মো: গোলাম হোসেন
‘জুলাই বিপ্লব’ নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে স্বতন্ত্র ও মহীয়ান। আধুনিক মারণাস্ত্রে সজ্জিত সরকারের নানা বাহিনী ও পেশিশক্তির মোকাবেলায় বিপ্লবীরা ছিল সম্পূর্ণ নিরস্ত্র ও সম্বলহীন। সর্বোপরি অন্য বিপ্লবীদের মতো এ বেলা তারা ক্ষমতা দখলে নিতে চায়নি এবং নেয়ওনি। ক্ষমতা না চাইলেও তাদের চাওয়া-পাওয়া যে ছিলই না তা কিন্তু নয়। জাতির কাছে একটি সুন্দর রাষ্ট্রকাঠামোর অঙ্গীকারই ছিল তাদের চাওয়া। পুরো জাতি এই প্রশ্নে ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই সনদ নামে এক অঙ্গীকারনামায় সইও করল। তার ওপর ভিত্তি করে একটি নির্বাচন আর গণভোটও হলো। আজকের প্রধানমন্ত্রীকে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ময়দানে ক্যাম্পেইন করতেও দেখা গেল। ৬৯ শতাংশ মানুষ জুলাই সনদের পক্ষে রায়ও দিলো। সর্বোপরি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে গণভোটের বৈধতাও স্বীকৃত হলো।
সংসদের মতো জায়গায় দাঁড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কোনো রকম রাখ-ঢাকের তোয়াক্কা না করেই বলে দিলেন, নির্বাচন পিছিয়ে যাওয়া ঠেকাতেই তারা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছেন। এভাবে ওয়াদা ভঙ্গকে বৈধতা দেয়া হলে রাজনীতিবিদের বিশ্বাসযোগ্যতা কোথায় ঠেকে?
গণরায় বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় বাধা নাকি ‘পবিত্র’ সংবিধান, এতে নতুনত্ব কী? সংবিধান যদি বাধা নাই হবে তাহলে জুলাই সনদের প্রয়োজনটা থাকে কী? সঙ্গত প্রশ্ন, একসময় বেগম খালেদা জিয়া এই সংবিধান ছুড়ে ফেলার অভিপ্রায়ের বিষয় আজকের বিএনপির অবস্থান কী? নিরঙ্কুশ সুবিধাজনক অবস্থানে দাঁড়িয়ে খালেদা জিয়ার অভিপ্রায় বাস্তবায়ন আজকের বিএনপি দায়িত্ব মনে করে কি-না?
জন্ম থেকে বিএনপি বারবার যেমনি ক্ষমতায় ছিল, ছিল বিরোধী দলেও। ক্ষমতার বাইরে থাকাকালে শেখ মুজিবের কুখ্যাত বিশেষ ক্ষমতা আইন বাতিলের দাবিতে তাদের আন্দোলনে দেখা গেলেও ক্ষমতায় যাওয়ার পর বেমালুম ভুলে যেতে দেখা গেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার এমনকি জামায়াত আর ’৭১ প্রসঙ্গেও একই দ্বিচারিতার নীতি স্পষ্ট। কেন এমন? লোকে বলে আওয়ামী লীগে কোনো বিএনপির এজেন্ট না থাকলেও বিএনপিতে আওয়ামী স্বার্থ-চেতনার ধারক ছা-পোষ্য কোনোকালে অভাব ছিল না, এখনো নেই। শেখ হাসিনার পতনে যাদের হৃদয় ভেঙেছে, তাদের অনেকেই আজ দলের আশ্রয় নয় শুধু, শেকড় থেকে শিখরেও পৌঁছে গেছে। এটি উদারতা না অদূরদর্শিতা রাষ্ট্রপতি চুপ্পু থেকে শিক্ষা নেয়া হলো কি?
আজকের রাজনীতিতে ’৭২ এর সংবিধান এবং ‘জুলাই সনদ’ দু’টি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। সংবিধানকে একটি দেশের সর্বোচ্চ আইন ও দলিল এই কারণে বলা হয় না যে, বিশেষ ক্ষমতাধর বা আশীর্বাদপুষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠী দ্বারা এটি রচিত ও গৃহীত; বরং সর্বোচ্চ দলিল এই জন্যই বলা হয়, এটি জনগণের ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ের অকৃত্রিম প্রতিফলন যা আন্দাজ অনুমান নয়; বরং প্রত্যক্ষ ভোট বা গণরায়ে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত ও গৃহীত। সঙ্গত প্রশ্ন, ’৭২-এর সংবিধান কি আদৌ এই মানদণ্ডে উত্তীর্ণ? সরল জবাব- মোটেই নয়। মার্চ ’৭২ এক ফরমান বলে ৪০৩ সদস্যের একটি গণপরিষদ গঠিত হলো। এপ্রিল ’৭২ তাদের মধ্য থেকে সংবিধান রচনার জন্য ৩৫ জনের একটি কমিটি গঠন করা হলো। রাষ্ট্রপতির আরেক ফরমানবলে গৃহীত ও ১৬ ডিসেম্বর ’৭২ থেকে কার্যকর হলো। অজ্ঞাত কারণে এত বড় একটি ঘটনার সাথে দেশের কথিত মালিক জনগণকে সম্পৃক্ত করার ন্যূনতম প্রয়োজন বোধ থেকে একটি গণভোটের আয়োজনও করা হলো না। অথচ এর মাত্র ক’দিন পর ৭ মার্চ ১৯৭৩ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো, অথচ অজ্ঞাত কারণে সেই সুযোগটিও কাজে লাগানো হলো না। একক ব্যক্তির চিন্তা ও অভিপ্রায় সংবিধান নামে একটি জাতির ওপর চাপিয়ে দেয়া হলো, যা একপর্যায়ে ছুড়ে ফেলে দিয়ে জাতিকে ভারমুক্ত করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করতে দেখা গিয়েছিল দেশনেত্রী বেগম খালাদে জিয়াকে। ’৭২-এর সংবিধানের এহেন একনায়কতন্ত্রী চেতনা ও অসঙ্গতির মোকাবেলায় জুলাই সনদ প্রণয়নে দেশের আপামর জনসাধারণের সম্পৃক্ততা এক লক্ষণীয় ব্যতিক্রম। এ ছাড়া, জুলাই সনদ এক স্বতঃস্ফূর্ত গণ-অভ্যুত্থানের ফসল এবং গণভোটে ৬৯ শতাংশ মানুষের সমর্থন বা ম্যান্ডেটপ্রাপ্তও বটে।
জুলাই সনদের মোকাবেলায় ’৭২ এর সংবিধান গুরুত্বহীনই নয় শুধু, নানা কারণে প্রশ্নবিদ্ধও বটে। তারপরও সংবিধান নামে এহেন একটি গণবিরোধী দলিলের প্রতি বিএনপির কারো কারো আবেগ-উচ্ছ্বাস, অন্যদিকে জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নে অঙ্গীকার এমন স্ববিরোধী অবস্থান দর্শনে একটি পুরনো চুটকি মনে পড়ে গেল যা না বললেই নয়। এক রুটিওয়ালা রাস্তায় রাস্তায় রুটি ফেরি করছিল। হঠাৎ রাস্তার পাশে এক গাছতলায় তারই এক বাল্যবন্ধুকে অঝোরে কাঁদতে দেখে টুকরি নামিয়ে তার পাশে গিয়ে বসে কাঁদার কারণ জানতে চাইলে বন্ধু বলল, ‘তার ঘরে তিন দিন ধরে খাবার নেই, ক্ষুধার জ্বালায় টিকতে না পেরে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। বন্ধুর কষ্টের কথা শুনে রুটিওয়ালা বন্ধুটিও হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল, যেন দুঃখটা তার আরো বেশি। এমন সময় তৃতীয় আরেকজন ওই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় এদের গলাগলি করে কাঁদতে দেখে থমকে দাঁড়াল। রুটিওয়ালা বন্ধুটির কাছে কাঁদার কারণ শুনে তৃতীয় ব্যক্তি স্ববিস্ময়ে বলল, ‘আরে বেকুব, এত কান্নাকাটির কী আছে। তোমার টুকরি ভর্তি রুটি আর তোমার বন্ধু ক্ষুধায় মরছে, ওকে দুটো রুটি দাও না কেন?’ ফেরিওয়ালা বন্ধুর জবাব, ‘ঘণ্টা দুই ধইরা কাঁদতাছি দরকার অইলে আরো দুই-চার ঘণ্টা কাদতে রাজি; কিন্তু রুটি দেওনের কথাটা কইয়া পেটে লাথি দিয়েন না।’ বিএনপি জুলাই সনদের জন্য কাঁদতে রাজি, কবর জিয়ারত আর ফুল দিতেও রাজি বটে; কিন্তু আপত্তি কি কেবলই স্বৈরাচার প্রজননধারা বন্ধের বিরুদ্ধে? তা হলে রক্তের মূল্যে দানব হটানোর দরকারটা ছিল কি? জুলাই সনদের বাস্তবতা অনুধাবনে বিএনপিকে কি আবারো বিরোধী দলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে, যেমনটি হয়েছিল কেয়ারটেকার সরকার প্রশ্নে?