জুলাই বিপ্লবের দুই বছর পূর্তিতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের সার্বিক গতিপ্রকৃতি নিয়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে এক ধরনের ইতিবাচক মূল্যায়ন সামনে এসেছে। ওয়াশিংটনের এক বিশিষ্ট মার্কিন পর্যবেক্ষকের মতানুসারে, উভয় দেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ঢাকা ও ওয়াশিংটনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সুদৃঢ় ও ইতিবাচক ধারাবাহিকতা রক্ষায় সমর্থ হয়েছে। বর্তমানে এই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অত্যন্ত সুদৃঢ় ও অর্থবহ। এই অগ্রগতির নেপথ্যে রয়েছে উভয় দেশের নীতিনির্ধারকদের সুনির্দিষ্ট ও বাস্তববাদী কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ঘিরে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা তৈরি হয়। অনেক বিশ্লেষকের ধারণা ছিল, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ঢাকা হয়তো যুক্তরাষ্ট্র, চীন কিংবা ভারতের মধ্যে কোনো একটির দিকে ঝুঁকে পড়বে। তবে গত দুই বছরের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে। বাংলাদেশ এক দিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সংলাপ, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রগুলো ক্রমান্বয়ে সুদৃঢ় করেছে; অন্য দিকে চীন, ভারত, জাপান ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথেও সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছে।
বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক উদীয়মান ভূরাজনীতি, কৌশলগত সামুদ্রিক অবস্থান এবং বিস্তৃত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের অপরিহার্য তাৎপর্য ওয়াশিংটনের কাছে ঢাকার গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়েছে। একইভাবে বাংলাদেশও তার তৈরী পোশাকের বিশ্ববাজার, প্রযুক্তি হস্তান্তর, বিনিয়োগ এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রধান অংশীদার বিবেচনা করছে। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক কাল্পনিক আদর্শগত অবস্থানের বদলে পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার দিকে ধাবিত হচ্ছে।
এই আলোচনার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম অনানুষ্ঠানিক পর্যবেক্ষণও উঠে এসেছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে (সামাজিক মাধ্যমে @trahmanbnp) উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, আগস্টের প্রচণ্ড গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় ঢাকায় পশ্চিমা ধাঁচের ব্যবসায়িক স্যুট পরা কতটা অস্বস্তিকর, তা তিনি এখন সম্যকভাবে উপলব্ধি করছেন। এটি মূলত দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক আলোচনার ফাঁকে একটি অনানুষ্ঠানিক পর্যবেক্ষণ, যার রাজনৈতিক প্রভাব অত্যন্ত সীমিত।
সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করলে, জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী এই দুই বছরে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক সম্পর্ক এক নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা এবং সর্বোপরি বিস্তৃত ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলÑ এই চারটি মৌলিক স্তম্ভের ওপর ভর করেই ভবিষ্যতে ঢাকা ও ওয়াশিংটনের সম্পর্কের ভিত গড়ে উঠছে।
বাংলাদেশ প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভারত নীতি’
বাংলাদেশকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণের প্রক্রিয়ায় প্রতিবেশী ভারত নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ। তবে ওয়াশিংটন এখন আর ঢাকার গতিপথকে পুরোপুরি দিল্লির দৃষ্টিভঙ্গির ওপর সঁপে দিতে রাজি নয়; বরং পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের নিরিখে ওয়াশিংটন একটি স্বাধীন ও প্রত্যক্ষ দ্বিপক্ষীয় নীতি জোরদার করছে।
ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল ও ভারতের ভূমিকা : ভারত আধুনিক বিশ্ব রাজনীতির দরবারে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের (IPS) অন্যতম কৌশলগত অংশীদার। এই অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবেলা, ভারত মহাসাগরে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং আঞ্চলিক শক্তিসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের কাছে দিল্লির সহযোগিতা অপরিহার্য। ফলে বাংলাদেশের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী রাষ্ট্র নিয়ে ভারতের নিজস্ব নিরাপত্তা উৎকণ্ঠা ও কৌশলগত মূল্যায়নকে ওয়াশিংটন গুরুত্ব দেয়।
বাংলাদেশের স্বতন্ত্র রূপরেখা : সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আঞ্চলিক ও বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে। বঙ্গোপসাগরের অবস্থান, তৈরী পোশাক খাতের অভূতপূর্ব প্রবৃদ্ধি, দ্রুত বিকাশমান প্রবৃদ্ধি, সামুদ্রিক রুট পরিচালনা এবং রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধান, এসব মৌলিক কারণে বাংলাদেশ এখন আমেরিকার কাছে কেবল ভারতের প্রতিবেশী নয়; বরং স্বতন্ত্র কৌশলগত অংশীদার। ফলে আমেরিকা এখন সরাসরি বাংলাদেশের সাথেই দরকষাকষি করতে আগ্রহী।
ভারসাম্য রক্ষা ও যুক্তরাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতা : ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্কে কখনো কৌশলগত বা রাজনৈতিক টানাপড়েন দেখা দিলে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেয়ার বদলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নেবে। কারণ আমেরিকা যেমন বাংলাদেশকে হারাতে চায় না, তেমনি ভারতকেও অস্বস্তিতে ফেলতে রাজি নয়। সে কারণে সীমান্ত নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সন্ত্রাসবাদ দমন বা বাণিজ্যিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন ভারতকে সাথে রাখার চেষ্টা করবে।
তবে এই সমঝোতার একটি সুস্পষ্ট ভূরাজনৈতিক সীমা আছে। যদি বাংলাদেশের কোনো সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সরাসরি বড় ধরনের সামরিক, প্রযুক্তিগত বা অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী হয়, তবে সেই সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার জন্য ওয়াশিংটন দিল্লির সম্মতির অপেক্ষায় বসে থাকবে- এমন ভাবনা বাস্তবসম্মত নয়। মার্কিনিরা প্রয়োজনে ঢাকার সাথে সরাসরি ও দ্বিপক্ষীয়ভাবে সম্পর্ক গভীরতর করবে, যেমনটি তারা ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া কিংবা ফিলিপাইনের ক্ষেত্রে করেছে।
চীন-বাংলাদেশ কৌশলগত সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্র কতটুকু মেনে নেবে
বর্তমান বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক উদ্দেশ্য বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত দিক থেকে চীন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করা নয়; বরং একটি স্পষ্ট ও সুনিয়ন্ত্রিত সীমা নিশ্চিত করা, যেন বাংলাদেশের ভূখণ্ডে চীনাদের উপস্থিতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব নিরাপত্তা ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের কৌশলগত স্বার্থে প্রত্যক্ষ হুমকি তৈরি না করতে পারে।
ওয়াশিংটন জানে, চীন বর্তমানে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক অংশীদার, অবকাঠামো নির্মাণে প্রধান বিনিয়োগকারী এবং সামরিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জামাদি সরবরাহকারী। এই সুদৃঢ় অর্থনৈতিক নির্ভরতা রাতারাতি বদলে দেয়া সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্র এমনটা প্রত্যাশাও করে না।
তবে নির্দিষ্ট কিছু কৌশলগত ও স্পর্শকাতর ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন তার অবস্থান কঠোর করবে এবং অত্যন্ত সুস্পষ্ট ‘লাল রেখা’ টেনে দিতে পারে :
১. প্রতিরক্ষা ও সামুদ্রিক ক্ষেত্র : বাংলাদেশ যদি চীনের সাথে এমন কোনো সামরিক বা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আবদ্ধ হয়, যার মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের পানিসীমায় চীনের স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি, নৌঘাঁটি কিংবা এমন কোনো ‘দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য’ অবকাঠামো তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়Ñ তবে যুক্তরাষ্ট্র তীব্র বিরোধিতা করবে। কারণ এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির জন্য সরাসরি হুমকি হতে পারে।
২. সংবেদনশীল প্রযুক্তি ও সাইবার নেটওয়ার্ক : টেলিযোগাযোগ খাত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার অবকাঠামো ও সংবেদনশীল ডিজিটাল নেটওয়ার্কে চীনের একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার রোধে আমেরিকা বাংলাদেশকে বিকল্প নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের প্রস্তাব দেবে।
৩. কৌশলগত বন্দর ও সামুদ্রিক অবকাঠামো : গভীর সমুদ্রবন্দর, কৌশলগত টার্মিনাল বা গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ যদি বেইজিংয়ের হাতে পুঞ্জীভূত হয়, তবে ওয়াশিংটন সরাসরি তার কূটনৈতিক সক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে।
অন্য দিকে সাধারণ বাণিজ্য, উৎপাদন খাত, শিল্পায়ন ও ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়নে চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ককে ব্যাহত করার চেষ্টা আমেরিকা করবে না। ঢাকার জন্য আমেরিকার প্রত্যাশিত কূটনৈতিক মডেল হলো, ‘অর্থনীতিতে বহুমুখী সুযোগ গ্রহণ, তবে নিরাপত্তায় অত্যন্ত সতর্ক সামঞ্জস্য’।
দিল্লির ভূরাজনৈতিক সংবেদনশীলতা : বাংলাদেশ, চীন ও মার্কিন সম্পর্ক
ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ঢাকা কি এমন কোনো রাজনৈতিক বা কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, যা ভারতের নিজস্ব আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে অস্থিতিশীল করে? সেই নিরিখে ভারত বাংলাদেশের সামগ্রিক পররাষ্ট্রনীতিকে শেষ পর্যন্ত মেনে নিলেও কিছু স্পষ্ট ও অনমনীয় লাল রেখা সংরক্ষণ করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্ক : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের সুসম্পর্কের ক্ষেত্রে দিল্লি পুরোপুরি রক্ষণশীল নয়। কারণ বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ভারত ও আমেরিকার কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক নানা টানাপড়েনের মধ্যেও ঘনিষ্ঠ পর্যায়ে অবস্থান করছে। ফলে বাংলাদেশ যদি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, জলবায়ু তহবিল কিংবা সামুদ্রিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি করে, তবে ভারত সেটিকে নেতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার না-ও করতে পারে। তবে বাংলাদেশের ভেতরে আমেরিকান সামরিক উপস্থিতি তৈরি হলে তা দিল্লির জন্য উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে।
চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক : চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতে সংবেদনশীলতা বিদ্যমান। চীনের যেকোনো পদক্ষেপে ভারতের নীতিনির্ধারকরা প্রখর দৃষ্টি রাখেন। ভারত বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চীনের সাথে সাধারণ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, শিল্পায়নে বিনিয়োগ ও সড়ক-বিদ্যুৎ খাতের অবকাঠামোগত ঋণ সহজেই মেনে নেবে। কিন্তু ভারতের মূল উদ্বেগের জায়গা তৈরি হবে যদি বেইজিং বঙ্গোপসাগরের কোনো বন্দরে কৌশলগত প্রবেশাধিকার পায় কিংবা সংবেদনশীল প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও নজরদারি ব্যবস্থায় চীনকে বাংলাদেশে সুযোগ দেয়া হয়।
এই পরিস্থিতিতে ভারতের পররাষ্ট্র কৌশল হবে সরাসরি চাপ প্রয়োগ করতে না পারলে একটি বাস্তবমুখী ভারসাম্যপূর্ণ পন্থা অবলম্বন করা। দিল্লি চাইবে বাংলাদেশ যেন কখনোই পুরোপুরি চীনকেন্দ্রিক বা বিদেশী পরাশক্তি বলয়ের অনুগত রাষ্ট্রে পরিণত না হয়।
চীনের কৌশলগত দৃষ্টিকোণ : ঢাকা-ওয়াশিংটন-দিল্লি অক্ষ
বেইজিংয়ের সার্বিক পররাষ্ট্রনীতির প্রেক্ষাপট বিচারে বলা যায়, বেইজিং সরকার বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের স্বাভাবিক কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে স্বাভাবিক বাস্তব বলেই গণ্য করে। তবে সেই সম্পর্ক যদি পরোক্ষ বা সরাসরিভাবে চীনের নিজস্ব সার্বভৌমত্ব, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রুট বা সামুদ্রিক নিরাপত্তাকে ঘিরে ফেলার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়, তবেই চীন কঠোর অবস্থান গ্রহণ করবে।
চীন ভালোভাবেই জানে যে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্পের প্রধান গন্তব্য এবং অন্যতম বৃহৎ বিনিয়োগের উৎস। একইভাবে ভারত বাংলাদেশের ভৌগোলিক নিকটতম প্রতিবেশী। তাই ওয়াশিংটন বা দিল্লির সাথে ঢাকার স্বাভাবিক কূটনৈতিক আলোচনায় বেইজিং সেভাবে আপত্তি জানায় না।
চীনের মূল আপত্তির জায়গা হয় তখন, যখন বাংলাদেশ মার্কিন নেতৃত্বাধীন সরাসরি কোনো চীনবিরোধী সামরিক জোটের অংশীদার হয় কিংবা বঙ্গোপসাগরে আমেরিকান বা বিদেশী বাহিনীর স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি গঠনের অনুমতি দেয়া হয়।
চার পরাশক্তি ও ওআইসি : প্রত্যাশা ও বাস্তবতার তুলনামূলক সারণি
বাংলাদেশের ভৌগোলিক গুরুত্বের দরুন চারটি প্রধান পরাশক্তি ও অর্থনৈতিক জোটÑ ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থাভুক্ত দেশগুলোÑ প্রত্যেকেই বাংলাদেশকে নিজ নিজ অক্ষের অনুকূলে দেখতে চায়। তাদের সুনির্দিষ্ট চাহিদা ও আপত্তির তুলনামূলক চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো :
উপসংহার : বাংলাদেশের জন্য ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’-ই একমাত্র পথ
জুলাই বিপ্লবের দুই বছর পূর্তিতে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র কৌশলের মূল মূল্যায়ন হলো, কোনো একক পরাশক্তির ছায়াতলে আশ্রয় নেয়া কিংবা কোনো নির্দিষ্ট আঞ্চলিক অক্ষের দিকে অন্ধভাবে ঝুঁঁকে পড়া বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
বাংলাদেশের সবচেয়ে টেকসই, কার্যকর ও ফলপ্রসূ কূটনৈতিক নীতি হবে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ রক্ষা করা। এর বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে চার স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে :
১. ভারতের সাথে সীমান্ত সুরক্ষা, নদীর ন্যায্য পানিবণ্টন, রাজস্বের বিনিময়ে ট্রানজিট সুবিধা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা।
২. চীনের সাথে বিশ্বমানের ভৌত অবকাঠামো, বিদ্যুৎ খাত, শিল্পায়ন ও বিপুল বাণিজ্য বৃদ্ধি।
৩. যুক্তরাষ্ট্রের সাথে উচ্চপ্রযুক্তি হস্তান্তর, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য জোরদার, বিনিয়োগ ও সামুদ্রিক সুরক্ষা।
৪. ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর সাথে সুদৃঢ় মুসলিম ভ্রাতৃত্ব, শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, সামরিক সহযোগিতা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক একাত্মতা।
বিপ্লব-পরবর্তী এই পরিবর্তনশীল নতুন ভূরাজনৈতিক বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশ যদি তার সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রেখে প্রতিটি আন্তর্জাতিক শক্তিকে জাতীয় স্বার্থের মানদণ্ডে পরিচালনা করতে পারে, তবেই ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার এই চ্যালেঞ্জকে বাংলাদেশ তার বিকাশমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার অভূতপূর্ব সুযোগে রূপান্তর করতে পারবে।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত