মোহাম্মাদ ওয়ালিউদ্দিন তানভীর
জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান শুধু একটি সরকারের পতন ঘটায়নি, এটি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সামনে একটি গভীর নৈতিক প্রশ্নও রেখে গেছে। প্রশ্নটি হলো- আমরা কি ফ্যাসিবাদী শাসনের বিচার চাই প্রতিশোধ নেয়ার জন্য, নাকি ন্যায়বিচারের জন্য? আমরা কি আওয়ামী লীগের নামে শুধু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চালাব, নাকি রাষ্ট্রীয় অপরাধ, মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম, খুন, নির্যাতন, ভোটাধিকার হরণ ও ক্ষমতার চরম অপব্যবহারের ন্যায়সঙ্গত বিচারিক হিসাব চাইব?

প্রশ্নটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশ যদি শুধু ক্ষমতার পালাবদল দেখে; কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন না দেখে, তাহলে জুলাইয়ের আত্মত্যাগ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন তখন ইতিহাসের অংশ হয়েই থাকবে, রাষ্ট্রের চরিত্র বদলাবে না।

আমরা পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, বিচার প্রতিশোধ নয়। অপরাধীর বিচার করা সভ্য সমাজের দায়িত্ব, রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বিচার ছাড়া কোনো সমাজ নিরাপদ হয় না। আর বিচার পাওয়া ভুক্তভোগীর অধিকার। জুলাই-আগস্ট চব্বিশের ঘটনাবলি নিয়ে জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার দফতরের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা উঠে এসেছে। ইউনিসেফের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই সময়ের সহিংসতায় আনুমানিক এক হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছিলেন, যাদের মধ্যে শতাধিক শিশু ছিল। হিউম্যান রাইটস ওয়াচও বলেছে, ১৫ জুলাই ২০২৪ থেকে সহিংসতা তীব্র হয়, যখন আওয়ামী লীগ-সমর্থক ও পুলিশ শান্তিপূর্ণ ছাত্র-আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা করে এবং নিরাপত্তাবাহিনী অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করে। এগুলো কোনো সাধারণ রাজনৈতিক বিরোধ ছিল না, এগুলো ছিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভয়াবহ অপব্যবহারের অভিযোগ। এসব অপরাধের বিচার চাইলে তা প্রতিশোধ নেয়া হয় না; বরং বিচার না চাইলে সেটি অন্যায়ের সাথে আপস হয়ে যায়।

আমাদের একটি পুরনো রাজনৈতিক অসুখ আছে। যে দল ক্ষমতায় আসে, সে দল রাষ্ট্রকে নিজের সম্পত্তি মনে করে। প্রশাসন, পুলিশ, আদালত, গোয়েন্দা সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, মিডিয়া- সবকিছুর ওপর দলীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। আর যখন ক্ষমতা হারায়, তখন বলে- আমাদের ওপর প্রতিশোধ নেয়া হচ্ছে। এই সংস্কৃতি ভাঙতে হবে। কারণ রাষ্ট্র কারো দলীয় জমিদারি নয়। রাষ্ট্র জনগণের। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা জনগণের নামে ব্যবহৃত হয়; জনগণের বিরুদ্ধে নয়।

আওয়ামী লীগের বিচার বলতে আমরা যদি এমনটি বুঝি যে, যারাই আওয়ামী লীগ করত, তাদের সবাইকে শাস্তি দিতে হবে, তাহলে সেটি হবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা; কিন্তু যারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে মানুষ হত্যা করেছে, গুম করেছে, নির্যাতন করেছে, মিথ্যা মামলা দিয়েছে, নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বংস করেছে, পুলিশ-প্রশাসনকে দলীয় বাহিনীতে পরিণত করেছে, তাদের বিচার চাইলে সেটি প্রতিশোধ নয়; সেটি ন্যায়বিচার। এই পার্থক্যটি সতর্কতার সাথে বুঝতে হবে।

কারণ ন্যায়বিচার ব্যক্তির অপরাধ দেখে, প্রমাণ দেখে; প্রতিশোধ পরিচয় দেখে, আবেগ দেখে। ন্যায়বিচার আদালতের পথে চলে, অপরাধীকে দায়ী করে; প্রতিশোধ একটি গোষ্ঠীকে শত্রু বানায়। ন্যায়বিচার রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে; প্রতিশোধ রাষ্ট্রকে আরো দুর্বল করে।

আমরা যদি জুলাইয়ের পরে আরেক ধরনের দমননীতি তৈরি করি, তাহলে আমরা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে ফ্যাসিবাদেরই আরেক রূপ তৈরি করব। এই ভুল করা যাবে না। যারা অপরাধ করেছে, তাদের বিচার হবে। বিচার হবে আইন আদালতের মাধ্যমে, প্রমাণের মাধ্যমে, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিয়ে, স্বচ্ছ বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। এখানেই আমাদের রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরীক্ষা।

আওয়ামী লীগের অপরাধের বিচার দরকার। বিচার না হলে দেশের রাজনীতি একই চক্রে ঘুরতে থাকবে। আজ এক দল ক্ষমতায় এসে অন্য দলকে দমন করবে, কাল অন্য দল এসে একই কাজ করবে। রাষ্ট্র কখনো নাগরিকের জন্য নিরাপদ হবে না; বরং ক্ষমতাসীন দলের অস্ত্র হয়ে থাকবে। জুলাইয়ের শহীদরা কি শুধু একটি সরকার পরিবর্তনের জন্য জীবন দিয়েছেন? না, তারা এমন এক রাষ্ট্রের দাবি তুলেছিলেন যেখানে মানুষ কথা বলতে পারবে, ভোট দিতে পারবে, প্রতিবাদ করতে পারবে, নিরাপত্তাবাহিনী নাগরিককে শত্রু মনে করবে না, আদালত ক্ষমতাবানের হাতিয়ার হবে না, প্রশাসন দলীয় আনুগত্যের বদলে সংবিধানের প্রতি অনুগত থাকবে। এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে অপরাধের বিচার অপরিহার্য।

আওয়ামী লীগের বিচার সমাজের নিরাপত্তার জন্যও দরকার। রাষ্ট্রীয় অপরাধের বিচার না হলে অপরাধীরা আরো বেপরোয়া হয়। একজন পুলিশ কর্মকর্তা যদি জানেন, ক্ষমতাসীন দলের নির্দেশে অন্যায়ভাবে গুলি করলেও তার বিচার হবে না, তাহলে ভবিষ্যতের কোনো আন্দোলনই নিরাপদ থাকবে না। একজন মন্ত্রী যদি জানেন, গুম, নির্যাতন, দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের দায়ে তাকে কখনো জবাবদিহি করতে হবে না, তাহলে গণতন্ত্র শুধু কাগজে থাকবে। একজন দলীয় ক্যাডার যদি জানে, দলীয় পরিচয় তাকে আইনের ঊর্ধ্বে তুলে দেয়, তাহলে নাগরিকের স্বাধীনতা সবসময় ভয়ের মধ্যে থাকবে। এ জন্যই বিচার শুধু ভুক্তভোগীর দাবি নয়; বিচার সমাজের নিরাপত্তাব্যবস্থার অংশ।

আমাদের রাজনৈতিক বোঝাপড়ার জন্যও এই বিচার দরকার। রাজনীতি মানে ক্ষমতা দখল, ধরে রাখা, প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ করা- এই সংস্কৃতি বদলাতে হলে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে : কোনো দল, নেতা, বাহিনী, কোনো মন্ত্রী, আমলা আইনের ঊর্ধ্বে নয়। এই বার্তা না দিলে বাংলাদেশে গণতন্ত্র নিরাপদ হবে না।

তবে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে যেন বিচার প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রহসনে পরিণত করা না হয়। বিচার যদি প্রমাণের বদলে জনমতের চাপে চলে, তাহলে সেটি ন্যায়বিচার থাকে না। বিচার যদি প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার হাতিয়ার হয়, তাহলে তা ভবিষ্যতের ফ্যাসিবাদের বীজ বপন করে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোও বাংলাদেশে জবাবদিহির কথা বলেছে, একই সাথে বিচারিক প্রক্রিয়া যেন ন্যায়সঙ্গত হয়, সেই প্রশ্নও তুলেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, জুলাইয়ের ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি পাওয়ার অধিকার রাখেন, তবে মৃত্যুদণ্ড বা প্রতিহিংসামূলক বিচার দীর্ঘস্থায়ী পুনর্মিলনের পথ নয়। এ কথার অর্থ হলো- বিচার কঠোর হতে পারে; কিন্তু প্রতিহিংসামূলক হতে পারে না।

বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন একটি নৈতিক রাষ্ট্রীয় অবস্থান : অপরাধের বিচার হবে; কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়ের বিচার হবে না। এই জায়গায় সরকার, আদালত, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ এবং মিডিয়ার দায়িত্ব আছে।

সরকারের দায়িত্ব হলো বিচারিক প্রক্রিয়াকে স্বাধীন, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য রাখা। আদালতের দায়িত্ব আবেগ নয়, আইন ও প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার করা। রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব বিচারকে দলীয় বিজয়ের উৎসবে পরিণত না করা। নাগরিক সমাজের দায়িত্ব ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানো এবং ন্যায়বিচারের মানদণ্ড রক্ষা করা। মিডিয়ার দায়িত্ব হলো বিচারকে তথ্য ও মানবিকতার আলোকে দেখা।

জুলাই আমাদের সামনে একটি সুযোগ এনে দিয়েছে। এটি শুধু আওয়ামী লীগের বাইরে ভিন্নমতের রাজনীতির সুযোগ নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতিকে নৈতিক ভিত্তিতে দাঁড় করানোর সুযোগ।

আমরা ফ্যাসিবাদী শাসনের বিচার চাই। সেই বিচার হবে ভুক্তভোগীর মর্যাদার জন্য, সমাজের নিরাপত্তার জন্য, রাষ্ট্রের নৈতিক পুনর্গঠনের জন্য এবং দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলানোর জন্য।

জুলাইয়ের শিক্ষা এখানেই, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো যেমন দায়িত্ব, তেমনি ন্যায়বিচারকে প্রতিশোধে পরিণত হতে না দেয়াও দায়িত্ব। ফ্যাসিবাদের বিচার করতে হবে। কারণ বিচার ছাড়া গণতন্ত্র নিরাপদ নয়।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

mwtanvir@gmail.com