৫ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য দিন। চব্বিশের এই দিনে ছাত্র-জনতার আন্দোলন পরিণত হয় গণ-অভ্যুত্থানে। কর্তৃত্ববাদী, ফ্যাসিস্ট শাসনের অবসান ঘটে। খুলে যায় নতুন বাংলাদেশের সম্ভাবনার দরজা। কিন্তু ইতিহাস শুধু বিজয়ের গল্প লিখে থেমে থাকে না, বিজয়ের পরের পরীক্ষাও নেয়। তাই ৫ আগস্টের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন, আগস্টের বিজয়, তারপর কী? প্রশ্নটি কোনোভাবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অর্জনকে ছোট করার নয়; বরং এর বিপরীত। যারা রাজপথে দাঁড়িয়েছেন, জীবন দিয়েছেন, রক্ত দিয়েছেন, তাদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান দেখানোর জন্যই এই প্রশ্ন তুলতে হবে।
৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতন ঘটিয়েছে। কিন্তু শুধু সরকার পরিবর্তন কি গণ-অভ্যুত্থানের লক্ষ্য ছিল? জুলাইয়ের রাজপথে মানুষ শুধু একজন ফ্যাসিস্ট শাসকের বিদায় চায়নি। মানুষ চেয়েছিল ভয়মুক্ত বাংলাদেশ। চেয়েছিল ভোটের অধিকার, আইনের শাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। চেয়েছিল দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র।
অর্থাৎ জুলাইয়ের লড়াই শুধু ক্ষমতার পালাবদলের জন্য ছিল না। ছিল রাষ্ট্রের চরিত্র বদলের জন্য। এখানেই ৫ আগস্টের পরের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পতন দ্রুত ঘটতে পারে। কিন্তু সেই ব্যবস্থার রাজনৈতিক সংস্কৃতি ভাঙা কঠিন। আরো কঠিন নতুন সংস্কৃতি তৈরি করা। কর্তৃত্ববাদ শুধু এক ব্যক্তির মধ্যে থাকে না। এটি প্রতিষ্ঠানে থাকে, প্রশাসনে থাকে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থায় থাকে। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে থাকে। তাই একজন শাসকের বিদায় মানে কর্তৃত্ববাদের চূড়ান্ত বিদায় নয়।

ক্ষমতা কার হাতে গেল, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো- ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আমরা কি আগের সেই সংস্কৃতিতে ফিরে যাচ্ছি? আবার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছি? ভিন্নমতকে শত্রু হিসেবে দেখতে শুরু করেছি?
এ প্রশ্নগুলো অস্বস্তিকর। কিন্তু প্রয়োজনীয়। কারণ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কোনো এক দলের সম্পত্তি নয়। এটি গণমানুষের অভ্যুত্থান। আরেকটি বড় শক্তি ছিল তরুণ প্রজন্ম। তারা দেখিয়েছেন, রাজনীতি থেকে তরুণদের দূরে রাখার চেষ্টা দীর্ঘদিন চালানো যায় না। রাষ্ট্র যখন তরুণদের স্বপ্নের সাথে দূরত্ব তৈরি করে, তখন একসময় সেই দূরত্ব বিস্ফোরণে রূপ নেয়। শহীদ আবু সাঈদের বুক পেতে দাঁড়িয়ে যাওয়ার দৃশ্য শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসেও প্রতিরোধের অনন্য প্রতীক হয়ে থাকবে। তার মতো অসংখ্য তরুণ ও সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগ জুলাইকে গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত করেছেন।
এই রক্তের ঋণ কীভাবে শোধ হবে? শুধু স্মৃতিসৌধ নির্মাণ বা দিবস পালন করে নয়। রক্তের ঋণ শোধ করতে হলে এমন বাংলাদেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে আর কোনো আবু সাঈদকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক পেতে দাঁড়াতে না হয়।
এখানে বিচার একটি বড় বিষয়। জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার হতে হবে। তবে তা হতে হবে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়। বিচার প্রতিশোধে পরিণত হলে জুলাইয়ের ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একইভাবে সংস্কারও হতে হবে বাস্তবসম্মত। নির্বাচনব্যবস্থা, প্রশাসন, পুলিশ, বিচারব্যবস্থা, দুর্নীতি দমন, গণমাধ্যম-রাষ্ট্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। এ কাজ সহজ নয়। কিন্তু জুলাইয়ের পর বাংলাদেশের কাছে সহজ পথ বেছে নেয়ার সুযোগও নেই।
গণতন্ত্রের কথাও বলতে হবে। ভোটের অধিকার ছাড়া গণতন্ত্র পূর্ণ হয় না। কিন্তু শুধু ভোটেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না। নির্বাচনের পরও গণতন্ত্রকে প্রতিদিন চর্চা করতে হয়। বিরোধী মতকে সম্মান করতে হয়। সংবাদমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হয়। জুলাইয়ের আগে আমরা দেখেছি ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ কী ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। সেই অভিজ্ঞতা ভুলে গেলে চলবে না।
জুলাই আমাদের আরো একটি শিক্ষা দিয়েছে; জনগণকে অবহেলা করে কোনো সরকারই নিরাপদ থাকতে পারে না। অর্থনীতি খারাপ হলে মানুষ তার প্রভাব অনুভব করেন। বেকারত্ব বাড়লে তরুণরা হতাশ হন। দ্রব্যমূল্য বাড়লে সাধারণ মানুষের জীবন কঠিন হয়। দুর্নীতি বাড়লে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা কমে যায়। প্রশাসনে বৈষম্য থাকলে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ জমে। এগুলো শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়। রাজনৈতিকও। কারণ রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হয় নাগরিকের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা থেকে।
জুলাইয়ের পর বাংলাদেশের সামনে তাই সবচেয়ে বড় কাজ- মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হবে, ক্ষমতা জনগণের জন্য। জনগণ ক্ষমতার জন্য নয়। রাজনীতিকদেরও নিজেদের বদলাতে হবে। জুলাইয়ের আগে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি মানুষকে হতাশ করেছিল, সেই সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি হলে ৫ আগস্টের বিজয় অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। দখল, চাঁদাবাজি, পেশিশক্তি, প্রতিহিংসা, দুর্নীতি, দলীয়করণ- এসব থেকে রাজনীতিকে মুক্ত করতে হবে।
অনেকে এসবের মধ্যে জড়িয়ে গেছে। আমরা সবাই তাদের চিনি। তাদের কি কোনো বিচার হবে না? যা ইচ্ছা তাই করে যাওয়া সহজ হবে? জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কিন্তু অন্য বার্তা দেয়। বার্তাটি হলো, এসব চলবে না। চলতে দেয়া হবে না।
৫ আগস্ট বাংলাদেশ দেখেছে মহাশক্তিধররা দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। কেন পালিয়েছে সেই ইতিহাস যদি ক্ষমতাসীনরা ভুলে যান- তাহলে পরিণতি তো সবার জানা।
যে রাজনীতি মানুষের জন্য, সেটিই জুলাইয়ের রাজনীতি। যে রাজনীতি ক্ষমতার জন্য মানুষকে ব্যবহার করে, সেটি জুলাইয়ের রাজনীতি নয়। এ কারণে ৫ আগস্টকে শুধু বিজয় দিবস হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একই সাথে একটি সতর্কবার্তা। ক্ষমতায় থাকা প্রত্যেকের জন্য সতর্কবার্তা।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান আমাদের শিখিয়েছে, জনগণের শক্তিকে অবমূল্যায়ন করা ভয়ঙ্কর ভুল। দুই বছর পর তাই আমাদের সামনে আনন্দের পাশাপাশি আত্মজিজ্ঞাসারও সময় এসেছে। আমরা কী পেয়েছি? কী পাইনি? কোথায় এগিয়েছি? কোথায় পিছিয়েছি? কোথায় জুলাইয়ের স্বপ্ন বাস্তব হয়েছে? আর কোথায় সেই স্বপ্নকে আমরা নিজেরাই সঙ্কুচিত করেছি? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর এড়িয়ে গেলে জুলাইয়ের প্রতি অবিচার করা হবো।
৫ আগস্টের বিজয় ছিল একটি দরজা খোলার ঘটনা। সেই দরজা দিয়ে আমরা কোন বাংলাদেশে প্রবেশ করব, সেটি এখন আসল প্রশ্ন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের মানুষের কাছে উত্তরটা পরিষ্কার। ৫ আগস্টের বিজয়ের পূর্ণতা দিতে জনগণের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এমন বাংলাদেশ, যেখানে রাষ্ট্র কাউকে ভয় দেখাবে না; বরং রাষ্ট্র নাগরিককে নিরাপত্তা দেবে। এমন বাংলাদেশ, যেখানে ক্ষমতাবানও আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে না।
একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। জুলাইয়ের জনআকাঙ্ক্ষা যদি বাস্তবায়ন না হয়, তাহলে কার জন্য হলো না, কাদের জন্য হলো না- সেই প্রশ্ন আসবে। কেউ যদি অভিযুক্ত হন, তাকে দায় বহন করতে হবে। ছাড় পাওয়া যাবে না। জুলাই সনদ কেন বাস্তবায়ন হচ্ছে না? কারা এর বিরোধিতা করছেন? এর উত্তর পেতে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই। সবাই দেখছেন, সবাই জানেন। দায়ীরা পার পেয়ে যাবেন, হিসাবটা অত সহজ নয়।
আজ সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি আবারো করতে হয়- ৫ আগস্ট আমরা বিজয় পেয়েছি। কিন্তু সেই বিজয়ের বাংলাদেশ কি আমরা তৈরি করতে পেরেছি? উত্তর যদি পুরোপুরি ‘হ্যাঁ’ না হয়, হতাশ হওয়ার কারণ নেই। কারণ গণ-অভ্যুত্থান শুধু একটি দিন নয়। এটি একটি চলমান দায়িত্ব। চব্বিশের ৫ আগস্ট তার শুরু। শেষ নয়।
লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন