কেন ভারতের তেলাপোকা আন্দোলন ভেঙে পড়বে না

ডিপ্লোম্যাটের বিশ্লেষণ

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

গত দুই বছরে নেপাল, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, কেনিয়া এবং মাদাগাস্কারে জেন জি প্রজন্মের বিদ্রোহ সরকারগুলোকে উৎখাত বা নাড়িয়ে দিয়েছে এবং প্রতিটিই একই ডিজিটাল কাঠামো থেকে নির্মিত, যা ব্যবহারকারীর ডিজিটাল পদচিহ্ন তৈরি, পুনরুৎপাদন এবং প্ল্যাটফর্মের প্রসারণযোগ্যতা নিয়ে গঠিত। ভারতের প্রশাসন হয় ধরে নিয়েছিল যে তারা এই বৈশ্বিক ধারা থেকে মুক্ত অথবা এই প্রবণতাটি শনাক্ত করার মতো সরঞ্জাম তাদের কাছে ছিল না। সুতরাং, এই ব্যর্থতা ছিল রাজনৈতিক সংগঠনের একটি নতুন রূপের প্রতি তাদের অন্ধত্ব।

‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) আধুনিক বিকেন্দ্রীভূত নেতৃত্ব তত্ত্বের প্রতিটি বৈশিষ্ট্যই প্রতিফলিত করে। একজন ব্যবহারকারীর রেখে যাওয়া ডিজিটাল পদচিহ্ন পরবর্তী ব্যবহারকারীকে পথ দেখানোর উদ্দীপক হয়ে ওঠে, যা কোনো কেন্দ্রীয় নির্দেশ ছাড়াই সমন্বয় সাধন করে। আরো তিনটি সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য এই প্রক্রিয়াটিকে সংজ্ঞায়িত করে : স্বাধীন ব্যক্তিগত কার্যকলাপ, যা দেখে তা অনুলিপি ও অভিযোজিত করে সমকক্ষদের দ্বারা পুনরুৎপাদনযোগ্যতা এবং এমন প্ল্যাটফর্ম স্থাপত্য যা সেই পদচিহ্নগুলোকে মূল ডিজিটাল পদচিহ্ন ও নেটওয়ার্কের অনেক ঊর্ধ্বে প্রসারিত করে। সিজেপি তার অস্তিত্বের প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই এই তিনটি বৈশিষ্ট্যই প্রদর্শন করেছিল।

এর উৎস খুঁজে পাওয়া যায় শহুরে, বিশ্বব্যাপী শিক্ষিত এবং ডিজিটাল জগতে জন্ম নেয়া ব্যক্তিত্বদের মধ্যে- একই বৈশিষ্ট্য যা অন্যান্য জেন জি-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনেও দেখা যায়। অভিজিৎ দীপকে, যিনি বস্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জনসংযোগে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন, অনলাইনে পোস্ট করা একটি সংক্ষিপ্ত, উসকানিমূলক প্রশ্নকে কেন্দ্র করে তৈরি একটি সাধারণ ওয়েবসাইট এবং সাইন-আপ ফর্মের মাধ্যমে এই ‘দলটি’ প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে সিজেপি’র ইশতেহার এবং ব্র্যান্ডিং তৈরি করেন।

নয়াদিল্লি-ভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিক সৌরভ দাস, যিনি ১৮ বছর বয়সে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করা শুরু করেন, তিনি এই আন্দোলনের প্রধান মুখপাত্র হয়ে ওঠেন এবং প্রতিবাদের বার্তা প্রচারের জন্য ডিজিটাল মিডিয়ার আপডেট ব্যবহার করেন। কয়েক দিনের মধ্যেই দলটির সোস্যাল মিডিয়া অনুসারীর সংখ্যা এক কোটি ৮০ লাখের কাছাকাছি পৌঁছে যায়, যা কিছু সময়ের জন্য মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং কংগ্রেস উভয়েরই আনুষ্ঠানিক অ্যাকাউন্টকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

বিশ্বজুড়ে একই ধরনের আন্দোলনের মতোই, ‘তেলাপোকা’ আন্দোলনটি অল্প সময়ের মধ্যে দ্রুতগতিতে বিস্তার লাভ করে, কারণ এটি ভারতের ডিজিটাল সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের গভীর অসন্তোষকে কাজে লাগিয়েছিল। ভারতের পর্যায়ক্রমিক শ্রমশক্তি সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ মাসে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল ১৫.২ শতাংশ, যেখানে সার্বিকভাবে এই হার ৩ থেকে ৫.৬ শতাংশ। আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমান অনুযায়ী, ২৫ বছরের কম বয়সী কলেজ স্নাতকদের ৪০ শতাংশেরও বেশি বেকার ছিলেন, যা প্রায় এক কোটি ১০ লাখ মানুষ।

পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের পর ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট (এনইটিটি) বা মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষা বাতিল হয়ে যাওয়ায়, একটি বিমূর্ত অসন্তোষ তাৎক্ষণিক রূপ নেয়। পরীক্ষায় নিবন্ধিত ২৩ লাখ শিক্ষার্থী সরকারিভাবে স্বীকৃত ডাক্তারি পেশায় প্রবেশের একটি বাস্তব সুযোগ হারাতে বসে। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ব্যর্থতাগুলো সম্মিলিতভাবে অর্থ খুঁজে পাওয়ার জন্য উর্বর ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে, কারণ এগুলো ধর্ম বা বর্ণ নির্বিশেষে প্রায় প্রতিটি তরুণ পরিবারকে স্পর্শ করে। এই কারণেই আন্দোলনটি হিন্দু ও মুসলিম পরিবারগুলোকে প্রতিবাদস্থলে পাশাপাশি প্রার্থনা করতে ও খেতে একত্রিত করেছিল, যেখানে একজন মুসলিম রাঁধুনি প্রতিদিন বিক্ষোভকারীদের খাওয়াতেন এবং শিখ গুরুদ্বারগুলো গণ-রান্নাঘর চালাত।

অনলাইনে, আন্দোলনটি তার যোগাযোগ ও প্রচারের প্রধান মাধ্যম হিসেবে মিমকে ব্যবহার করে। অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমের তুলনায় মিমের একটি স্বতন্ত্র সুবিধা রয়েছে। এগুলো কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তৈরি করা যায়, সৃজনশীলভাবে প্রয়োজনীয় তথ্য পৌঁছে দেয় এবং যেকোনো ব্যবহারকারীকে দ্রুত ও মজার ছলে মূল বার্তাটি বুঝতে সাহায্য করে। মিমগুলো আরো শক্তিশালী; কারণ এর গঠনশৈলী নতুন করে তৈরির সুযোগ করে দেয়। একজন ব্যবহারকারী শুধু একটি মিম দেখেই চলে যায় না। তারা এর কাঠামো নকল করে, এর বিষয়বস্তু পরিবর্তন করে এবং পুনরায় পোস্ট করে, যার ফলে মূল চিহ্নটি বহু বৈচিত্র্যে ছড়িয়ে পড়ে।

ঘোষণাপত্রের মিম, নির্বাচনী পোস্টারের প্যারোডি, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ব্যঙ্গাত্মক ভিডিও এবং কুমির বনাম তেলাপোকার ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতার চিত্র প্রত্যেকটিরই নিজস্ব কার্যকারিতা রয়েছে। প্রতিটি বৈচিত্র্য এই সম্মিলিত ডিজিটাল পরিবেশকে আরো পরিবর্তন করে, যা পরবর্তী পর্বের নতুন করে তৈরির প্রেরণা জোগায়। একবার এই সঞ্চয়ন একটি নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলে, একটি স্বায়ত্তশাসিত ব্যক্তিগত কাজ ক্রমবর্ধমান এবং সম্প্রসারণযোগ্য সম্মিলিত সমন্বয়ে রূপান্তরিত হয়। দার্শনিক কান্টের সেই মূল অপমানটিই সেই প্রান্তসীমার চিহ্ন হিসেবে কাজ করেছিল। বেকারত্ব এবং পরীক্ষার সততা নিয়ে বিদ্যমান অসন্তোষের পরিপ্রেক্ষিতে, এটি এতটাই আবেগিক প্রভাব ফেলেছিল যে, তা কয়েক দিনের মধ্যেই লাখ লাখ বিচ্ছিন্ন হতাশাকে একটি সম্মিলিত ও চেনা পরিচয়ে রূপান্তরিত করতে সক্ষম হয়েছিল। কিছু জাতীয় পর্যবেক্ষক সন্দিহান যে, আবেগিক প্রতিক্রিয়া এবং অ্যালগরিদমিক বিবর্ধনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা কোনো আন্দোলন টিকে থাকতে পারে কি না। আমি এর বিপক্ষে যুক্তি দেবো। একটি নির্দিষ্ট কারণে, সিজেপি’র তার বেশির ভাগ প্রতিপক্ষের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সাফল্য পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

একটি সরকারকে উৎখাত করা, পরবর্তী সময়ে শাসনকার্য পরিচালনার উপযোগী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চেয়ে সহজ। উদাহরণস্বরূপ, নেপালের ২০০৬ সালের বিপ্লব একটি রাজতন্ত্রকে উৎখাত করলেও তার ফলস্বরূপ পরপর ১৭টি সরকার ক্ষমতায় আসে এবং দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক স্থবিরতা দেখা দেয়। নেপাল ও বাংলাদেশ উভয় দেশের সাম্প্রতিক উদাহরণগুলো দেখিয়েছে যে, ডিজিটাল সমন্বয় সরকারি ব্যবস্থায় বিঘœ ঘটাতে পারদর্শী হলেও তা সরকার গঠনে ব্যর্থ হয়। যে ভাইরাল কাঠামো ক্ষোভ ছড়িয়ে দেয়, তাতে শাসনকার্য পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ধারাবাহিক আলোচনা, দক্ষতা এবং আস্থা খুব কমই থাকে।

তবে, সিজেপি একটি মিমকে আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত করে সেই প্রতিবন্ধকতাকে চূড়ান্তভাবে অতিক্রম করেছে বলে মনে হচ্ছে। এই একটিমাত্র প্রাথমিক কৌশলগত পদক্ষেপ আন্দোলনটিকে ডিজিটাল ভাইরালতার গণ্ডি ছাড়িয়ে নিয়ে গেছে এবং প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে অভিযোগগুলোকে সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর নীতিগত দাবিতে রূপান্তরের একটি পথ তৈরি করে দিয়েছে। উপরন্তু এর কাঠামো সিজেপি-কে এমন এক সাংগঠনিক গভীরতা দিয়েছে, যা বেশির ভাগ নেতৃত্বহীন গণ-অভ্যুত্থান কখনোই অর্জন করতে পারে না। এই আন্দোলনটি এমন একধরনের বৈধতাও ভোগ করে যা তুলনীয় অন্যান্য আন্দোলনের ক্ষেত্রে বিরল। এটি ধর্মীয় ভেদাভেদ নির্বিশেষে, বিরোধী রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে এবং এমনকি বিজেপির ঐতিহ্যবাহী সমর্থক গোষ্ঠীর একাংশের কাছ থেকেও সমর্থন পায়।

তবে, সেই বৈধতা আন্দোলনটিকে রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধ থেকে রক্ষা করতে পারবে না। ডিজিটাল আন্দোলনকে দমন করার জন্য ভারতের প্রশাসনিক ব্যবস্থার হাতে অনেক উপায় আছে। প্রথমটি হলো ইন্টারনেট বন্ধের মাধ্যমে সরাসরি প্রবেশাধিকার সীমিত করা। ২০১২ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে, দেশব্যাপী ৬৩৭টি প্রভাবিত জেলার মধ্যে ৫০১টিই ছিল বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে এবং যেখানেই হিন্দু-মুসলিম উত্তেজনা বা ধারাবাহিক প্রতিবাদ বেড়েছে, সেখানেই ইন্টারনেট বন্ধের শঙ্কা তীব্রভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

কেন্দ্র নয়; বরং রাজ্য সরকারগুলোই এই ইন্টারনেট বন্ধের বেশির ভাগ নির্দেশ জারি করে, যা শাসক দলকে সেসব প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করে দেয়ার জন্য একটি বিকেন্দ্রীভূত ব্যবস্থা দেয়, যেগুলোর ওপর মিমগুলো নির্ভর করে। এই দমনপীড়ন থেকে কেন্দ্রীয় প্রশাসন লাভবান হয়, আর আনুষ্ঠানিক দায় গিয়ে পড়ে রাজ্যের স্বতন্ত্র কর্মকর্তাদের ওপর।

দ্বিতীয় উপায়টি হলো আখ্যান নিয়ন্ত্রণ। মোদির অধীনে ভারতের গণমাধ্যম জগৎ সরকার-ঘনিষ্ঠ উপস্থাপনার দিকে ঝুঁকে থাকে, যেখানে ভিন্নমতকে দেশবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করার ঝুঁকি থাকে। প্রশাসন তার নিজস্ব ডিজিটাল পদচিহ্ন এবং মূলধারার গণমাধ্যমের ওপর তার প্রভাব ব্যবহার করে সিজেপি-কে বিরোধী দলের প্রক্সি বা তুচ্ছ নিষ্ক্রিয় আন্দোলন হিসেবে নতুনভাবে উপস্থাপন করতে পারে, যা সেই একই মনোযোগের অর্থনীতির জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, যা আন্দোলনটিকে তার প্রাথমিক মাত্রা দিয়েছিল।

ভারতে চলমান এই আন্দোলনের পরবর্তী পরিণতি কী হবে, তা একটি অমীমাংসিত প্রশ্ন। সিজেপি একটি আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক পরিকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে সেই বাধা অতিক্রম করেছে যা বেশির ভাগ নেতৃত্বহীন আন্দোলনকে থামিয়ে দেয়। সেই পরিকাঠামো ক্রমাগত প্রশাসনিক চাপ সহ্য করতে পারবে কি না এবং সরকারের হরতাল ও আখ্যানের কৌশলগুলো সমকক্ষদের দ্বারা পুনরুৎপাদনের ওপর নির্মিত একটি আন্দোলনকে ভেঙে দিতে সক্ষম হবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। টিকে গেলেও, সিজেপি তৃণমূলের বৈধতাকে নির্বাচনী বা নীতিগত ফলাফলে রূপান্তরিত করতে পারবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। তেলাপোকা লাখ লাখ বছর ধরে টিকে আছে চালাক হয়ে নয়; বরং অভিযোজন না থামিয়ে। ভারতের ডিজিটাল পরিমণ্ডলে এখন ছড়িয়ে পড়া তেলাপোকার মিম যেমনটা ইঙ্গিত দেয়, ভারতীয় যুবসমাজ এই দ্রুত অভিযোজন ক্ষমতাই এখন প্রদর্শন করছে।