তীব্র দূষণের ভয়ানক মাশুল গুনছে ঢাকা
Printed Edition
- চার কারণে দূষণ
- ৯ বছরে দূষণমুক্ত ৩১ দিন
- দৈনিক মৃত্যু ১৮৮
- গড় আয়ু কমছে ৭ বছর
তীব্র দূষণের ভয়ানক মাশুল গুনছে ঢাকা। বাতাসে ছড়িয়ে পড়া মাত্রাতিরিক্ত বিষ জনস্বাস্থ্যকে ভয়ানক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী চার কারণে ছড়িয়ে পড়া দূষণে বিগত ৯ বছরে মাত্র ৩১ দিন দূষণ সহনীয় ছিল ঢাকার বাতাস। বছর হিসাব করলে মাত্র তিন থেকে চারদিন দূষণমুক্ত বাতাস পান নগরবাসী। এতে মানুষের গড় আয়ু কমছে ৭ বছর করে। আর প্রাণহানি হচ্ছে দিনে ১৮৮ জনের এবং বছরে ৬৮ হাজার ৭০৩ মানুষের। সবচেয়ে বেশি মারা যান হৃদরোগে। জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। এ ছাড়া শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি,গড় আয়ু হ্রাস ও অকাল মৃত্যু, অর্থনৈতিক ক্ষতি, শ্বাসকষ্ট ও ফুসফুসের সমস্যা, হৃদরোগ ও স্ট্রোক, ফুসফুসজনিত রোগ, গর্ভপাত ও জন্মগত ত্রুটি, নিউমোনিয়া, আয়ু কমে যাওয়া ও অকাল মৃত্যু ডেকে আনছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) সর্বশেষ গবেষণা অনুযায়ী, ঢাকা শহরের বাতাস বছরে গড়ে মাত্র তিন থেকে চার দিন সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত থাকে। বছরের বাকি ৩৬১ দিনই সহনীয় মাত্রায় চেয়ে বেশি দূষিত থাকছে।
গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিগত ২০১৬ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৯ বছরে ঢাকাবাসী মাত্র ৩১ দিন অর্থাৎ শতকরা হিসাবে মাত্র ১ শতাংশ ভালো বাতাসে শ্বাস নিতে পেরেছেন। যা বছরে গড়ে ৩.৪ দিন। পুরো ২০২৪ সালে মধ্যে দু’দিন ঢাকার বাতাস সম্পূর্ণ নির্মল ছিল।
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউট (ইপিআইসি) কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ বৈশ্বিক প্রতিবেদন ‘এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্স’ অনুযায়ী, তীব্র বায়ুদূষণের কারণে ঢাকা শহরের একজন বাসিন্দার গড় আয়ু প্রায় ৬.৯ বছর কমে যাচ্ছে। অন্য দিকে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ শিল্প এলাকাগুলোতে দূষণের মাত্রা তীব্র হওয়ায় মানুষের গড় আয়ু ৭ বছরেরও বেশি কমছে।
চলতি বছরের জুলাই মাসে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের প্রকাশিত একটি সমীক্ষায় বলা হয়, শুধুমাত্র ঢাকা শহরেই প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৮৮ জন এবং বছরে ৬৮ হাজার ৭০৩ মানুষ বায়ুদূষণের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাবে মারা যান।
অপর দিকে একই কারণে অসুস্থ হয়ে জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং ঢাকা শিশু হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে এক হাজার ৫০০ থেকে দুই হাজার রোগী চিকিৎসা নেন।
গবেষণা অনুযায়ী, বাতাসে ভাসমান অতি সূক্ষ্ম বিষাক্ত কণা ফুসফুস ভেদ করে রক্তে মিশে যাওয়ায় প্রতিদিন মানুষ হৃদরোগ ক্রনিক রেসপিরেটরি ডিজিজ (দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্ট ও সিওপিডি) ফুসফুসের ক্যানসার আক্রান্ত হচ্ছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বছরে ৩৭ হাজার ৫১৯ জন মারা যান। এরপর ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস ও অ্যাজমায় বছরে আট হাজার ৩৪৪ জন, ফুসফুসের ক্যানসারে গড়ে ৮১১ জন মারা যান।
স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান এবং ক্যাপসের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার নয়া দিগন্তকে বলেন, প্রতি বছর সর্বোচ্চ ২ শতাংশ করে বায়ুদূষণের পরিমাণ বাড়ছে। এর মধ্যে আন্তঃমহাদেশীয় বায়ুদূষণ ৩০ ভাগ, রান্নার লাকড়ি ২৮ ভাগ, বিদ্যুৎকেন্দ্র ২৪ ভাগ, ইটভাটা ১৩-১৫ ভাগ, নির্মাণকাজ ১১ ভাগ, বর্জ্য পোড়ানো ১১ ভাগ এবং যানবাহন ৫ ভাগ দেশের বাতাসকে দূষিত করছে। অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজ, ফিটনেসবিহীন পরিবহন আর ইটভাটা ঢাকার বাতাসকে দূষিত করছে।
তার ভাষ্য, ঢাকার বাতাস মূলত বর্ষাকালে নিয়মিত বৃষ্টির কারণে সাময়িকভাবে পরিষ্কার হয়। জুলাই মাসকে ঢাকার সবচেয়ে কম দূষণযুক্ত মাস হিসেবে গণ্য করা হয়। শীতকাল নভেম্বর থেকে মার্চ এই শুষ্ক সময়ে বাতাস সবচেয়ে বেশি দূষণযুক্ত থাকে। বৃষ্টি না থাকা, চারপাশের ইটভাটার ধোঁয়া এবং ধুলাবালির কারণে শীতকালে ঢাকার বাতাস স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ১৬ গুণ বেশি দূষিত হয়ে পড়ে। এর প্রধানকারণ চার কারণ তুলে ধরে তিনি জানান, স্থানীয়ভাবে আমাদের ইটভাটা ও শিল্পকারখানাগুলোর নির্মাণকাজ, বর্জ্য পোড়ানোর কাজগুলো শীতে একযোগে শুরু হয়। অন্য দিকে দেশের উত্তর দিক থেকে ‘ট্রান্স বাউন্ডারি এয়ার পলিউশন’ ও বায়ুদূষণের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। আর এ সময়ে যেহেতু বৃষ্টিপাত কম থাকে, সবকিছু শুকনা অবস্থায় থাকে, এজন্য বায়ুদূষণের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। তিনি বলেন, ঢাকা বা পুরো বাংলাদেশকে যদি বায়ুদূষণের মাত্রা কমিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত নিরাপদ সীমায় (৫ মাইক্রোগ্রাম) আনা সম্ভব হয়, তবে ঢাকার মানুষের গড় আয়ু তাৎক্ষণিকভাবে ৬.৯ বছর বৃদ্ধি পাবে।
শ্যামলীর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট টিবি (যক্ষ্মা) হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা: আয়েশা আক্তার বলেন, ঢাকার তীব্র বায়ুদূষণের কারণে জনস্বাস্থ্যকে মারাত্মক শারীরিক ব্যাধি, গড় আয়ু হ্রাস এবং বিপুল অর্থনৈতিক লোকসানের মতো বড় মাশুল গুনতে হচ্ছে। তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিরাপদ সীমার চেয়ে ঢাকার বাতাসে ক্ষতিকর পিএম কণার উপস্থিতি অনেক বেশি, যা সরাসরি মানুষের রক্তে ও ফুসফুসে প্রবেশ করছে। এতে করে মানুষের মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি ও জটিল রোগব্যাধি শ্বাসকষ্ট ও ফুসফুসের রোগ, ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস ও অ্যাজমা বা হাঁপানির প্রকোপ তীব্রভাবে বাড়ছে। এর ফলে ফুসফুসের ক্যানসারের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। নিয়মিত মাথাব্যথা, চোখের জ্বালাপোড়া এবং ত্বকে অ্যালার্জির সমস্যা দেখা দিচ্ছে। শৈশবেই দূষিত বাতাসের সংস্পর্শে আসায় শিশুদের ফুসফুস পূর্ণাঙ্গভাবে বিকশিত হতে পারছে না। গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রে অকাল প্রসব, গর্ভপাত এবং কম ওজনের শিশু জন্মের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে।