আমাদের দেশে সরকারি কোম্পানি, সংস্থা, করপোরেশন ও কর্তৃপক্ষ পেশাদার প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠেনি। সব সরকার এগুলো নিজস্ব লোক তোষণের মাধ্যম বানিয়েছে। তবে ফ্যাসিবাদী সরকার দীর্ঘ দেড় দশকে এগুলো স্রেফ লুটপাটের আখড়া বানায়। দলীয় লোক ও তাদের সৃষ্ট চক্র অনেক প্রতিষ্ঠান শুষে ছোবড়া করে দিয়েছে। সরকারও এসব প্রতিষ্ঠান থেকে বিভিন্ন ফান্ডের অর্থ খরচ করেছে, ঋণ নিয়েছে। সরকারের কাছে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপুল পাওনা পড়ে আছে। সরকারের হাতে ন্যস্ত এসব প্রতিষ্ঠানের বড় একটি অংশ এখন শুধু ধুঁকছে শুধু তাই নয়; এগুলোর পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে আছে, যা সামষ্টিক অর্থনীতিতে বিপর্যয় টেনে আনতে পারে।

নয়া দিগন্তের প্রতিবেদন বলছে, দেশের ১২২টি সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের পুঞ্জীভূত দায়ের পরিমাণ আট লাখ ৩৩ হাজার ২১৬ কোটি টাকা। এ হিসাব ২০২৩-২৪ অর্থবছরের। আশঙ্কা করা হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান সম্মিলিত দায় ১০ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের মূল্যায়ন অনুযায়ী, এগুলোর ১৯ প্রতিষ্ঠান খুব উচ্চঝুঁকি, ৩০টি উচ্চঝুঁকি ও ৫০টি মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। সরকারি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা ভালো না হওয়ার অন্যতম কারণ- এর জবাদিহি না থাকা। ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) দেশের ৩৯২টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষকে তাদের অডিট করা আর্থিক প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়। এর মধ্যে ২৮৪টি প্রতিষ্ঠান তাদের প্রতিবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হয়। প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা জবাবদিহি না করে পার পেয়ে যান। এ সংস্কৃতি গেড়ে বসেছে পুরো সরকারি ব্যবস্থাপনায়। দুর্নীতি ও অনিয়মের জন্য খুব কম জবাবদিহির আওতায় তারা অসেন। সরকার-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান অদক্ষতা-অযোগ্যতায়ও ধসে যায়। কর্তাব্যক্তিদের কোনো দায় নিতে হয় না। একইভাবে প্রতিষ্ঠান লোকসানি হয়ে যাওয়ার জন্যও কোনো দায় নিতে হয় না তাদের।

এমন কিছু কল-কারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সরকার চালায়, যেগুলো স্থায়ীভাবে লোকসানি প্রতিষ্ঠান হয়ে গেছে। অথচ সেখানে আছে দামি মেশিনপত্র ও বিপুল সম্পত্তি। এগুলো সরকারি তত্ত্বাবধানে কার্যকরভাবে সচল করা হচ্ছে না। বেসরকারি উদ্যোগে ছেড়ে দিয়ে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানোর চেষ্টাও দেখা যায় না। এগুলো বছরের পর বছর দায় হিসেবে সরকারের ঘাড়ে পড়ে থাকে। কিছু প্রতিষ্ঠান চালু আছে গোষ্ঠী সুবিধা দিতে।

সরকারি স্বায়ত্তশাসিত ও আধা স্বায়ত্তশাসিত মিলে শত শত প্রতিষ্ঠান দেশের জন্য বিশাল একটি দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এগুলো ঘিরে রাজনৈতিক ও আমলাতন্ত্রের দুষ্টচক্র গড়ে উঠেছে। দেশের ঘাড়ে বিশাল দায় চাপলেও এই চক্র অনিয়ম-দুর্নীতি করে ঠিকই আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে। আবার সংস্কার করে প্রতিষ্ঠানগুলো পেশাদার অবস্থানে আনার ক্ষেত্রেও বাধা তৈরি করে।

এগুলো আর্থিকভাবে সবল করতে হলে আত্মীয়করণ, দলীয়করণের বদলে যোগ্যতা অনুযায়ী নিয়োগ-পদোন্নতি ও বদলির নিয়ম বাস্তবায়ন করতে হবে। অনিয়ম-দুর্নীতি দূর করতে শক্তিশালী উদ্যোগ নিতে হবে। সে জন্য আমলাতন্ত্র ও রাজনৈতিক চক্র ভাঙতে হবে। পাশাপাশি দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব উৎসাহিত করতে হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানকে দক্ষ পেশাদার অবস্থায় আনতে বিপুল সংস্কার কার্যক্রমের কোনো বিকল্প নেই।