শেখ হাসিনার শাসনামলে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশন (ইসি) কার্যত ছিল সরকারের তল্পিবাহক। তখন সংসদ থেকে স্থানীয় যত নির্বাচন হয়েছে, তা ছিল নির্বাচনী তামাশা। আসলে সরকারের পছন্দের ব্যক্তিকে কিভাবে জয়ী ঘোষণা করা যায়, তা-ই ছিল ইসির একমাত্র কাজ। হাসিনার শাসনামলে ইসি তার ক্ষমতা নিজেই খর্ব করে।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান-উত্তর অন্তর্বর্তী সরকার দেশে ব্যাপক সংস্কার কাজে হাত দিয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় কার্যক্রমে বেশ কিছু পরিবর্তন আনতে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনের প্রস্তাব করেছে ইসি। যাতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়।
সংশোধনীগুলোর মধ্যে রয়েছে- কোনো আসামিকে আদালত পলাতক ঘোষণা করলে সংসদ নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হতে পারবেন না। সংসদ নির্বাচনে অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়া যাবে না। আরপিওতে আরো কিছু সংশোধনী আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ে গত মঙ্গলবার পাঠানো প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে- সশস্ত্রবাহিনীকে সংজ্ঞাভুক্ত করা। এতে সেনা, বিমান ও নৌবাহিনীর সদস্য ভোটকেন্দ্রে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের ক্ষমতা পাবেন। কোনো আসনে একক প্রার্থী থাকলে ‘না’ ভোটের ব্যবস্থা রাখা, ভোট বন্ধে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানো, জামানতের পরিমাণ বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করা, প্রার্থীর হলফনামায় দেশ ও বিদেশে থাকা সম্পদের হিসাব দেয়া বাধ্যতামূলক করা প্রভৃতি।
উল্লিখিত প্রস্তাবগুলোর মধ্যে পলাতক আসামির প্রার্থী না হতে পারার বিষয়টি ছিল মূলত নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের। তখন ইসি এ প্রস্তাবের সাথে দ্বিমত করেছিল। মার্চে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনকে লিখিতভাবে ইসি বলেছিল, এমন বিধান অসদুদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতে পারে।
স্মরণযোগ্য যে, আমাদের দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এমন, কোনো একজন সম্ভাব্য প্রার্থীর নামে মামলা দেয়া হলো, তাকে আদালতে যেতেও বাধা দেয়া হলো, আদালত তাকে না পেয়ে পলাতক ঘোষণা করলেন। তবে গুরুতর কোনো অভিযোগ ছাড়া কাউকে সাধারণত আদালত ফেরারি ঘোষণা করেন না। তবু এ বিধান ইসিকে পক্ষপাতহীন এবং বাস্তবতার আলোকে প্রয়োগ করতে হবে।
ফ্যাসিবাদ-উত্তর দেশে নতুন বাস্তবতায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ আগের চেয়ে কিছুটা বেড়েছে। এর পরও যদি ভবিষ্যতে এর অপব্যবহার হয়- তখন পর্যালোচনা করা যেতে পারে। সঙ্গত কারণে ইসির এই প্রস্তাব যৌক্তিক বলে আমাদের কাছে মনে হয়েছে।
ইসির প্রস্তাবে আরো যা রয়েছে- লাভজনক প্রতিষ্ঠানে থাকা ব্যক্তি নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। এখানে লাভজনক প্রতিষ্ঠান বলতে যার ৫০ শতাংশের বেশি শেয়ার সরকারের। মনোনয়নপত্রের সাথে সর্বশেষ বছরের আয়কর রিটার্ন, দেশে ও দেশের বাইরে থাকা সম্পদের হিসাব দিতে হবে। প্রার্থী হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিলে ইসি তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে পারবে। মিথ্যা তথ্যের জন্য প্রার্থিতা বাতিল করা যাবে এবং নির্বাচিত হওয়ার পরও তার সংসদ সদস্য পদ হারাবেন। রাজনৈতিক দল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা অনুদান নিতে পারবে। ৫০ হাজার টাকার বেশি অনুদান নিলে ব্যাংকের মাধ্যমে নিতে হবে। ভোট বন্ধ ও ফল স্থগিতে ইসির আগের ক্ষমতা ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
আমরা মনে করি, আরপিওতে যেসব সংশোধনীর প্রস্তাব ইসির তরফ থেকে করা হয়েছে তা সময়োপযোগী। এগুলো সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনে সহায়ক হবে।