ক’দিন আগে প্রায় সব জাতীয় দৈনিকের একটি খবর সবার নজর কাড়ে। দেশে প্রচলিত দেশী ও বিদেশী মিলে ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতে ক্ষতিকর মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা নামের একটি সংস্থার গবেষণায় এ তথ্য ধরা পড়ে। লক্ষণীয় হচ্ছে, এ গবেষণায় বাংলাদেশে উৎপাদিত ১৫টি টুথপেস্টের মধ্যে ১২টিতেই এই দূষণ পাওয়া গেছে। পরীক্ষা করা টুথপেস্টের মধ্যে শিশুদের ব্যবহারযোগ্য কয়েকটি টুথপেস্টও আছে। পুরো ব্যাপারটি জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে এসব টুথপেস্ট ব্যবহারের ফলে শরীরে ঢুকে যাচ্ছে ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিক। জনস্বাস্থ্য ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষের নাকের ডগায় দীর্ঘদিন ধরে এগুলো বাজারে চালু আছে। ব্যাপারটি রীতিমতো উদ্বেগজনক। সার্বিক জনস্বাস্থ্য, বিশেষ করে শিশুস্বাস্থ্যে ঝুঁকি সৃষ্টির দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এড়িয়ে যেতে পারেন না।
শরীরে প্রবেশের পর এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক রক্ত, ফুসফুস, যকৃৎ, কিডনি, মস্তিষ্ক, হৃদযন্ত্রের টিস্যু, প্লাসেন্টা ও পুরুষের প্রজনন অঙ্গে পৌঁছে যায় এবং এসব অঙ্গে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। দীর্ঘকালীন প্রদাহ শরীরে দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়ানোর অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। ফলে স্ট্রোকসহ অন্যান্য হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। মস্তিষ্কের সুরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করে এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক মস্তিষ্কের কোষে পৌঁছে যায়। স্নায়ুতন্ত্র ও স্মৃতিশক্তির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়াসহ অন্যান্য ধরনের স্নায়ুরোগের আশঙ্কা সৃষ্টি করে। কিছু প্লাস্টিকজাত রাসায়নিকের উপস্থিতি শরীরে হরমোনের নিয়ন্ত্রণসহ প্রজনন স্বাস্থ্যেরও ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করে।
মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শরীরের বিভিন্ন কোষে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস তৈরি করে পরবর্তীতে কোষের অকাল মৃত্যু এবং অনিয়ন্ত্রিত কোষ বৃদ্ধির ফলে ক্যান্সারের সূচনা করার আশঙ্কা দেখেছেন বিজ্ঞানীরা। মাইক্রোপ্লাস্টিক খুব সহজেই মানব শরীরের ফুসফুসে পৌঁছে যায়। ফুসফুসে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শ্বাসতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহসহ অন্যান্য জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেলেই তা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করবে এমন নয়। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে কী পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকলে তা ক্ষতিকর হবে তা নিয়ে বিভিন্ন দেশে গবেষণা হলেও বাংলাদেশে জানামতে কোনো গবেষণা হয়নি।
মাইক্রোপ্লাস্টিক সাধারণত পলিমার জাতীয় দ্রব্যাদি তৈরির সময় সাবধানতা অবলম্বন না করলে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। পানির স্রোতের মাধ্যমে পুকুর-ডোবা, বিল-নদীর তলদেশে জমা হতে থাকে। বিভিন্ন জলজ প্রাণী বিশেষ করে মাছ এগুলো খায়। মাছ এগুলো হজম করতে না পারায় মাছের শরীরে জমা হতে থাকে। এ ধরনের মাছ খেলে এগুলো মানবদেহে প্রবেশ করে। পলিমারজাত বস্তুর উৎপাদন ছাড়াও কাপড়-চোপড়, বাসন-কোসন ধোয়া, ছেঁড়া বা ফেলে দেয়া গাড়ির টায়ার, ধুলাবালি, সড়ক ও বাড়িঘরের পেইন্ট সাধারণত মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়িয়ে থাকে। সাধারণত ১০০ ন্যানোমিটার সাইজের মাইক্রোপ্লাস্টিকের কণা সহজেই মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে এবং বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ছড়িয়ে বিভিন্ন ধরনের কোষে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে।
পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে প্লাস্টিক ও মাইক্রোপ্লাস্টিক। প্লাস্টিকের পরিবেশদূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বিশ্বজুড়ে পরিবেশবিজ্ঞানী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বিত চেষ্টা ও বিভিন্ন দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক উদ্যোগের ফলে প্রায় বেশির ভাগ দেশে এ ব্যাপারে সরকারি প্রতিরোধমূলক পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশে এ ব্যাপারে যেমন চোখে পড়ে না সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ, তেমনি দেখা যায় না জনসচেতনতা। অথচ এ দুইয়ের সমন্বয়েই কেবল এ প্রতিরোধ চেষ্টা সুফল বয়ে আনতে পারে।
দেশী-বিদেশী টুথপেস্টে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে দেশজুড়ে দেশী-বিদেশী অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রেও এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। মাইক্রোপ্লাস্টিক-জনিত অসুস্থতা এখনো তেমন দৃশ্যমান না হলেও ভবিষ্যতে এটি মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি বিশেষ করে শ্বাসকষ্ট, হৃদযন্ত্রের অসুস্থতা ও মস্তিষ্কের অভিঘাতের ক্ষেত্রে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করার সমূহ সম্ভাবনা। মাইক্রোপ্লাস্টিক-জনিত হরমোন ভারসাম্যহীনতায় ভবিষ্যতে প্রতিবন্ধী শিশুর জন্মহার এবং অকাল গর্ভপাত বৃদ্ধির মতো স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা দরকার। সরকারকে এ ব্যাপারে অবিলম্বে প্রতিরোধী ভূমিকা নিতে হবে। পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ব্যবহার বিশেষ করে পলিমারজাত দ্রব্যাদির মাননিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। বিকল্প নেই জনসচেতনতার। জনমত সৃষ্টিতে জনস্বাস্থ্যকর্মীসহ সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। একই সাথে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, বাংলাদেশ মান নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে আরো সক্রিয় ও সক্ষম করতে হবে। আজকের শিশুরাই ভবিষ্যতে দেশের নেতৃত্ব দেবে। তাদের নিরাপদ স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার দায় আমাদের। এ ক্ষেত্রে দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ