ছেলের স্কুলের ক্লাসপার্টি। তখন দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ে সে। ক্লাসপার্টি ক্লাসে হয়নি, পার্কে হয়েছে। ধুমধাম আয়োজন। হিন্দি গানের সাথে নাচ। ছেলের সহপাঠীরা নাচে। তাদের মায়েরাও নাচে।

আমার ছেলে ভ্যাবলার মতো দাঁড়িয়ে এসব দেখে। আমিও দেখি- শিশু শিক্ষার্থীদের ‘আনন্দ’ দেখি। আসলে বছরে এই একটা দিন তাদের ‘আনন্দ’। এই আনন্দটুকুও ভাসিয়ে দেয়া হয় হিন্দি গানের সাথে!

শিক্ষার্থীরা স্কুলে যায় পড়তে। একগাঁদা বই কাঁধে নিয়ে গাধার খাটুনি খাটে। ভোর হতে না হতে দৌড়। স্কুল শুরু হওয়ার আগে একদফা ‘প্রাইভেট’, মানে ‘ব্যক্তিগত চেষ্টায় শেখার প্রক্রিয়া’। তারপর স্কুল। ক্লাস শেষে স্কুলেই থাকে বিশেষ কোচিংয়ের ব্যবস্থা। তারপর আবারো ‘ব্যক্তিগত’, মানে প্রাইভেট। সবটা যদি ব্যক্তিগত চেষ্টায় শিখতে হয়, তাহলে শিশুদের স্কুলে পাঠানোর দরকার কী?

স্কুল থেকে শিশুরা কী শিখছে? ভালো নম্বর পেতে হবে, ক্লাসে প্রথম হতে হবে। এসএসসি, এইচএসসিতে জিপিএ ৫ পেতে হবে। এর জন্য কী করতে হবে? মন দিয়ে পড়ালেখা করতে হবে। ভোর থেকে শুরু করে সন্ধ্যা পর্যন্ত বই কাঁধে নিয়ে গাধার মতো খাটতে পারলে পড়ালেখা হয়ে যায়!

এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ ৫ পাওয়ার পর কী হয়? দুই দুইটা সোনালি (গোল্ডেন) জিপিএ ৫ সাথে নিয়ে কী কী অর্জন করা যায়? এই সোনালি চাবি দুটো কি তাদের ক্যারিয়ার গড়ে দিতে পারে?

অনেকের ক্ষেত্রে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে না। তাদের সামনে থোকায় থোকায় সাজানো থাকে হতাশা। হতাশার ভিড়ে শিক্ষার্থীরা এখন ক্লান্ত। জিপিএ ৫ তাড়া করতে গিয়ে তাদের ক্লান্তিতে পেয়ে বসেছে। এই ক্লান্তির ছাপ এবার দেখা গেছে এইচএসসি পরীক্ষায়। পরীক্ষা শুরু হয়েছে কয়েক দিন আগে। দেখা গেছে, প্রথম দিনের পরীক্ষায় অনুপস্থিত ছিল ২৪ হাজার ৭৮৪ পরীক্ষার্থী। গত বছর অনুপস্থিত ছিল ১৯ হাজার ৭৫৯ পরীক্ষার্থী। এর আগের বছর ১৫ হাজার ২০৩ পরীক্ষার্থী। ২০২৩ সালে পাঁচ হাজার ৫২২ পরীক্ষার্থী। এর মানে কী বোঝা গেল? বছর বছর অনুপস্থিতির সংখ্যা বাড়ছে। শিক্ষার্থীদের ক্লান্তির হিসাব এখানে শেষ নয়। এই বছর নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩৬ শতাংশ পরীক্ষা দিতে ফরমই ফিলাপ করেনি। এই হিসাবটাও বছর বছর বেড়ে এখানে এসে দাঁড়িয়েছে।

এ বিষয়ে সহযোগী একটি দৈনিকের বিশেষ প্রতিবেদনে একজন অধ্যাপকের মতামত তুলে ধরা হয়েছে। ওই অধ্যাপক মনে করেন, এই পরিস্থিতির পেছনের কারণ গভীরভাবে খুঁজে দেখা দরকার। আমাদের লেখাপড়ার পদ্ধতিতে দুর্বলতা আছে? নাকি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় দুর্বলতা?

শিক্ষার্থীরা তো পড়াশোনা করতে বিদ্যালয়ে যায়। তাদের পড়াশোনায় সবল করে তোলার দায়িত্ব শিক্ষকদের। পরিবারেরও দায়িত্ব থাকে। পরিবারের দায়িত্বই সবচেয়ে বড়। সন্তানদের পড়াশোনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটা পালন করতে হয় মাকে। ওই যে নেপোলিয়ান বলেছিলেন- আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও, আমি একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দেবো।

এখন প্রশ্ন হলো, ‘শিক্ষিত মা’ বলতে আমরা কী বুঝি? যিনি নিজে জিপিএ ৫ পেয়েছেন এবং সন্তানকে জিপিএ ৫ পেতে রেসের ঘোড়ার মতো খাটান, তিনিই কি শিক্ষিত মা? নাকি যিনি নিজের শিক্ষাজীবনের ব্যর্থতা পুনরুদ্ধারের ভার সন্তানের কাঁধে চাপিয়ে দেন, তিনি শিক্ষিত মা? সংজ্ঞাটা নেপোলিয়ান বোনাপার্ট পরিষ্কার করে গেলে ভালো হতো। শিক্ষিত মায়ের একটা পষ্টাপষ্টি সংজ্ঞা থাকলে সন্তানের শিক্ষার জন্য তাদের এভাবে যুদ্ধে নামতে হতো না।

একশ্রেণীর শহুরে মা আছেন। তারা সন্তানের দেখাশোনায় লোক রেখে দেন। নিজেরা পরিপাটি থাকেন। মজে থাকেন বিলাসিতায়- কাজে ব্যস্ত থাকেন। যখন কাজ না থাকে, তখন ‘পার্টি’ করতে যান। তাদের সন্তানরা ইংরেজি মিডিয়ামে পড়ে। পড়ালেখা হয় বাবা ও মায়ের টাকার জোরে। টাকার জোরে হয়তো ক্যারিয়ার দাঁড়িয়ে যায়। আবার টাকার জোরে বখে যায় এরা। টাকা থাকলে এত কষ্ট করে এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়ার দরকার কী? আমাদের গ্রামের মায়েরা? তারা ভোরে উঠে ধান শুকাতে দেন। পাটের আঁশ ছাড়ান। রোদে পোড়েন, বৃষ্টিতে ভেজেন। সংসারের ঘানি টেনে যান। সন্তানকে লেখাপড়া করাতে হবে, এই গুরুত্বটা তারা বোঝেন। সন্তান বড় অফিসার হবে, বড় চাকরি করবে- এমন স্বপ্ন নিয়ে স্কুলে পাঠান। কিন্তু তাদের ঠিকমতো খেতে-পরতে দিতে পারেন না, পরিচর্যা করতে পারেন না। ক্লাসের ফাঁকে খাবারের বিরতি দেয়া হয়। তখন কি তাদের সন্তানরা কিছু কিনে খেতে পারে? নাকি বাড়ি থেকে খাবার রান্না করে দিয়ে দেয়া হয় তাদের সাথে? ক্ষিধেপেটে পড়ালেখা কতদূর মাথায় ঢুকাতে পারে তারা? মাঠে-ঘাটে খেটে খাওয়া কয়জন মা সন্তানদের বড় হওয়ার মতো শিক্ষা হাতে-কলমে দিতে পারেন?

অথচ মায়ের থেকে সন্তানের সবচেয়ে বড় মানসিক অনুপ্রেরণা পাওয়ার কথা। মা যখন ক্লান্ত থাকেন, সন্তানের হতাশা বুঝে নেয়ার ক্ষমতা তার থাকে না। তারপর সন্তানের পড়ালেখা ড্রপ হওয়ার খবর শুনে আকাশ থেকে পড়েন মা ও বাবারা।

আর যারা জিপিএ ৫ এর চাবুক হাতে তাড়া করে বেড়ান, তাদের সন্তানদেরও ড্রপ হয়। কখনো কখনো পরীক্ষার নম্বর দেখে সেটা আঁচ করা যায় না। তাদের সন্তানদের বড় রকমের মানসিক ড্রপ হয়ে যায়। যা আর কখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয় না।

মাধ্যমিক পার হয়ে উচ্চমাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে থাকে। সময়টা দোলাচলের। ওই সময় বিশ্বজয়ের স্বপ্ন থাকে। কারো ভেতর বাসা বাঁধে হতাশা। তখন ধান শুকোতে দেয়া মায়ের সন্তান পড়ালেখার খরচ জোগাতে পারে না। পার্টিতে যাওয়া মায়ের বখে যাওয়া সন্তানের কাছে এইচএসসি পরীক্ষা পুলসিরাতের মতো হয়ে দাঁড়ায়। আর নিজেদের চেষ্টায় যারা সৃজনশীল হয়ে ওঠে, তারা মুখস্থনির্ভর ও গতানুগতিক শিক্ষাব্যবস্থার ধকল টানতে পারে না। ওই সময়টা সবার জন্য টালমাটাল থাকে। তখনো ডিগ্রি অর্জনের আরো অনেক পথ বাকি থেকে যায় তাদের। এইচএসসি পাস করে অনার্স পড়তে হবে (পাসকোর্স পড়লে মান থাকে না)। তারপর মাস্টার্স। তারপর কী? সেই হিসাব তাদের সামনে থাকে না।

অথচ তাদের একটা স্বপ্ন থাকে। ওই স্বপ্নপূরণে ঠিক কী করতে হবে, সেটা জানা থাকে না। কেউ হয়তো ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়, প্রযুক্তিতে ঝোঁক আছে। দেশ-বিদেশের নানা কিছুর খবরও আছে তার কাছে। ইঞ্জিনিয়ার হতে হলে তাকে গণিত, পদার্থবিদ্যা ভালো করে আয়ত্ত করতে হবে। কিন্তু গণিতে সে কাঁচা, গত বছর পদার্থবিদ্যায় নম্বর পেয়েছে এক’শতে ছাব্বিশ। সুতরাং তার ইঞ্জিনিয়ার হয়ে ওঠা হয় না!

অথচ কেবল ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্নই তাকে ডাকসাইটে একজন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারত, যদি তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আনন্দের সাথে পড়ানো হতো। পদার্থবিদ্যার প্রথম ক্লাসটাই একটি পরিপূর্ণ ল্যাবরেটরিতে হতো। তখন শুরু থেকে সে বুঝে যেত পদার্থবিদ্যার প্রয়োগ কোথায় কোথায় হয়। এমনও হতে পারত- স্কুলে পড়তে পড়তে সে একজন বিজ্ঞানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যেত।

আমাদের দেশে এখন বিজ্ঞানী হতে পারছে কয়জন? যে কয়জনের নাম শোনা যাবে, তারা বাংলাদেশী ঠিক, তবে বিজ্ঞানী হওয়ার পরিবেশ পেয়েছে উন্নত দেশে গিয়ে। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার পরিবেশ নেই। জ্ঞান সৃষ্টির তাড়া নেই। কেবল নতুন করে পুরনোর জাবর কেটে দায় সেরে যাচ্ছি।

এখানে পড়ালেখা শেষ করে বেকার হতে হয়। যাদের ভাগ্য ভালো, তাদের কেউ সুকর্মে ঢুকতে পারেন। কর্মের শিক্ষাটা শিক্ষাজীবনে থাকে না। প্রকৃত কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষার ওপর আমাদের গুরুত্ব কম। অবশ্য কেবল কর্মমুখী শিক্ষায় নির্ভর হয়ে গেলে সমাজ, রাষ্ট্র আকালে পড়ে যাবে। যাদের বুকে কবিতা থাকে না, তাদের মগজে দর্শন থাকে না। আমাদের দরকার সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা। দরকার সাধারণ ও সামাজিক শিক্ষাকে কর্মমুখী উপাদানে সমৃদ্ধ করা। এতে ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান ও সাহিত্যের শিক্ষার্থীদের কেবল শিক্ষক হওয়ার আশায় থাকতে হবে না। অন্য কোনো উপায়েও দাঁড়িয়ে যেতে পারবে তারা।

লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত

smmoshahid@gmail.com