সীমান্তে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সামরিক নিরাপত্তা প্রস্তুতি
মিয়ানমারে সশস্ত্র গৃহযুদ্ধ
Printed Edition
- সশস্ত্র সঙ্ঘাতের কারণে ফের রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের আশঙ্কা
- অনুপ্রবেশ বন্ধ এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বিজিবির জিরো টলারেন্স
- ভারতের নাগাল্যান্ড, মনিপুরে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর তৎপরতা বাড়ছে
বুধবার রাতে সীমান্ত এলাকার সবাই তখন গভীর ঘুমে। হঠাৎ বিকট বিস্ফোরণের শব্দে আতঙ্কে ঘুম ভাঙে গ্রামবাসীর। প্রথমে ভূমিকম্প মনে করলেও ঘুম ভাঙার পর ভেসে আসে আরো বিস্ফোরণের শব্দ। মাটির কম্পনে কেঁপে ওঠে বাড়িঘর। এরপর আর বুঝতে বাকি থাকেনি যে শব্দে মাটি কেঁপে উঠেছে সেটি মিয়ানমার থেকে আসা বিস্ফোরণের শব্দ। ততক্ষণে টেকনাফ, উখিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়ির গভীর ঘুম থেকে জেগে ওঠা মানুষের নির্ঘুম রাত কাটে আতঙ্কে।
মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ এখন বাংলাদেশ সীমান্তে এক চরম নিরাপত্তা সঙ্কট তৈরি করেছে। বিগত কয়েক মাস ধরে আরাকান আর্মি (এএ) এবং মিয়ানমার জান্তা বাহিনীর মধ্যে চলমান তীব্র সংঘর্ষের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত এলাকায়। লাগাতার গোলাবর্ষণ, মর্টার শেল নিক্ষেপ এবং আকাশসীমা লঙ্ঘনের ঘটনায় টেকনাফ, উখিয়া ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। সীমান্তের এই সঙ্কট এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সামরিক নিরাপত্তা প্রস্ততি নেয়া হচ্ছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্যিক চুক্তি, চায়নার সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক এবং ভারতের নাগাল্যান্ড, মনিপুর ও আগরতলার চায়না সীমান্তের অংশ এবং সেখানে বিদ্রোহ গোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটায় সীমান্ত নিয়ম মেনে বাংলাদেশের আকাশসীমা, জল ও স্থলের সীমান্ত এলাকায় সঙ্কট তৈরির শঙ্কায় সামরিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা হচ্ছে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই যুদ্ধ কেবল মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং এটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক দীর্ঘমেয়াদি ও বহুমুখী হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বিমান হামলা, সেন্টমার্টিন দ্বীপের মানবিক সঙ্কট এবং কূটনৈতিক টানাপড়েন পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে।
দফায় দফায় বিমান হামলা, কাঁপছে টেকনাফ-উখিয়া সীমান্ত
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনী ও বিদ্রোহীদের লড়াই এখন আকাশযুদ্ধে রূপ নিয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের সীমানায়। দীর্ঘ প্রায় সাত মাস বিরতির পর সম্প্রতি রাখাইনের মংডু ও বুথিডং টাউনশিপে আরাকান আর্মির অবস্থান লক্ষ করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী নজিরবিহীন বিমান হামলা শুরু করেছে। জান্তা বাহিনীর যুদ্ধবিমান এবং ওয়াই-১২ পরিবহন বিমান থেকে একের পর এক শক্তিশালী বোমা ও ৫০০ পাউন্ডের ভারী বোমাবর্ষণ করা হচ্ছে।
এই ধারাবাহিক বিমান হামলার বিকট বিস্ফোরণে বাংলাদেশের টেকনাফের জাদিমুরা, হোয়াইক্যং, হ্নীলা থেকে শুরু করে শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ সীমান্ত এলাকা তীব্র ভূমিকম্পের মতো কেঁপে উঠছে। বিস্ফোরণের তীব্রতায় সীমান্তবর্তী বাড়িঘর প্রকম্পিত হওয়ায় আতঙ্কে মধ্যরাতেও মানুষ ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসছে। নাফ নদীর ওপারে আকাশজুড়ে আগুনের লেলিহান শিখা ও কালো ধোঁয়া স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নজিরবিহীন আতঙ্ক তৈরি করেছে।
সেন্টমার্টিনে মানবিক বিপর্যয়, বিচ্ছিন্ন দ্বীপ, তীব্র খাদ্যসঙ্কট
মিয়ানমার যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ও প্রত্যক্ষ খড়্গ নেমে এসেছে বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনের ওপর। মিয়ানমার সঙ্ঘাতের জেরে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌরুটের নাফ নদীতে চলাচলকারী বাংলাদেশী ট্রলার ও স্পিডবোট লক্ষ্য করে ওপার থেকে দফায় দফায় গুলি চালানো হয়েছে। ফলে নিরাপত্তার স্বার্থে এই রুটে নৌযান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
নৌযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় সেন্টমার্টিন দ্বীপের প্রায় ১০ হাজার বাসিন্দা কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। দ্বীপে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেখানে তীব্র খাদ্য ও জরুরি ওষুধের সঙ্কট দেখা দিয়েছে। চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী, অনেক দোকানেই মজুদ শেষ। মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপের মানুষের মধ্যে এক ধরনের মানবিক বিপর্যয় ও চরম নিরাপত্তাহীনতা জেঁকে বসেছে। সাগরে মিয়ানমারের যুদ্ধজাহাজের টহল এবং সেন্টমার্টিনের কাছাকাছি বোমাবর্ষণ দ্বীপবাসীর আতঙ্ককে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের নতুন শঙ্কা ও ত্রিমুখী সঙ্ঘাত : ২০১৭ সালের নির্মম সামরিক অভিযানের পর বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা এখনো এক বড় মানবিক ও নিরাপত্তা বোঝা। বর্তমান বিমান হামলার কারণে রাখাইন রাজ্যে অবশিষ্ট অংশে রোহিঙ্গারা চরম কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। জানা গেছে, বিমান হামলার সমান্তরালে স্থলপথে আরাকান আর্মির সাথে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর (আরসা ও আরএসও) সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। এই ত্রিমুখী সঙ্ঘাত ও উপর্যুপরি বিমান হামলা থেকে বাঁচতে হাজার হাজার রোহিঙ্গা আবারো বাংলাদেশ সীমান্তে জড়ো হচ্ছে। নাফ নদী পেরিয়ে নতুন করে অনুপ্রবেশের চেষ্টা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। কোস্টগার্ড ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) পুশব্যাক করলেও, দুর্গম সীমান্ত ও নদীপথ ব্যবহার করে চোরাগোপ্তা উপায়ে অনুপ্রবেশ পুরোপুরি ঠেকানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন করে বড় আকারের রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঘটলে তা বাংলাদেশের সমাজ, অর্থনীতি এবং সুরক্ষাবলয়ের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করবে।
অস্ত্রের চোরাচালান ও ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি: সীমান্তে মিয়ানমার বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে তৈরি হওয়া শূন্যতার সুযোগে উগ্রপন্থী গোষ্ঠী, মাদককারবারি এবং অস্ত্র চোরাচালানিরা সক্রিয় হয়ে উঠেছে। মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে ইয়াবা ও আইসের মতো মরণঘাতী মাদকের প্রবাহ বৃদ্ধির পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্রের অনুপ্রবেশের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন সশস্ত্র উপদলের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই তীব্র হয়েছে, যা মিয়ানমারের বর্তমান অস্থিতিশীলতারই প্রতিফলন।
ভূ-রাজনৈতিকভাবে, এই যুদ্ধ বাংলাদেশকে এক জটিল সমীকরণের সামনে দাঁড় করিয়েছে। একদিকে মিয়ানমারের জান্তা সরকার, অন্যদিকে শক্তিশালী হয়ে ওঠা আরাকান আর্মি- দুই পক্ষের সাথেই ভারসাম্য রক্ষা করা ঢাকার জন্য কঠিন পরীক্ষা। আরাকান আর্মি যদি রাখাইনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়, তবে ভবিষ্যৎ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য সরাসরি তাদের সাথেই আলোচনা করতে হতে পারে, যা কূটনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব:) রোকন উদ্দিন নয়া দিগন্তকে বলেন, ঢাকার কূটনৈতিক তৎপরতা আরো জোরালো হওয়া উচিত। বিশেষ করে মিয়ানমারের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী দুই আঞ্চলিক পরাশক্তি চীন ও ভারতের সক্রিয় মধ্যস্থতা ছাড়া এই সীমান্ত উত্তেজনা প্রশমন করা কঠিন হবে। তিনি বলেন, সীমান্তে বিজিবির পাশাপাশি নিয়ম অনুযায়ী সামরিক বাহিনীর ঘাঁটি খুবই জরুরি।
কড়া পাহারায় বিজিবি, সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা : সীমান্তের উদ্ভূত পরিস্থিতি ও সাম্প্রতিক বিমান হামলার পরিপ্রেক্ষিতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং বাংলাদেশ কোস্টগার্ড তাদের জনবল ও নজরদারি সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত করেছে। টেকনাফ, শাহপরীর দ্বীপ, সেন্টমার্টিন এবং নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম সীমান্তে অতিরিক্ত সেনা ও ভারী সরঞ্জাম মোতায়েন করা হয়েছে।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) উপ-মহাপরিচালক (মিডিয়া) কর্নেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ মাহমুদ আজম গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, সীমান্তে কোনো ধরনের উসকানি ঘটনার তাৎক্ষণিক ও কঠোর জবাব দেয়ার জন্য বাহিনীকে ‘স্ট্যান্ডবাই’ রাখা হয়েছে। যেকোনো মূল্যে নতুন করে অনুপ্রবেশ বন্ধ এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বিজিবি জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে।