আটক ও বাজেয়াপ্ত পণ্য নিষ্পত্তিতে নতুন বিধান
Printed Edition
- নিলামের আগে দাবিদারকে ৭ দিনের নোটিশ দিতে হবে
- স্বর্ণ, অস্ত্র ও নিষিদ্ধ পণ্য নিষ্পত্তিতে আলাদা ব্যবস্থা
চোরাচালান, আমদানি-রফতানি আইন লঙ্ঘনসহ বিভিন্ন অভিযোগে আটক ও বাজেয়াপ্ত পণ্য নিষ্পত্তিতে নতুন স্থায়ী আদেশ জারি করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আদেশে সাধারণ পণ্য নিলামের ক্ষেত্রে ই-নিলাম বা লাইভ ই-অকশনকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট শ্রেণীর পণ্য সরকারি প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে নিলাম ছাড়াই বিক্রি বা হস্তান্তর এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ধ্বংসের পদ্ধতিও নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া দাবিদারকে পণ্য ফেরত নেয়ার সুযোগ দিতে সাত কর্মদিবসের নোটিশ দেয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
গত সোমবার এনবিআরের কাস্টমস শাখা থেকে ‘অখালাসকৃত বা চোরাচালানের অভিযোগে আটক ও বাজেয়াপ্তকৃত পণ্যের নিষ্পত্তি পদ্ধতি সংক্রান্ত স্থায়ী আদেশ, ২০২৬’ জারি করা হয়। এতে স্বাক্ষর করেন এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব। নতুন আদেশের মাধ্যমে ২০২৫ সালের ২ জুলাই জারি করা এ-সংক্রান্ত আগের স্থায়ী আদেশ বাতিল করা হয়েছে।
কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর ধারা ৯৪-এর সাথে পঠিতব্য ধারা ২৩৭ ও ২৬৬-এ দেয়া ক্ষমতাবলে নতুন আদেশ জারি করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, পচনশীল পণ্য দ্রুত নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ২০২২ সালে জারি করা সংশ্লিষ্ট এসআরও এবং ২০২৪ সালের সংশোধিত এসআরও কার্যকর থাকবে।
নতুন বিধান অনুযায়ী, কাস্টমস, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর, কোস্টগার্ড ও আনসারসহ আটককারী কর্তৃপক্ষকে জব্দ করা পণ্য নিকটস্থ কাস্টমস গুদামে জমা দিতে হবে। মূল্যবান ধাতু, হীরা, জুয়েলারি ও বৈদেশিক মুদ্রার ক্ষেত্রে স্বীকৃত যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানের সনদ নেয়ার বিধান রাখা হয়েছে। সনদ না পাওয়া গেলে এসব পণ্য সাময়িকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রাখা যাবে।
সাধারণ পণ্য সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা এবং মূল্যবান ধাতু ও বৈদেশিক মুদ্রা সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত গুদামে গ্রহণ করা হবে। পচনশীল পণ্য অফিস সময়ের পরও গ্রহণ করা যাবে। পণ্য জমা দেয়ার সময় আটককারী কর্তৃপক্ষকে তিন প্রস্থ আটক প্রতিবেদন দিতে হবে। গুদাম কর্মকর্তা পণ্যের মডেল, ব্র্যান্ড, পরিমাণ ও মূল্যসহ প্রয়োজনীয় তথ্য রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করবেন।
মূল্যবান ধাতু ও বৈদেশিক মুদ্রা গুদামে নেয়ার পর জরুরি ভিত্তিতে পুলিশ প্রহরায় নিকটস্থ বাংলাদেশ ব্যাংক বা ট্রেজারি ব্যাংকে জমা দিতে হবে। কোনো বিচারিক প্রক্রিয়া দুই মাসের মধ্যে শেষ না হলে এসব পণ্য বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেয়ার নির্দেশনা রয়েছে। অন্যান্য পণ্য গুদামের আয়তন ও শ্রেণী অনুযায়ী এমনভাবে সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে সহজে শনাক্ত ও পরিদর্শন করা যায়।
পণ্য নিষ্পত্তির আগে আমদানিকারক, রফতানিকারক, এজেন্ট বা দাবিদারকে দাবি প্রতিষ্ঠার সুযোগ দিতে সাত কর্মদিবসের নোটিশ দিতে হবে। ডাক, কুরিয়ার, ই-মেইল, পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি, ডিজিটাল যোগাযোগ বা নোটিশ বোর্ডের মাধ্যমে নোটিশ দেয়া যাবে। নির্ধারিত সময়ে দাবি প্রমাণিত হলে এবং প্রযোজ্য শুল্ক-কর ও জরিমানা পরিশোধ করা হলে পণ্য খালাসের সুযোগ থাকবে। দাবিদার না পাওয়া গেলে বা দাবি প্রমাণিত না হলে আইন অনুযায়ী পণ্য রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করে নিষ্পত্তি করা হবে।
নিলামের জন্য সংশ্লিষ্ট কমিশনার অ্যাডিশনাল কমিশনার বা জয়েন্ট কমিশনারকে আহ্বায়ক করে এক বা একাধিক কমিটি গঠন করবেন। নিলাম ও গুদামসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এতে সদস্য থাকবেন। প্রয়োজনে অন্যান্য সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিকেও অন্তর্ভুক্ত করা যাবে।
নিলামযোগ্য পণ্য বিক্রিতে এনবিআরের চালু করা লাইভ ই-অকশন বা ই-নিলামকে প্রধান পদ্ধতি হিসেবে রাখা হয়েছে। ই-নিলাম সম্ভব না হলে প্রকাশ্য, তাৎক্ষণিক বা সিল্ড নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা যাবে। ই-নিলামে প্রথম নিলামকেই চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচনা করা হবে। সফটওয়্যার দরদাতাদের তুলনামূলক তালিকা তৈরি করবে। নিলাম কমিটি সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য দরদাতা নির্বাচন করে কমিশনারের অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করবে। তিন কর্মদিবসের মধ্যে কমিশনারকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে হবে।
নিলামে অংশ নিতে প্রতিষ্ঠানকে হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স, মূসক নিবন্ধন, টিআইএন ও আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রত্যয়নপত্র থাকতে হবে। ব্যক্তিশ্রেণীর দরদাতার জাতীয় পরিচয়পত্র, টিআইএন ও আয়কর রিটার্নের প্রত্যয়নপত্র লাগবে। প্রতিটি লটের সংরক্ষিত মূল্যের ৫ শতাংশ ফেরতযোগ্য জামানত দিতে হবে।
নিলামের কমপক্ষে সাত কর্মদিবস আগে একটি জাতীয় ও একটি স্থানীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং এনবিআর ও সংশ্লিষ্ট দফতরের ওয়েবসাইটে তা প্রচারের বিধান রয়েছে। আগ্রহী ক্রেতাদের নিলামের আগে পণ্য পরিদর্শনের সুযোগ দিতে হবে। প্রচলিত নিলামে প্রথম দফায় সংরক্ষিত মূল্যের অন্তত ৬০ শতাংশ দর পাওয়া গেলে বিক্রির সুপারিশ করা যাবে। বিক্রি না হলে দ্বিতীয় ও তৃতীয় নিলাম এবং প্রয়োজনে মেগালট তৈরির মাধ্যমে পরবর্তী নিলামের ব্যবস্থা করা যাবে।
নতুন আদেশে কিছু পণ্য নিলাম ছাড়াই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে দেয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। চিনি, লবণ, ডাল ও সয়াবিন তেলসহ পচনশীল পণ্য টিসিবি কিনতে আগ্রহী হলে বোর্ড নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করা যাবে। স্বর্ণ, রৌপ্য, প্লাটিনাম, হীরা, জুয়েলারি ও বৈদেশিক মুদ্রা বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেয়ার বিধান রয়েছে। বিস্ফোরক, আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মতামতের ভিত্তিতে প্রতিরক্ষা বাহিনী বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা যাবে।
এ ছাড়া বিদেশী সিগারেট ও মদ্যজাতীয় পণ্য নির্ধারিত শর্তে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের কাছে বিক্রি করা যাবে। প্রতœসম্পদ জাদুঘর বা সরকারি দফতরে এবং প্রাণী বা প্রাণীর দেহাবশেষ বন বিভাগ বা সংশ্লিষ্ট দফতরে দেয়া যাবে। ওষুধের কাঁচামাল ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের অনুমোদন সাপেক্ষে সরকারি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রির সুযোগ রাখা হয়েছে।
নিলামে বিক্রি সম্ভব নয় এমন নিয়ন্ত্রিত, নিষিদ্ধ, গুণগত মান নষ্ট বা ধ্বংসযোগ্য পণ্য বিশেষায়িত সংস্থার কাছে বিনামূল্যে হস্তান্তর করে ধ্বংস বা নিষ্ক্রিয় করা যাবে। আমদানি-রফতানি নীতি বা অন্যান্য আইনে নিষিদ্ধ এবং মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্যও ধ্বংসের আওতায় থাকবে। ধ্বংসের আগে পণ্যের বিস্তারিত তালিকা তৈরি করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট কমিটির উপস্থিতিতে ধ্বংস কার্যক্রম সম্পন্ন করে প্রতিবেদন দিতে হবে।