করা হচ্ছে।’
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ডিজিটাল এভিডেন্স বিধিমালা অনুযায়ী, আসামির প্রস্থান প্রক্রিয়ার এই ছকটি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ‘অপরাধমূলক চক্রান্ত’ ও ‘পরিকল্পিত প্রস্থান’ প্রমাণের ক্ষেত্রে বড় উপাদান হতে যাচ্ছে।
জুলাই-আগস্টের গণহত্যার বিচার ও প্রায় ১৪০০ শহীদ ও হাজার হাজার পঙ্গুত্ব বরণকারীর বিচার নিশ্চিত করতে এই অডিও ট্রানস্ক্রিপ্ট, টাওয়ার ডাম্প ও ফরেনসিক তথ্যপ্রমাণ আদালতে প্রসিকিউশনের মূল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হবে। ট্রাইব্যুনালের আদেশে ২০২৪ সালের সমস্ত ডিজিটাল তথ্য বর্তমানে রাষ্ট্রীয় আর্কাইভে সুরক্ষিত রাখা হয়েছে।