৩৬ দিন একনাগাড়ে শিক্ষা ও নেট-দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করে ককরোচ জনতা পার্টি শেষ পর্যন্ত ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করিয়ে ছাড়ল গত ২৪ জুলাই। এ এক বিস্ময়কর ঘটনা। আন্দোলন আপাতত বন্ধ হলেও ককরোচ জনতা পার্টির মধ্যে নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহসহ বিজেপি-আরএসএস সিঁদুরে মেঘ দেখছে বলে ভারতের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। কেননা, ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির বিরুদ্ধে দেশের কৃষক-ক্ষেতমজুর সমাজ ইতিমধ্যেই দিল্লি পৌঁছে গেছেন। যদি খুব ভুল না হয়, তাহলে ককরোচ জনতা পার্টি কৃষকদের এ আন্দোলনে শামিল হবেই। তাহলে তখন দাবি উঠবে, মোদিজি, আপনি এবার পদত্যাগ করুন। অমিত শাহ, আপনি এবার পদত্যাগ করুন। এই ধ্বনিতেই ভারত কাঁপবে। আর তখন সেটা হবে বিজেপির কাছে অস্বস্তি।

এবার একটু বিস্তারিত বলা যাক।

২০ জুলাই দিল্লির যন্তর মন্তর থেকে সোনম ওয়াংচুকের হাসপাতালের অনশনকে সংহতি জানাতে অথবা দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ তিরপের দিল্লিতে সংসদ অভিযানে বিজেপি সরকার বেদম লাঠি চালালেও ককরোচ জনতা পার্টির জনপ্রিয়তা ও লড়াই-আন্দোলন মোদি সরকারকে শুধু অস্বস্তিতে রাখেনি, বিজেপি ও আরএসএস পুরোপুরি সিঁদুরে মেঘ দেখছে। ককরোচ জনতা পার্টি সিজেপি শিক্ষার দুর্নীতি, জাতীয় স্তরে অধ্যাপক নিয়োগের পরীক্ষায় (নেট) বারবার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার ঘটনা নিয়ে যে আন্দোলন শুরু করে তা ভারতের আমজনতাকে দারুণ প্রভাবিত করেছে। সংসদ বা পার্লামেন্ট অভিযানে একেবারেই কাছে এসে পুলিশি বর্বরতাকে কোনোভাবেই তারা ভয় পায়নি। তারা আরো বৃহত্তর আন্দোলনের দিকে ঝুঁকছে। ২০ জুলাই দিল্লিতে যন্তর মন্তরের অনশন কর্মসূচি ভারতের ছাত্র-যুব-মহিলা-কৃষক-খেতমজুরসহ বিভিন্ন ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোকে প্রভাবিত করেছে।

আমাদের স্মরণ থাকতে পারে যে, এ বছরের ১৫ জুন ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ তিরপে হামলার শিকার হয়ে জনপ্রিয়তার শীর্ষে চলে যান। তার পর দিল্লির যন্তর মন্তর থেকে শুরু করে দেশের সর্বত্রই এই দলের জনসভাগুলো হয়ে ওঠে জনসমুদ্র। তাহলে কি এই দল মোদিজি-বিজেপি-আরএসএসের অস্বস্তির কারণ? অনেকটাই তাই। সর্বভারতীয় রাজনীতিতে এটিই এখন চর্চার বিষয়। নাকি দলটি বন্যার জলের মতো এসে আবার নিঃশেষিত হবে, এমন প্রশ্নও উঠছে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে। তবে যা মনে হচ্ছে, এদের লড়াই-আন্দোলন ভেসে যাচ্ছে না বন্যার জলের মতো।

১৬ মে অনলাইনে আত্মপ্রকাশ করে ককরোচ জনতা পার্টি। আমেরিকার বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র ও কৌশলবিদ অভিজিৎ তিরপে এই দলের প্রতিষ্ঠাতা। এখন প্রায় কয়েক হাজার মিলিয়ন অনলাইন সদস্য। বয়স এখন দুই মাসের সামান্য বেশি। সব হিসাব পাল্টে দিয়েছে দিল্লির যন্তর মন্তরের সামনে ৬ জুনের জনসভা। একেবারে জনসমুদ্র। এককালের আপের নেতা অভিজিৎ তিরপে এখন মোদির চোখের ঘুম নিলো কেন? এখন তা আলোচনাসাপেক্ষ। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশেও এই দলের জনসভাগুলো জনসমুদ্র। তার পর এই ২০ জুলাই তারা আরো আন্দোলনের সব হিসাব পাল্টে দিয়ে বিজেপি সরকারের কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে।

একটা দল কখন জনগণের মুখপত্র হয়ে ওঠে? যখন সেই দলের মধ্য দিয়ে মানুষ খুঁজে পায় তার শ্রেণীস্বার্থ, খুঁজে পায় সমাজ মন, জাতিগত ও ধর্মগত অবস্থান থেকে নিজের সত্তার সাযুজ্য আর সাংস্কৃতিক চেতনা তখন সেই দলের প্রতি জনমনে তৈরি হতে থাকে সমর্থন। সেই সাথে নেতার প্রতি আইকনিক আকর্ষণ, দলের নীতিতে প্রবল সমর্থন, মানুষের রাজনৈতিক অবস্থান নির্মিত হয় এসব বিষয়ের ওপর। ককরোচ জনতা পার্টির জন্মলগ্নে এসব কথা বলার কারণ, কতটা এই নব দল কোন শ্রেণীর মানুষের মুখপাত্র হয়ে উঠবে সেই নিরিখেই জনগণ তাকে মূল্যায়ন করবে।

ক্ষমতা বদলের ইতিহাসও নির্মিত হয় এই মৌলিক মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করেই। টেলিভিশন, সংবাদপত্র ও সোশ্যাল মিডিয়া কেবল এই উপাদান নিয়ে প্রচারের হাওয়া নির্মাণ করে। যখন মিডিয়াকেই দুর্বল এবং কুক্ষিগত করে ক্ষমতাসীন দল নিজের সমর্থনে প্রচার চালায় আর রাষ্ট্রযন্ত্রের সাহায্যে বিরুদ্ধ মত দমন করে, তখন মানুষের মধ্যে বিরোধিতা প্রকাশের স্বাভাবিক পথ রুদ্ধ হতে থাকে। কিন্তু বিরোধী মত গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া চলতে থাকে। বিরোধিতার স্বাভাবিক প্রকাশ যত রুদ্ধ হয়, বিরোধিতা থেকে জন্ম নেয়া ক্ষোভ তত দানা বাঁধতে থাকে। ক্ষমতার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার কারণে জনমনে যে আবেগ তৈরি হয় সেটিই সংগঠিত হয়ে নিজের মতো রূপ ও গতিধারা তৈরি করে। তার স্বাভাবিক প্রকাশের ধারা রুদ্ধ হলে একটা সময়ের পর নিজেই বিস্ফোরিত হয়।

ককরোচ জনতা পার্টির গড়ে ওঠার প্রেক্ষিত এরকমই। খেয়াল করলে দেখা যাবে, গত শতকের শেষভাগে এ দেশের মানুষ বিকল্প খুঁজেছে এভাবেই। সত্তরের মাঝে এক দিন ‘জনতা পার্টি’ এভাবেই জনসমক্ষে এসেছিল। জরুরি অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে জয়প্রকাশ নারায়ণের ডাকে তখন জনতা পার্টির জন্ম হয়েছিল ইন্দিরার স্বৈরতান্ত্রিক শাসন অবসানের লক্ষ্যে। কিন্তু তাদের কার্যকারিতায় হতাশ জনমনে জমে থাকা ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে, পরবর্তীকালে ভারতীয় জনতা পার্টি উঠে এলো। আশির দশকের শুরুতে কংগ্রেসের মুসলিম তোষণবাদের বিরুদ্ধে হিন্দু সম্প্রদায়ের রাষ্ট্রবাদী দাবি তুলে ধরতে তৈরি হলো ভারতীয় জনতা পার্টি। আশির দশকের মধ্যভাগে মণ্ডল কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে জাতিসত্তার রাজনীতিতে বিভাজিত জনমন সমর্থন জোগালো রাজনৈতিক দলকে। একের পর এক মণ্ডল কমিশনবিরোধী আন্দোলন থেকে বিহারে, উত্তরপ্রদেশে গড়ে উঠল বিভিন্ন পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক দল। লালুপ্রসাদ, নীতিশ কুমার, মুলায়ম সিং যাদব, মায়াবতীর দলের উত্থান এভাবেই। তাদের উত্থানে দুর্বল হলো জাতীয়তাবাদী রাজনীতি। কংগ্রেস সেই প্রেক্ষিতে জাতীয় রাজনীতিতে নিজের প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখতে পারল না, টুকরো হলো। জাতীয় স্তরে জোট সরকার স্থায়ী নেতৃত্বের শূন্যতায় জনমনের আস্থা হারালো। এ দিকে এলাকার মানুষের ক্ষোভ থেকে তৈরি হতে থাকল রাজ্যে রাজ্যে আঞ্চলিক দল। কংগ্রেসের অপশাসন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জমতে থাকা জনমত থেকে তৈরি হলো আন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন। আন্দোলন ক্ষমতার পরিবর্তন চাইল। পেছন থেকে হাওয়া দিতে শুরু করে বিজেপি। আন্নার জনপ্রিয়তা হাইজ্যাক করে ক্ষমতায় বদল আনার চেষ্টা করে তারা।

এই ইস্যুতেই দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে ফাটল তৈরি হলো। জন্ম নিলো আপ পার্টি। সত্তর থেকে নব্বইয়ের দু’টি দশক দেখল জনমনে একের পর এক ক্ষোভ থেকে পার্টি তৈরি হচ্ছে। বদল হতে থাকল জাতীয় রাজনীতিতে ক্ষমতার সমীকরণ।

ককরোচ জনতা পার্টি তেমনই একটি বিক্ষুব্ধ জনমনের বিস্ফোরণ। বেকার যুব সম্প্রদায়, প্রতিবাদী, গণ-আন্দোলনকারী, মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক ও আইনজীবীদের শীর্ষ আদালতে বসে প্রধান বিচারপতির অপমানজনক মন্তব্য (এরা সবাই ককরোচ, এরা সিস্টেমকে আঘাত করছে) থেকে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদে কোটি কোটি যুবক যে ইন্টারনেটের মাধ্যমে একজোট হয়ে গেল, এটি কিন্তু হওয়ারই ছিল। কারণ যুব মনে ক্ষোভ জমছিল বহু দিন ধরেই। তীব্র বেকারত্বের হাঁসফাঁস, সরকারি চাকরি হ্রাস, বেসরকারি ক্ষেত্রে অস্থায়ী চাকরি, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ থেকে রাজ্যে রাজ্যে বিজেপি সরকারবিরোধী প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে বহু দিন ধরেই। জনমন বিভাজিত হয়েছে বিজেপির সাম্প্রদায়িক নীতিতে, তাদের বুলডোজার শাসন, নারী নির্যাতনের সংখ্যার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি, কৃষকদের প্রতি ধ্বংসাত্মক নীতি এবং সর্বস্তরে চূড়ান্ত দুর্নীতির ফলে মানুষের মধ্যে বিজেপির বিকল্প খোঁজা শুরু হয়ে গেছিল। গত লোকসভা নির্বাচনে তাদের আসন কমে আসা থেকে কোনো শিক্ষা নেয়নি, উল্টো সরকারে থাকার সুবিধা নিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে বিজেপি যথেচ্ছ দমন করা শুরু করে। ঠিক এমন অবস্থায় নিটের উপর্যুপরি চারবার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও সিবিএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্র চেকিং নিয়েও স্ক্যাম, বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস প্রায় এক কোটি ছাত্রের মনে গভীর ক্ষোভ হতাশা ও বিকল্পের অন্বেষণে চাহিদা তৈরি করে। প্রতিটি ক্ষেত্রে শীর্ষস্তরের দুর্নীতি ক্ষোভের আগুন বাড়িয়ে দেয়। ইতোমধ্যে দিল্লি হাইকোর্টে কোটি টাকার দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্তকে প্রধান বিচারপতির পদে আনা হয়। তিনিই যুবসমাজকে ককরোচ বলে মন্তব্য করে যুব অসন্তোষকে দানা বাঁধতে অনুঘটকের কাজ করলেন। তার মন্তব্যের ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদে তৈরি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে নিমেষে কোটি কোটি ছাত্রযুব সমর্থন করার পেছনে এটাই প্রেক্ষাপট।

কার্যত প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তই দেশের ক্ষুব্ধ ছাত্রযুব জনতাকে সরকারবিরোধী আন্দোলনের দিকে ঠেলে দিলেন। প্রধান বিচারপতির মন্তব্য এমন বার্তা দিলো যে, শীর্ষ আদালত ঝুঁকে গেছে ক্ষমতার দিকে, জনগণের বিচার পাওয়া নিয়ে তাতে আরো আশঙ্কা তৈরি হলো। সরকার আর আদালতের বোঝাপড়া যখন প্রতীয়মান হয়ে যায়, জনগণ তখনই ঠিক করে সেই সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। যেভাবে বিজেপি রাষ্ট্র শাসনের সুবিধা নিয়ে সংবিধানের সব বিধি কুক্ষিগত করে, ক্ষমতাকে অনৈতিক পথে মুষ্টিবদ্ধ করে নিরঙ্কুশ করতে চাইছে তাতে জনগণের সহ্যের ক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে বলেই আজ ককরোচ পার্টির আহ্বায়ক দিল্লিতে এসে আত্মপ্রকাশ ঘটালেন যুবদের পার্টির, যারা দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষা প্রশাসনের স্বার্থে অদক্ষ শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফা চায়। এটি একটি ইস্যুভিত্তিক প্রোগ্রাম মাত্র, কিন্তু এর বাইরে তারা কি দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিতে জাতীয় স্বার্থে রাজনৈতিক দল হিসেবে জনগণকে কোনো বিকল্প দেখাতে চায়? সেটি কিন্তু এখনো অস্পষ্ট। অর্থাৎ কেবলই যুব সমাজের প্রবল ক্ষোভ থেকে জন্ম নেয়া প্রতিবাদ জন্ম দিলো একটি রাজনৈতিক দলের। শেষ পর্যন্ত তারা কী চায়, কোন পথে চায়, কোন শ্রেণীর মানুষের জন্য রাস্তায় নামতে চায়, নাকি শুধু ছাত্র যুবদের একাডেমিক পরীক্ষা আর চাকরির পরীক্ষার শুদ্ধতার দাবিতেই তারা আটকে থাকবে- এটি জানার পর জানা যাবে প্রতিবাদের মুষ্টিবদ্ধ হাত তারা কাদের জন্য আকাশে ছুড়তে চায়। সবই সময় বলবে। যুব ও জনমনে পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে সংগঠিত করে যথাযথ অবস্থান ও কৌশল নিয়ে তারা ক্ষমতার প্রাচীরে আদৌ আঘাত হানতে চায় কি না এবং তাতে দেশের অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে তাদের সমীকরণ কী হবে এখন সেটিই দেখার।

লেখক : সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক ও কবি