মানচিত্রে ঠাঁই মিললেও প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরিতে বন্দী ছিটমহলবাসী

এগারো বছরেও নেই উন্নয়ন, ভারত অংশে নাগরিকত্ব প্রমাণের দায় এখনো সীমান্তবাসীর কাঁধে

Printed Edition

এস এম মিন্টু ঢাকা ও রেজাউল করিম রেজা কুড়িগ্রাম

২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাত। কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার দাসিয়ারছড়ায় সেদিন ছিল এক অন্যরকম আবহ। দীর্ঘ ৬৮ বছর ধরে রাষ্ট্রবিহীন পরিচয়ে বসবাস করা মানুষের হাতে উঠেছিল বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা। আনন্দে কেঁদেছিলেন অনেকেই। কেউ মাটিতে সেজদা দিয়েছিলেন, কেউ জাতীয় সঙ্গীত গেয়েছিলেন, কেউ আবার সন্তানকে বুকে জড়িয়ে বলেছিলেন, ‘আজ থেকে আমরা একটি দেশের নাগরিক।’ সেই রাত শুধু একটি সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের দিন ছিল না। এটি ছিল দীর্ঘ বঞ্চনা, অনিশ্চয়তা ও পরিচয় সঙ্কটের অবসানের দিন।

বাংলাদেশ-ভারত স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভারতের অভ্যন্তরে থাকা বাংলাদেশের ১১১টি ছিটমহল বিলুপ্ত করে বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের সাথে যুক্ত হয়। এর মধ্যে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার দাসিয়ারছড়া ছিল সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ ছিটমহলগুলোর একটি।

সাহেব আলির মেয়ের বিয়ে হয়েছিল ২০১৫ সালের আগেই। ভারতের কোচবিহারের দিনহাটার সাবেক ছিটমহল পোয়াতুরকুঠিতে বসে তিনি এখন এক অদ্ভুত প্রশ্নের মুখোমুখি-এসআইআরের (বিশেষ নিবিড় সংশোধন) নথিতে তার মেয়ের নাম এখনো উঠেনি। উঠবে কী করে, যেখানে ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় তাদের কারো নামই নেই। থাকার কথাও নয়, তারা নাগরিকই হয়েছেন ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে। ছিটমহল বিনিময়ের সেই ঐতিহাসিক রাতে। আজ থেকে ঠিক ১১ বছর আগে যে রাতে ভারতের পতাকা উঠেছিল তাদের উঠোনে, মোমবাতি জ্বলেছিল ৬৮ বছরের বন্দিদশার সমাপ্তি ঘোষণা করে-সেই রাতের স্মৃতি আজ তাদের কাছে একটা আতঙ্কের নথি-সঙ্কট। জেলা প্রশাসনও স্পষ্ট করে বলতে পারছে না, কিভাবে সুরাহা হবে। আর কিছুটা দূরে, মধ্য মশালডাঙ্গায় আবদুল্লা শেখের গল্পটা আরো করুণ। ছিটমহল বিনিময়ের সময় তিনি সদ্য কৈশোর পেরিয়েছেন। ভেবেছিলেন, এবার বুঝি নিজের গ্রামেই কাজ জুটবে। ১১ বছর পর আজ তিনি দিল্লির একজন পরিযায়ী শ্রমিক, সাথে তার বৃদ্ধ বাবা-মাও। কিছু দিন আগেই তুফানগঞ্জের এক পরিযায়ী শ্রমিককে হরিয়ানায় ‘বাংলাদেশী সন্দেহে’ আটকে মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নিজের দেশের নাগরিকত্ব হাতে নিয়েও নিজ ভূমে পরবাসীর মতো বাঁচার এই বাস্তবতা- এটাই ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক স্থলসীমা চুক্তির ১১ বছর পূর্তির প্রকৃত ছবি, যা মধ্যরাতের মোমবাতি আর পতাকা উত্তোলনের ছবির আড়ালে থেকে যায়।

ভারত অংশে নাগরিকত্ব প্রমাণের দায় এখনো সীমান্তবাসীর কাঁধে : ভারতের কিছু সীমান্তাঞ্চল, বিশেষ করে দক্ষিণ বেরুবাড়ির অভিজ্ঞতা দেখায় যে ভূমি প্রশাসনের অসম্পূর্ণতা একটি আন্তর্জাতিক চুক্তির সুফলকেও দীর্ঘদিন ধরে সীমিত করে রাখতে পারে। নেহেরু-নুন চুক্তির পর ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের এক মামলার জেরে বেরুবাড়ির দক্ষিণাংশের হস্তান্তর কার্যত থমকে গেছে বহু দশক জমির দলিল, মিউটেশন, ক্ষতিপূরণ ও সীমান্ত অবকাঠামো নির্মাণের মতো বিষয়গুলো প্রমাণ করে, রাজনৈতিক ঘোষণার চেয়ে প্রশাসনিক বাস্তবায়ন অনেক বেশি কঠিন এবং সেই কঠিন কাজটি ভারত এড়িয়ে গেছে বারবার। কোচবিহারের ৪৭টি ও জলপাইগুড়ির চারটি- মোট ৫১টি সাবেক বাংলাদেশী ছিটমহলের বাসিন্দারা আজ সেই একই প্রশাসনিক উদাসীনতার ধারাবাহিকতা ভোগ করছেন। এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু হতেই দেখা গেছে, ২০০২ সালের ভোটার তালিকার শর্ত পূরণ করতে না পারা এই ‘নব্যভারতীয়দের’ নাগরিকত্ব আবারো প্রশ্নের মুখে। স্থানীয় বিজেপি নেতা মৌখিক আশ্বাস দিচ্ছেন হলফনামা জমা দিলেই সমস্যা মিটবে, কিন্তু প্রশাসনের তরফে কোনো লিখিত নিশ্চয়তা নেই। পোয়াতুরকুঠির বাসিন্দারা তাই এনুমারেশন ফর্মই ফিরিয়ে দিয়েছেন পরপর তিন দিন। এটা কোনো বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক জটিলতা নয়- এটা প্রমাণ করে, নাগরিকত্ব দেয়ার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলেও রাষ্ট্র হিসেবে ভারত এই মানুষদের প্রকৃত অন্তর্ভুক্তি ১১ বছরেও নিশ্চিত করতে পারেনি।

কর্মসংস্থানের চিত্রও একই কথা বলে। নাগরিকত্ব পাওয়ার পর এলাকাতেই যদি জীবিকার সংস্থান হতো, তাহলে মধ্য মশালডাঙ্গা বা পোয়াতুরকুঠির মতো এলাকার মানুষদের ভিনরাজ্যে পাড়ি জমাতে হতো না। বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা- নাগরিকত্বের কাগজ হাতে পাওয়ার পর তারা কেবল আইনি বাধা ছাড়াই পরিযায়ী শ্রমিকে পরিণত হওয়ার ‘স্বাধীনতা’ পেয়েছেন। আর সেই পরিযায়ী জীবনেও তাড়া করে ফিরছে বাংলাভাষী হওয়ার কারণে সন্দেহভাজন ‘বাংলাদেশী’ তকমা লাগিয়ে দেয়ার আতঙ্ক।

রাষ্ট্রীয় পরিচয় পাওয়ার সাথে সাথে মানুষের মনে জন্ম নিয়েছিল নতুন প্রত্যাশা। তারা ভেবেছিলেন, এবার আর অবহেলা নয়; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, কর্মসংস্থান, যোগাযোগ, প্রশাসনিক সেবা সব কিছুই পৌঁছে যাবে তাদের দোরগোড়ায়। রাষ্ট্রের অন্য নাগরিকদের মতো তারাও পাবেন সমান সুযোগ-সুবিধা। কিন্তু ছিটমহল বিনিময়ের এক যুগ পূর্ণ হওয়ার প্রাক্কালে দাসিয়ারছড়ার বাস্তবতা সরেজমিন ঘুরে দেখলে সেই স্বপ্নের সাথে বাস্তবতার বিস্তর ফারাক চোখে পড়ে।

নাগরিকত্বের স্বীকৃতি মিলেছে, জাতীয় পরিচয়পত্র হয়েছে, ভোটার তালিকায় নাম উঠেছে, নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন, বিদ্যুৎ সংযোগও পৌঁছেছে বেশির ভাগ ঘরে। কিন্তু মৌলিক নাগরিক সেবা, টেকসই কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, মানসম্মত শিক্ষা, ভূমি সমস্যার সমাধান এবং কার্যকর স্থানীয় সরকারব্যবস্থার ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি আজও দৃশ্যমান নয়।

দাসিয়ারছড়ায় সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তাদের প্রধান অভিযোগ উন্নয়ন হয়নি, এমন নয়; বরং উন্নয়ন হয়েছে খণ্ড খণ্ডভাবে। কোথাও রাস্তা হয়েছে, কোথাও সেতু, কোথাও সরকারি ভবন নির্মিত হয়েছে। কিন্তু মানুষের জীবনযাত্রার মৌলিক পরিবর্তন ঘটাতে যে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন ছিল, সেটির অভাব এখনো স্পষ্ট। স্থানীয় বাসিন্দা শাহ আলম জানান, ‘আমরা নাগরিক হয়েছি, কিন্তু এখনো পূর্ণ নাগরিকের মতো সেবা পাই না। দাশিয়ারছড়ার মানুষের দাবি দাসিয়ারছড়া সিটমহলকে যেন একটি ইউনিয়ন ঘোষণা করা কিন্তু আজও সেটি হয়নি।

দাসিয়ারছড়ার আয়তন প্রায় এক হাজার ৬৪৩ দশমিক ৪৪ একর। ছিটমহল বিনিময়ের পর এলাকাটিকে প্রশাসনিকভাবে ফুলবাড়ী সদর, ভাঙ্গামোড় ও কাশিপুর ইউনিয়নের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়। প্রশাসনের যুক্তি ছিল, এতে স্থানীয় সরকার পরিচালনা সহজ হবে। কিন্তু বাস্তবে এই সিদ্ধান্তই নতুন ধরনের জটিলতার জন্ম দিয়েছে।

একই গ্রামের আরেক পরিবারের সদস্য ফুলবাড়ী সদর ইউনিয়নের বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করে বলেন, পাশের বাড়ির মানুষ ভাঙ্গামোড় ইউনিয়নের এবং আরেকজন কাশিপুর ইউনিয়নের আওতায়। ফলে একটি এলাকার মানুষকে তিনটি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন, নাগরিকত্ব সনদ, ওয়ারিশ সনদ, ট্রেড লাইসেন্স, কৃষি সহায়তা, ভিজিডি-ভিজিএফ কার্ড, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা কিংবা প্রতিবন্ধী ভাতার মতো সাধারণ সেবা পেতেও মানুষকে কয়েক কিলোমিটার দূরের ইউনিয়ন পরিষদে যেতে হয়। বিশেষ করে বর্ষাকালে এই দুর্ভোগ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। যোগাযোগব্যবস্থা বিঘিœত হলে অনেকেই প্রয়োজনীয় সরকারি সেবা নিতে পারেন না। এতে সময়, অর্থ ও শ্রমের অপচয় হয়।

উন্নয়নে উপেক্ষিত এক জনপদ দাসিয়ারছড়া : স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনটি ইউনিয়নের মধ্যে বিভক্ত থাকার কারণে দাসিয়ারছড়া কোনো ইউনিয়নের উন্নয়ন পরিকল্পনাতেই অগ্রাধিকার পায় না। ফলে কোনো এলাকায় রাস্তা হয়েছে, কিন্তু সংযোগ সড়ক হয়নি। কোথাও বিদ্যুৎ এসেছে, কিন্তু কৃষি সেচের ব্যবস্থা হয়নি। কোথাও সরকারি ভবন হয়েছে, কিন্তু জনবল দেয়া হয়নি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবে উন্নয়ন কার্যক্রমের প্রকৃত সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। দাসিয়ারছড়ার বাসিন্দা আবদুল জলিল বলেন, ‘আমরা ভোট দিই, জাতীয় পরিচয়পত্র আছে, কর দিই। কিন্তু সরকারি অফিসে গেলেই বোঝা যায় আমরা এখনো প্রান্তিক মানুষ। অনেক কাজের জন্য বারবার ইউনিয়নে যেতে হয়। বর্ষাকালে তো আরো কষ্ট। স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়েও অনেক সময় নিজেকে অবহেলিত মনে হয়।’

স্থানীয় বাসিন্দা মো: জালাল উদ্দিন (৪০) বলেন, ছিটমহল বিনিময়ের সময় যে স্বপ্ন দেখেছিলাম, বাস্তবতা তার অনেকটাই ভিন্ন। প্রবীণ বাসিন্দা আরিফ হোসেন (৬০) বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম রাষ্ট্রের সাথে যুক্ত হলেই সব সমস্যার সমাধান হবে। এখন বুঝছি, শুধু মানচিত্রে যুক্ত হলেই উন্নয়ন হয় না। মানুষের জীবনে উন্নয়ন পৌঁছাতে পরিকল্পনা ও আন্তরিকতা দুটোই প্রয়োজন।’

দাসিয়ারছড়ার মানুষের এই দীর্ঘশ্বাস যেন এক যুগ পরও অসমাপ্ত থেকে যাওয়া একটি প্রতিশ্রুতির গল্প। ছিটমহল আন্দোলনের নেতা গোলাম মোস্তফা বলেন, ছিটমহল বিলুপ্তির পর দাসিয়ারছড়াসহ অন্যান্য ছিটমহল থেকে ১১১টি পরিবার ভারতে চলে যায়, এখন তাদের অবস্থা দুর্বিষহ। তাদের ভোটাধিকার নেই, যে আবাসনে তাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে তার বৈধ কোনো কাগজপত্র দেয়া হয়নি। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ক্ষমতায় আসার পর তারা নানা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। অনেকে পালিয়ে বাংলাদেশেও এসেছেন, এমনই অভিযোগ পেয়েছেন তারা। তারা বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের বাসায় অবস্থান করছেন। তারা সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে না চাইলেও আত্মীয়স্বজন সূত্রে জানা গেছে তারা ভালো নেই। ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত তাদের ভুল ছিল। দাসিয়ারছড়া মহাবিদ্যালয় অধ্যক্ষ মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম জানান, আমার কলেজে আসার প্রায় আধা কিলোমিটার রাস্তা এখনো পাকা করা হয়নি। কলেজের পিছন দিয়ে প্রবাহিত নীল কুমার নদীটিতে এখনো একটি ব্রিজ করা হয়নি। ছাত্রছাত্রীসহ এলাকাবাসীকে এখনো বিভিন্নভাবে পার হয়ে আসতে হয়। প্রত্যাশিত কর্মসংস্থান হয়নি। এখনো ছিটমহলবাসী নানা বঞ্চনার শিকার।