বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশ সমুদ্রসীমা জয় করেছে, এক যুগের বেশি সময় পার হয়ে গেছে। কিন্তু বিশাল এ জলরাশির বুক থেকে খনিজসম্পদ আহরণে আমাদের অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। অথচ প্রতিবেশী দুই দেশ ভারত ও মিয়ানমার একই সমুদ্র অববাহিকা থেকে বিপুল গ্যাস উত্তোলন করছে। এতে দেশ দু’টির জ্বালানি খাত সমৃদ্ধ হচ্ছে। সম্প্রতি রাখাইন বেসিনে ৯৫ টিসিএফের নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে মিয়ানমার। কৃষ্ণা-গোদাবরি বেসিনে গ্যাস উত্তোলন করছে ভারত। একই বেসিনে প্রতিবেশীরা গ্যাস তুললেও আমরা কেন পিছিয়ে আছি?
বিভিন্ন তথ্য ও ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের অফশোর ব্লকগুলো ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দিয়েছিল আওয়ামী লীগ রেজিম। সেখানে কোনো উল্লেখযোগ্য উৎপাদন বা অনুসন্ধান চালানো হয়নি। আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা কিংবা সুদূরপ্রসারী কৌশলে ব্লকগুলো অচল হয়ে আছে। এতে দেশের জ্বালানি খাত সঙ্কটে নিমজ্জিত হয়েছে।
তরল বা গ্যাসীয় পদার্থ উচ্চ চাপ থেকে নিম্ন চাপের দিকে ধাবিত হয়। বিজ্ঞানের এ সূত্র কাজে লাগাচ্ছে ভারত। সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে গ্যাস তুলে নিচ্ছে। এতে আমাদের ভূ-গর্ভের রিজার্ভে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ১৯৯০ সালে সাদ্দাম হোসেন কুয়েত আক্রমণের একটি কারণ ছিল এটি। একে বলা হয় স্ল্যান্ট ড্রিলিং বা বাঁকা পদ্ধতিতে। ইরাক অভিযোগ করেছিল কুয়েত মাটির নিচ দিয়ে বাঁকা পাইপ ঢুকিয়ে ইরাকের বিখ্যাত রুমায়না অয়েল ফিল্ড থেকে তেল চুরি করছে। আমাদের এখানে আসলে কী হচ্ছে, সেটা খতিয়ে দেখার সময় এসেছে।
দীর্ঘমেয়াদি নিষ্ক্রিয়তার খেসারত হিসেবে আমরা গ্যাসসঙ্কটে ভোগছি। গ্যাসসঙ্কটে ভুগছি লোডশেডিংয়েও। শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে এলএনজি আমদানিতে।
এ পরিস্থিতিতে ভূ-গর্ভের ডাটা ও প্রমাণ সরবরাহ এবং সাশ্রয়ী প্রযুক্তিতে গ্যাস তোলার প্রস্তাব দিয়েছে চীন। সেটার ভালো-মন্দ দিক বিবেচনা করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
ইতোমধ্যে সরকার গভীর ও অগভীর সমুদ্রের ২৬টি ব্লকে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে। পিএসসি-২০২৬-এ যৌক্তিক সংশোধনী এনে তথ্য প্যাকেজের মূল্য অর্ধেক করেছে। এতে ক্রিসএনার্জি বা রিস্টাড এনার্জির মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো আগ্রহ দেখাচ্ছে। এ দরপত্র প্রক্রিয়াকে সফলভাবে সম্পন্ন করতে হবে।
আমরা মনে করি, আন্তর্জাতিক আইন ও ট্র্যাকিং প্রযুক্তির সহায়তায় ভারতসংলগ্ন ব্লকগুলোর ভূ-গর্ভস্থ পরিস্থিতি পরীক্ষা করতে হবে, যেন কোনো ধরনের ‘ক্রস-বর্ডার ড্রিলিং’ বা সম্পদ পাচার না হয়। চীনের প্রস্তাবিত আধুনিক অফশোর ড্রিলিং প্রযুক্তিকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি দরপত্রে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘বাপেক্সের’ সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন, যেন দীর্ঘমেয়াদে গভীর সমুদ্রে নিজস্ব অনুসন্ধান পরিচালনার ভিত্তি তৈরি করা যায়।