তদন্তের মধ্যেই ব্রিতে ১২ বিজ্ঞানীর পদোন্নতি

আইনি নোটিশের পর বোর্ডের সিদ্ধান্ত নিয়োগ ও সিনিয়রিটি নিয়ে প্রশ্ন

Printed Edition

গাজীপুর মহানগর প্রতিনিধি

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে (ব্রি) সরকারি আদেশ বাস্তবায়ন নিয়ে বিরোধের তদন্ত চলমান থাকা অবস্থায় ১২ জন সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসারকে (এসএসও) প্রিন্সিপাল সায়েন্টিফিক অফিসার (পিএসও) পদে পদোন্নতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। গত ১৩ আগস্ট অনুষ্ঠিত ব্রির ৯৩তম বোর্ড অব ম্যানেজমেন্ট সভায় এসব পদোন্নতি অনুমোদন করা হয়।

ব্রির একাধিক সূত্র জানায়, ১৩ আগস্ট অনুষ্ঠিত ৯৩তম বোর্ড সভায় ১২ জন বিজ্ঞানীর পিএসও পদে পদোন্নতি অনুমোদন করা হয়। এর আগে গত ৬ আগস্ট কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট সাত কর্মকর্তাকে আইনি নোটিশ দেয়া হয়। নোটিশে গত ৩ মে কৃষি মন্ত্রণালয়ের জারি করা আদেশ বাস্তবায়নে বাধা, ব্রির প্রধান ফটক ও প্রশাসনিক ভবনে তালা, পুলিশের সাথে ধস্তাধস্তি এবং সিসিটিভি, ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও গুরুত্বপূর্ণ নথি ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করা হয়।

অভিযোগকারীদের দাবি, চার সদস্যের তদন্ত কমিটির কার্যক্রম শেষ হওয়ার আগেই ওই ঘটনার সাথে অভিযোগের সূত্রে আলোচিত কয়েকজনকে পদোন্নতি দেয়ায় ভবিষ্যতে তদন্তে দায় প্রমাণিত হলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া জটিল হতে পারে। তাদের আশঙ্কা, চলমান তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যেই পদোন্নতির মাধ্যমে বিতর্কিত ব্যক্তিদের অবস্থান আরো শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে ড. হাবিবুর রহমান মুকুলের পদোন্নতি নিয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ৩ ও ৪ মে ব্রিতে সৃষ্ট উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে তিনি অন্যতম ভূমিকা পালন করেন।

পদোন্নতি পাওয়া ১২ জনের মধ্যে জিকিউএন বিভাগের ড. তাপস কুমার সরকারও রয়েছেন। তার এসএসও পদে নিয়োগের বৈধতা নিয়ে গাজীপুরের প্রথম সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে ৩৮৮/১২ নম্বর মামলা চলমান রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ওই মামলায় তার নিয়োগ প্রক্রিয়া বেআইনি ও অবৈধ ঘোষণার আবেদন করা হয়েছে।

জিকিউএন বিভাগের সাবেক প্রধান ও সাবেক মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (সিএসও) ড. মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকীর অভিযোগ, নিয়োগের সময় ড. তাপস কুমার সরকারের বয়স নির্ধারিত সীমার বেশি ছিল। বাছাই কমিটি তার আবেদন বাতিল করলেও পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে নিয়োগ দেয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন।

ড. মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী আরো অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে ড. তাপস কুমারকে ব্রি বিজ্ঞানী সমিতির সাধারণ সম্পাদকও করা হয়েছিল।

বোর্ড সভায় পদোন্নতি পাওয়া ১২ জনের মধ্যে কয়েকজন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সুবিধা পেয়েছেন বলেও অভিযোগ করেছেন ব্রির কয়েকজন বিজ্ঞানী। তাদের মধ্যে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের ডেপুটি স্পিকারের ভাতিজা শাহ আশাদুল ইসলামের নামও রয়েছে। তবে তিনি বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের ড. মোহাম্মদ আবুল মনসুরের পদোন্নতি নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। তিনি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালের আত্মীয় বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। তার পদোন্নতিতে অর্থ লেনদেন হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। যদিও তিনি এসব অস্বীকার করেছেন। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তৎকালীন ‘ফ্যাসিস্ট’ মহাপরিচালক ড. শাহজাহান কবীরের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত আনিসুজ্জামান লিটন, রেজোয়ান ভূঁইয়া ও রতœা রানী মজুমদারের পদোন্নতি নিয়েও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে। এসব বিষয়ে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ব্রি সূত্র আরো জানায়, সম্প্রতি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে পদোন্নতি নীতিমালা অনুযায়ী ব্রির সিএসও ও এসএসও পদে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পদোন্নতি প্রদান করেন সদ্য বিদায়ী মহাপরিচালক ড. খালেকুজ্জামান। এ জন্য তিনি ব্রি-তে বেশ প্রশংসিত হন। অথচ সদ্য যোগদানকারী ডিজি ড. রফিকুল ইসলাম নীতিমালা উপেক্ষা করে জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের বঞ্চিত করে তার নিজস্ব বলয়ে থাকা বিজ্ঞানীদের সুবিধা দিতে পদোন্নতি প্রদান করেন, যাদের মধ্যে আওয়ামী ঘরানার বিজ্ঞানীরাও রয়েছেন। এতে সাধারণ বিজ্ঞানীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। ডিজির নির্ধারিত মানদণ্ডে পদোন্নতি দেয়ায় ড. নিলুফার ইয়াসমিন শেখ, ড. মনিরুজ্জামান কবীর, ড. শাহনাজ পারভীন, ড. মোজাম্মেল হক, ড. প্রিয় লাল বিশ্বাস, ড. বিধান চন্দ্র নাথ, ড. কামরুজ্জামানসহ অনেক সিনিয়র বিজ্ঞানী পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

অস্তিত্বহীন পদ সৃষ্টির অভিযোগ : ব্রির নিয়োগ-পদোন্নতি নিয়ে আলোচনায় এসেছে প্রশাসনের কয়েকটি পদও। অভিযোগ রয়েছে, সহকারী পরিচালক (স্টোর) কাওছার আহমেদকে ‘সিনিয়র সহকারী পরিচালক (প্রশাসন)’ পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ব্রির বিদ্যমান প্রবিধানে এ পদের অস্তিত্ব নেই। তাকে পদোন্নতি দেয়ার জন্যই ৭ম গ্রেডের একটি অস্থায়ী পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। একইভাবে ফার্ম ম্যানেজার মোহাম্মদ জহিরুল হককে অস্থায়ীভাবে সৃজিত ‘ফার্ম সুপারিনটেনডেন্ট’ পদে এবং মাঠকর্মী (এসএ) মৌসুমী আক্তারকে ফার্ম ম্যানেজার পদে পদোন্নতি দেয়ার অভিযোগ রয়েছে।

কাওছার আহমেদের বিরুদ্ধে ব্রিতে গত ১৫ বছরের নিয়োগ, পদোন্নতি ও অন্যান্য কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে একটি কমিটি কাজ করছে বলেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ড. মো: ইব্রাহীমকে আহ্বায়ক করে গঠিত ওই কমিটির তদন্ত চলমান থাকা অবস্থায় তার পদোন্নতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।

মুকুলের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ : ব্রি বিজ্ঞানী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড. হাবিবুর রহমান মুকুলের বিরুদ্ধে সরকারি চাকরির পাশাপাশি ফ্ল্যাট ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে। কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, গাজীপুরের ছায়াবিথী এলাকায় তার মালিকানাধীন একটি আবাসন প্রকল্প থেকে কাওছার আহমেদ ফ্ল্যাট কিনেছেন। এ কারণে তাদের মধ্যে স্বার্থের সম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া ড. মুকুলের বিরুদ্ধে সরকারি শ্রমিক ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার, নিজের গাড়ি ব্রির বিভিন্ন প্রকল্পে ভাড়ায় ব্যবহার এবং সরকারি সফর সংক্ষিপ্ত করে পূর্ণ মেয়াদের টিএ/ডিএ গ্রহণের অভিযোগও রয়েছে। একই সফরের ব্যয় রাজস্ব ও প্রকল্প, দুই খাত থেকে নেয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।

ব্রির কয়েকজন বিজ্ঞানী নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা নেয়া ব্যক্তিদের একটি অংশের সাথে বর্তমানে বিএনপিপন্থী পরিচয় দেয়া কিছু বিজ্ঞানীর সমঝোতা তৈরি হয়েছে। ড. হাবিবুর রহমান মুকুলের নেতৃত্বে এমন একটি বলয় পুরনো অনিয়মকে আড়াল করে নতুন করে নিয়োগ-পদোন্নতিতে প্রভাব বিস্তার করছে বলেও তাদের অভিযোগ।

মহাপরিচালকের বক্তব্য : ব্রির মহাপরিচালক (রুটিন দায়িত্ব) ড. মো: রফিকুল ইসলাম এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘যারা এসব তথ্য দিয়েছে তাদেরকে নিয়ে আমার দফতরে আসুন, আমি সব বুঝিয়ে বলে দিব।’