মো. সহিদুল ইসলাম সুমন
বান্দরবানের দুর্গম সীমান্ত এলাকায় হঠাৎ আত্মপ্রকাশ করা সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ‘কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট’ (কেএনএফ) এবং তাদের সশস্ত্র শাখা ‘কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মি’ (কেএনএ) পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতীয় নিরাপত্তাকে এক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করায়। ভূরাজনৈতিক কৌশলগত অবস্থানের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম বরাবরই দেশী-বিদেশী নানামুখী চক্রান্তের কেন্দ্রবিন্দু। এই সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে কৌশলগত ও সামরিকভাবে কোণঠাসা করতে আমাদের সামরিক বাহিনী সক্ষম হয়।

১৯৯৭ সালে ‘পার্বত্য শান্তি চুক্তি’র মাধ্যমে একটি বড় ধরনের রূপান্তর ঘটেছিল। জুম্ম জাতীয়তাবাদের আড়ালে জেএসএস কিংবা ইউপিডিএফ-এর মতো দলগুলো যখন পাহাড়ে নিজেদের একচ্ছত্র প্রভাব, আধিপত্য এবং চাঁদাবাজির রাজত্ব ধরে রাখতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই সম্পূর্ণ নতুন এক বিপজ্জনক সমীকরণ ও রূপরেখা নিয়ে বান্দরবানের পাহাড়ে আবির্ভাব ঘটে কেএনএফের। ২০০৮ সালের দিকে নাথান বম নামের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটে পড়ে আসা একজনের হাত ধরে ‘কুকি-চিন ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন’ নামে একটি সামাজিক ও উন্নয়নমূলক সংগঠনের জন্ম হয়। আপাতদৃষ্টিতে বমসহ পার্বত্য অঞ্চলের অনগ্রসর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষার চটকদার স্লোগান ও মানবিক মোড়ক দিয়ে কার্যক্রম শুরু করলেও, ভেতরে ভেতরে এর উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রবিরোধী উগ্রবাদী কর্মকাণ্ড চালানো। ২০১৭ সালের দিকে এই সংগঠনটি তার সামাজিক মোড়ক সম্পূর্ণ উন্মোচন করে একটি পূর্ণাঙ্গ সশস্ত্র রূপ ধারণ করে এবং নিজেদের কেএনএফ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তারা বান্দরবানের রুমা, রোয়াংছড়ি, থানচি, আলীকদম এবং রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ির দুর্গম বড়থলি অঞ্চলসহ মোট ৯টি উপজেলাকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি কল্পিত ‘স্বায়ত্তশাসিত রাষ্ট্র’ বা ‘কুকি-চিন রাজ্য’ গঠনের ঔদ্ধত্যপূর্ণ দাবি তোলে। বম, পাংখোয়া, লুসাই, খিয়াং, ম্রো এবং খুমি এই ৬টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কথিত বঞ্চনার কথা বলে তারা সাধারণ তরুণদের হাতে অস্ত্র তুলে নিতে এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে প্ররোচিত করে। সাধারণ বম জনগোষ্ঠীর বেশির ভাগ মানুষই এই হিংসাত্মক ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডকে কখনোই সমর্থন করেনি, বরং তারা কেএনএফের জিম্মি ও ঢাল হিসেবে চরম আতঙ্কে দিন কাটিয়েছে।

কেএনএফের সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপটি উন্মোচিত হয় ২০২২ সালের শেষের দিকে। দেশের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে জানতে পারে যে, সমতলের নিষিদ্ধ উগ্রবাদী একটি ধর্মান্ধ জঙ্গি সংগঠন কেএনএফের সাথে এক গোপন আত্মঘাতী চুক্তি বা আঁতাত করেছে। পাহাড়ে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে সমতালের উগ্রবাদী জঙ্গিদের আধুনিক অস্ত্র চালনা, ভারী অস্ত্র হ্যান্ডলিং, ল্যান্ডমাইন তৈরি ও বিস্ফোরণ, গেরিলা যুদ্ধ এবং দুর্গম পাহাড়ি প্রতিকূল পরিবেশে বেঁচে থাকার সামরিক প্রশিক্ষণ দিচ্ছিল কেএনএফ। এক দিকে পাহাড়ে সার্বভৌমত্ব হরণ, অন্য দিকে সমতলে পরিকল্পিত জঙ্গি হামলার নীলনকশা করে দেশকে সঙ্কটের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। কেএনএফ তাদের ভৌগোলিক অবস্থানের পূর্ণ সুবিধা নিয়ে ভারত ও মিয়ানমারের মিজোরাম ও চিন রাজ্যের সীমান্তঘেঁষা অরক্ষিত, কাঁটাতারহীন দুর্গম এলাকাকে ট্রানজিট রুট এবং অবৈধ অস্ত্র চোরাচালানের নিরাপদ স্বর্গরাজ্য হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, আইইডি বা অ্যান্টি-পার্সোনেল ল্যান্ডমাইন প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের সুসংগঠিত, উসকানিমূলক প্রোপাগান্ডা প্রমাণ করেছিল যে, কেএনএফের এই আকস্মিক উত্থানের পেছনে ভূরাজনৈতিক শক্তির মদদ আছে।

পাহাড়ে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা, জঙ্গি নেটওয়ার্ক উপড়ে ফেলা এবং রাষ্ট্রের ভূখণ্ড রক্ষা করতে সেনাবাহিনী ‘অপারেশন রেজার শার্প’সহ একাধিক সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত চিরুনি অভিযান শুরু করে। কেএনএফের অস্ত্রধারীরা দুর্গম পাহাড়ের আনাচে-কানাচে, সাধারণ জুমচাষিদের যাতায়াতের পথে, পাহাড়ি ঝরনা বা পানির উৎসের কাছাকাছি এবং জুম খামারে শত শত ‘অ্যান্টি-পার্সোনেল ল্যান্ডমাইন’ ও আইইডি পুঁতে রেখেছিল। এই ল্যান্ডমাইনের অতর্কিত আঘাতে এবং চোরাগোপ্তা হামলায় আমাদের বেশ কয়েকজন সেনাসদস্য প্রাণ হারান। অনেকে চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেন। কিন্তু কোনো বাধাই তাদের নড়াতে পারেনি। সেনাবাহিনী কেবল সামরিক শক্তি বা বুলেটের প্রয়োগ করেনি, বরং তারা স্থানীয় নৃগোষ্ঠীর প্রতি অত্যন্ত মানবিক, সংবেদনশীল ও সুকৌশলী নীতি গ্রহণ করেছিল। কেএনএফ যখন সাধারণ বম গ্রামীণ নিরীহ মানুষকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল এবং অনেককে জোরপূর্বক মিয়ানমার বা ভারতের সীমান্তে পালিয়ে যেতে বাধ্য করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইস্যু তৈরির চেষ্টা করেছিল, তখন আমাদের সেনাবাহিনী সীমান্ত সুরক্ষার পাশাপাশি স্থানীয়দের পর্যাপ্ত খাদ্য, জরুরি চিকিৎসা ও নিরাপদ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেছে। জঙ্গি আস্তানাগুলো তখন গুঁড়িয়ে দেয়া সম্ভব হয়। আধুনিক ড্রোন প্রযুক্তি, সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স এবং স্থানীয় হিউম্যান ইন্টেলিজেন্সের সমন্বয়ে সেনাবাহিনী কেএনএফের লজিস্টিক সাপ্লাই চেইন ও আন্তঃসীমান্ত যোগাযোগব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

বড় ধরনের কৌশলগত সাফল্য আসে ২০২৬ সালের ১ জুলাই। বান্দরবানের অত্যন্ত দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ রেতলাং (যা স্থানীয়ভাবে তংপ্রাই পাহাড় নামে পরিচিত) পাহাড়ে সেনাবাহিনী একটি সফল অপারেশন পরিচালনা করে। এই অভিযানটি সাধারণ কোনো টহল ছিল না, বরং এটি ছিল কেএনএফ, ইউপিডিএফের (মূল) একটি নতুন ও যৌথ গোপন আস্তানাকে লক্ষ্য করে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত ট্র্যাকিং অপারেশন। বিচ্ছিন্নতাবাদী দলগুলোর নিজেদের মধ্যকার পূর্ববিরোধ ভুলে এই ধরনের নতুন ও বিপজ্জনক জোট গঠন পাহাড়ে এক নতুন ভূরাজনৈতিক মোড় নেয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছিল। স্থানীয় সূত্রের দাবি এবং সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, সেনাবাহিনীর এই ঝটিকা অভিযানের ফলে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের রিক্রুটমেন্ট এবং গোপন অস্ত্র ও রসদ সরবরাহ নেটওয়ার্কে বড় ধরনের আঘাত হানা সম্ভব হয়। পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত ওই গোপন ক্যাম্পটি থেকে বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয় এবং অভিযান চলাকালীন দ্বিপক্ষীয় তীব্র গোলাগুলির ও সংঘর্ষে প্রতিপক্ষের ব্যাপক হতাহতের খবর পাওয়া যায়। এই অভিযানটি প্রমাণ করে যে, কেএনএফ বা পাহাড়ি বিচ্ছিন্নতাবাদীরা যতই নতুন কৌশল অবলম্বন করুক বা সমতল-পাহাড়ের অন্যান্য উগ্রবাদী গোষ্ঠীর সাথে জোট বাঁধার চেষ্টা করুক না কেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা নজরদারি এবং তাৎক্ষণিক অ্যাকশন নেয়ার সক্ষমতা তাদের চেয়ে বহুগুণ বেশি।

কেন এই সশস্ত্র গোষ্ঠীর এত দ্রুত পতন ও বিপর্যয় ঘটল, তার বস্তুনিষ্ঠ রণকৌশলগত বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি প্রধান কারণ স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। কেএনএফ দাবি করেছিল তারা ৬টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অধিকারের প্রতিনিধি, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেছে ম্রো, খুমি বা খেয়াং সম্প্রদায়ের মানুষ তাদের চরম শত্রু ও সন্ত্রাসী হিসেবে গণ্য করেছে এবং বিভিন্ন স্থানে তাদের সশস্ত্র প্রতিরোধ করেছে। এমনকি খোদ বম সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষ কেএনএফের লাগামহীন চাঁদাবাজি, জিম্মি ও মুক্তিপণ বাণিজ্য এবং জোরপূর্বক তরুণদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে বাধ্য করার অমানবিক অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল।

দ্বিতীয়ত, সেনাবাহিনীর কাউন্টার-ইনসার্জেন্সি কৌশলের অন্যতম সফল দিক ছিল কেএনএফের রসদ ও অর্থের উৎসগুলো পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া। ২০২৪ সালের শুরুতে তারা রুমা ও থানচিতে ব্যাংক ডাকাতি, স্থানীয় বাজারে সশস্ত্র হামলা এবং উদীয়মান পর্যটন শিল্পকে জিম্মি করার মাধ্যমে যে অর্থনৈতিক সামর্থ্য গড়তে চেয়েছিল, সেনাবাহিনীর কঠোর ও আপসহীন অবস্থানের কারণে তা সম্পূর্ণ ভেস্তে যায়। তৃতীয়ত, আঞ্চলিক ভূরাজনীতির দ্রুত পরিবর্তন। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ এবং চিন রাজ্যের বর্তমান চরম অস্থিরতা ও আরাকান আর্মির অগ্রযাত্রার কারণে কেএনএফ ভেবেছিল তারা সীমান্ত পার হয়ে সহজেই পার পেয়ে যাবে ও সেখানে অভয়ারণ্য গড়ে তুলবে। কিন্তু বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সীমান্তে কঠোর ও নিশ্ছিদ্র ‘ব্লক-রেইড’ এবং বাংলাদেশ সরকারের আন্তর্জাতিক ও দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক তৎপরতার কারণে কেএনএফ প্রতিবেশী দেশগুলোর ভূখণ্ডকে আগের মতো নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়েছে। চতুর্থত, নাথান বমসহ কেএনএফের শীর্ষ নেতারা যখন দৃশ্যপটের বাইরে চলে যায়, অনেকে পার্শ্ববর্তী দেশে বা বিদেশে আত্মগোপনে চলে যায় এবং একের পর এক তাদের মূল আস্তানা, ট্রেনিং ক্যাম্প ও হেডকোয়ার্টার সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আসে। সামরিক ও কৌশলগতভাবে তারা আজ পুরোপুরি পরাস্ত ও দেউলিয়া।

কেএনএফ সম্পূর্ণ বিলুপ্তি হয়ে ইতিহাসের আর্বজনায় চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার অবস্থায় রয়েছে। একমাত্র যৌক্তিক ও কল্যাণকর পথ হলো নিঃশর্ত অস্ত্র সমর্পণ করে মূলধারার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা। সরকার ও স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সহযোগিতায় গঠিত ‘শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটি’র মাধ্যমে যদি কেএনএফ তাদের ভুল ও অপরাধ স্বীকার করে, সব অবৈধ অস্ত্র জমা দেয় এবং দেশের সংবিধান ও সার্বভৌমত্বকে মেনে নিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায়, তবেই কেবল আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের পুনর্বাসনের সুযোগ মিলতে পারে।

পাহাড়ে স্থায়ী ও টেকসই শান্তি কেবল বন্দুকের নল, বুলেটের গর্জন বা সামরিক শক্তি দিয়ে আসে না; টেকসই শান্তি আসে সামগ্রিক উন্নয়ন, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক মুক্তির মাধ্যমে। আর পার্বত্য অঞ্চলের এই উন্নয়নের সবচেয়ে বড়, বিশ্বস্ত ও প্রধান অংশীদার হলো সেনাবাহিনী। দুর্গম পাহাড়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, প্রতিকূল আবহাওয়াকে জয় করে শত শত কিলোমিটার সীমান্ত সড়ক নির্মাণ, প্রত্যন্ত অঞ্চলে আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও উপবৃত্তি প্রদান, বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসাসেবা ও মানবিক সহায়তা প্রদান এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সেনাবাহিনীর অবদান অতুলনীয়। পর্যটকরা আজ আবারো বান্দরবানের নীলগিরি, সাজেক বা মেঘ-পাহাড়ের মিতালী দেখতে নির্ভয়ে ছুটে যাচ্ছেন, পাহাড়ি নারীরা পাহাড়ের ঢালে শান্তিতে জুম চাষ করছেন, আর শিশুরা হাসিমুখে দূরবর্তী স্কুলেও যাচ্ছে।

লেখক : পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক গবেষক

msislam.sumon@gmail.com