চব্বিশের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান, দেশের ইতিহাসে বাঁক বদলের এক অপূর্ব সোপান। বাংলাদেশের ১৮০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে ঘুরে দাঁড়ানোর এক যুগান্তকারী অধ্যায়।

২০২৬ সাল, জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন কাদা-ছোড়াছুড়ি, মেরুকরণ ও বিভাজন যেভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে, ভবিষ্যতের জন্য তা বড় ধরনের সতর্কবার্তা। অতিসম্প্রতি সহযোদ্ধা থেকে পরস্পর প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠার যে আলামত এখন শুধু রাজপথে, মাঠেঘাটে নয়, জাতীয় সংসদের ভিতর পর্যন্ত দৃশ্যমান। পক্ষ-শক্তির অন্যতম দায়িত্ব হচ্ছে, পরিবেশ উত্তপ্ত হতে না দেয়া। না হলে সরকারের ইতিবাচক অনেক কাজ এগিয়ে নিতে সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। তাই পক্ষশক্তির উচিত প্রতিপক্ষকে কোনোভাবে স্পর্শকাতর কোনো বিষয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য যেন না করা হয়। ভালো কাজের জন্য সুষ্ঠু পরিবেশ অপরিহার্য। রাজনৈতিক অঙ্গনের বিরাজমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে পর্যবেক্ষকরা ভবিষ্যতের বিপদবার্তা আন্দাজ করছেন। তাদের অনুমান, পক্ষ-বিপক্ষের সৃষ্ট দূরত্বের ফাঁকফোকর দিয়ে অবাঞ্ছিত কোনো রাজনৈতিক শক্তির অনুপ্রবেশের প্রেক্ষাপট তৈরি হতে পারে। তখন পক্ষ-প্রতিপক্ষ উভয়ের জন্যই প্রাসঙ্গিকতা হারানোর শঙ্কা তৈরি হতে পারে। পক্ষ-বিপক্ষের দূরত্ব যদি গভীর হতে থাকে তাহলে অপশক্তির অনুপ্রবেশের আশঙ্কায় জনগণের কপালের ভাঁজ আরো স্পষ্ট হয়ে উঠবে। দুর্ভাগ্যক্রমে ওই আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নিলে, কেউ কিন্তু রেহাই পাবে না। যেমন ঘোর অন্ধকারে হিংস্র নখ-দন্তের দংশনে ক্ষত-বিক্ষত দেহ নিয়ে বনবাদাড়ে আশ্রয় নিলেও অমাবস্যার স্বরূপ অবলোকন করতে হয়। অন্ধকারের বিপদ থেকে কেউ রক্ষা পায় না। তেমনি অবাঞ্ছিত রাজনৈতিক শক্তি যদি অনুপ্রবেশে সফল হয়; এই অপশক্তি যাদের হাত ধরে ফিরবে, তারা দিল্লির সুহৃদ হলেও তাদের সুরক্ষা থাকবে না। আর এই যাত্রায় তাদের আর রোখা যাবে না। বাংলাদেশকে যথেচ্ছ ব্যবচ্ছেদ করে এ দেশের অন্তরাত্মা খুবলে খাবে। তাদের এ দেশীয় অনুচররা ইতোমধ্যে দেশের সাংস্কৃতিক সীমান্ত মুছে ফেলার যাবতীয় পরিকল্পনা, প্রকল্প সম্পন্ন করতে চলেছে। সাংস্কৃতিক সীমান্ত উঠে গেলে, ভৌগোলিক সীমান্ত মুছে দিতে মুহূর্তকাল বিলম্ব হবে না। তখন অখণ্ড ভারতের স্বপ্নও অপূর্ণ থাকবে না। সেই সাথে বাংলাদেশের স্বপ্ন ভেঙে খান খান হয়ে যাবে। এমন পরিস্থিতি হলে দেশের আমজনতা কাউকে ক্ষমা করবে না।

চব্বিশের শেষ ধাপে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ঘিরে বাংলাদেশকে নিয়ে গোটা বিশ্বে সহানুভূতি-সহমর্মিতা জেগে উঠেছিল। বিশ্ববাসী আমাদের তরুণদের আত্মত্যাগ ও সাহসিকতার প্রশংসা করেছে, প্রবীণদের প্রজ্ঞার স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু পাশা উল্টে গেলে কেউ আর ফিরেও তাকাবে না। ইরানে মার্কিন আগ্রাসন নিয়ে গোটা পৃথিবী হতচকিত ছিল। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে সৃষ্ট পরিস্থিতি নিয়ে কারো তেমন কোনো মাথাব্যথা থাকবে না।

ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জাতীয় এজেন্ডা নিয়ে, কারো বা দলীয় স্বার্থের প্রতি মনোযোগী হয়ে ওঠার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে তা জাতীয় ঐক্যে ফাটল ধরার কারণ হয়ে উঠতে পারে। সচেতন ব্যক্তিমাত্র সাম্প্রতিক সময়ের এই মতপার্থক্যে শঙ্কিত। কেবল আবেগ দিয়ে সব কিছু বিবেচনায় নিলে কখনো সঙ্কটের সুরাহা হওয়ার নয়।

মুদ্রার অপর পিঠও আছে। সেটি দেখে নেয়ার প্রয়োজন ভুলে গেলে চলবে না। ‘হাফ হার্টেড’ থাকা বাঞ্ছনীয় নয়। এই সময়ের রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রধান দাবি, রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রয়োজনীয় সংস্কার। যেমন- বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, পুলিশপ্রশাসন, নির্বাচন কমিশন ইত্যাদি। পতিত ফ্যাসিবাদী জমানায় ব্যক্তি ও দলের প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধন, আইন বিভাগ, আদালতসহ হেন কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না, যেটিকে যথেচ্ছ অপব্যবহার করা হয়নি। জনগণ নয়, দেশের মালিক মোক্তার বনেছিলেন ব্যক্তি ও দল। তাদের এমন ধারণা স্বৈরাচারী হয়ে ওঠা তথা সব ক্ষমতা নিজের হাতে তুলে নেয়ার আকাক্সক্ষাপ্রসূত। যে পাদুকা পায়ে দিয়ে তারা যেভাবে দেশ শাসন (দায়িত্ব পালন নয়) করেছে, সেই একই পাদুকা পরে দেশের গণতন্ত্রায়নের যাত্রা কতটা সম্ভব হবে? এমন ব্যবহার অনুপযোগী পাদুকার কবল থেকে দেশকে মুক্ত করতে হলে সংস্কার কতটা প্রয়োজন; এ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের অভিমত জানা জরুরি বৈকি।

দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সর্বসম্মত স্বাক্ষরে সংস্কারের একটি সনদ চূড়ান্ত রূপ পেয়েছিল। এটি মূলত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারে বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার যৌথ অঙ্গীকারনামা। গণভোটে দেশবাসী বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সেটি অনুমোদন করেছে। এখন যদি এ সনদ বাস্তবায়ন করা না হয়, তাহলে বাংলাদেশ বহুমুখী সঙ্কটে পড়তে পারে। সম্ভাব্য প্রধান সঙ্কটগুলো এমন হতে পারে।

গণতান্ত্রিক উত্তরণে বাধা : এই সনদ বাস্তবায়িত না হলে ফের ভঙ্গুর ও প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন-ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে, যা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার দিকে ঠেলে দেবে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও রাজনৈতিক মেলবন্ধন হুমকিতে পড়বে। একই সাথে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির অভাব ও স্বৈরতন্ত্রের পুনরুত্থানের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যায় না।

পুরনো ব্যবস্থার স্থায়ীকরণ : পুলিশ, জনপ্রশাসন, বিচার বিভাগ এবং নির্বাচন কমিশনের সংস্কার না হলে, নির্বাচন আগেই সিলেকশনে রূপ নেবে। আগের শাসনামলের মতো রাষ্ট্রযন্ত্র ফের দলীয়করণের কবলে পড়তে পারে।

ক্ষমতার অপব্যবহার : ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করার যে অঙ্গীকার সনদে আছে, তা পূরণ না হলে ভবিষ্যতে আবারো কর্তৃত্ববাদী বা স্বৈরতান্ত্রিক শক্তির উত্থানের পথ সুগম হবে। বিশেষ করে ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের চেতনার অবমাননা ও সামাজিক অসন্তোষের কারণ ঘটতে পারে। সাধারণ মানুষ চলমান ব্যবস্থার ওপর চরমভাবে আস্থা হারাবে। সংস্কারের আকাক্সক্ষা অপূর্ণ থাকলে তরুণসমাজ এবং জনগণের মধ্যে হতাশা ক্ষোভে রূপ নিতে পারে। এর ফলে দেশে আবার তীব্র সামাজিক অস্থিরতা, গণবিক্ষোভ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে, যা একসময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক প্রভাব : অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিতিশীলতা সরাসরি দেশের অর্থনীতি ও বিনিয়োগে আঘাত হানবে। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন, যা কর্মসংস্থান ও মুদ্রাস্ফীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

আন্তর্জাতিক ভাবমর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়া : আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের এই রাজনৈতিক ঐকমত্য এবং সংস্কারপ্রক্রিয়া অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে দেখছিল। সনদ বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সমর্থন দুর্বল হতে পারে। সংক্ষেপে, ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ কেবল একটি রাজনৈতিক দলিল নয়, এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্র মেরামতের ঐতিহাসিক সুযোগ। এটি বাস্তবায়িত না হলে, দেশ সংস্কারহীনতার বৃত্তে আষ্টেপৃষ্ঠে আটকা পড়বে।

শেষকথা : চব্বিশের জুলাইয়ের রক্তের দাগ শুকানোর আগেই ছাব্বিশের বিভাজন দেশবাসীকে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, সেই অভ্যুত্থান কেবল একটি সরকারের পতনই শেষ কথা নয়। রাজনৈতিক দলগুলো যদি পুরনো মানসিকতা বদলে একটি গণতান্ত্রিক এবং জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করতে না পারে, তাহলে ভবিষ্যতের বার্তাটি খুব আশঙ্কাজনক।

রাজনৈতিক দলগুলো যদি অভ্যন্তরীণভাবে স্থিতিশীলতা তৈরি করতে না পারে- বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা হারাতে পারে। এ ছাড়া অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়তে পারে। অর্থনীতি, পানিনীতি, পররাষ্ট্রনীতি ও শিল্প বিকাশে ব্যাপকভিত্তিক যেসব পরিকল্পনা চলছে; তাকে ফলপ্রসূ করতে ন্যূনতম জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই।

বাংলাদেশের জন্মের পর থেকে রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের ভেতর দিয়ে কাল কাটিয়েছে। তাই দুর্নীতি দমন, শিক্ষার উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্যের পরিচর্যা, জীবনমানের উন্নয়ন ও আইনের শাসন- সবই অধরা থেকে যাবে। এর একমাত্র পরিণতি, দেশের কোটি কোটি মানুষের কষ্টের রজনীর কখনো অবসান না ঘটা। রৌদ্রোজ্জ্বল সকাল দেখার সৌভাগ্য খোয়ানো।

লেখক : সম্পাদক, নয়া দিগন্ত

ndigantababar@gmail.com