ফরাসি চিন্তাবিদ আলেক্সিস দ্য টকভিল বিপ্লব-পরবর্তী সমাজ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে একটি গভীর সত্য উচ্চারণ করেছিলেন। বিপ্লব সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্তে পৌঁছায় তখনই, যখন জনগণের প্রত্যাশা আকাশছোঁয় অথচ বাস্তবতা মাটিতে হামাগুড়ি দেয়। প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির এই ব্যবধানই ইতিহাসে বারবার নতুন অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে। ২০২৪ সালের রক্তঝরা জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তির প্রাক্কালে দাঁড়িয়ে আজ বাংলাদেশকে সেই টকভিলীয় প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ৫ জুলাই ২০২৪-এ যে আন্দোলন নতুন মাত্রা পেতে শুরু করেছিল, ৫ আগস্টে তা এক দফার চূড়ান্ত গণবিস্ফোরণে ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন ঘটায়। সেদিন রাজপথে যে বিজয়োল্লাস দেখা গিয়েছিল, তার অন্তর্নিহিত বাণী ছিল একটিই- একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ। কিন্তু আজ নির্বাচিত সরকারের ছয় মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পর, তৃতীয় ৫ আগস্ট সামনে রেখে জাতিকে আত্মজিজ্ঞাসা করতে হচ্ছে গণ-আকাক্সক্ষার সেই অমলিন স্বপ্ন কি পূর্ণতার পথে, নাকি রাজনৈতিক সমীকরণের মরুপ্রান্তরে তা এক দূরবর্তী মায়া মরীচিকায় রূপ নিতে চলেছে?
জুলাই অভ্যুত্থানকে কেবল কোটা সংস্কার আন্দোলনের পরিণতি হিসেবে দেখলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিচারে মস্ত ভুল হবে। এটি ছিল দেড় দশকের একনায়কত্ব, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, ভোটাধিকার হরণ, ব্যাংক লুণ্ঠন ও প্রাতিষ্ঠানিক ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে তিলে তিলে পুঞ্জীভূত জনরোষের অনিবার্য বিস্ফোরণ। রাষ্ট্র যখন নিজ নাগরিককে শত্রুজ্ঞান করে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দলীয় লাঠিয়ালে পরিণত করে, তখন রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার সামাজিক চুক্তি ভেঙে পড়ে, রুশোর ভাষায় শাসনের নৈতিক বৈধতাই তখন অন্তর্হিত হয়। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় চব্বিশের অভ্যুত্থান ছিল নাগরিকের হৃত সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের লড়াই। শাসকগোষ্ঠী ৫ জুলাইয়ের পর দানা বাঁধতে থাকা আন্দোলনের গভীরতা অনুধাবনে ব্যর্থ হয়ে শক্তির দম্ভে তরুণদের বুকের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করেছিল; সেই রক্তই শেষ পর্যন্ত এক দফায় রূপ নিয়ে ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক ‘লংমার্চ টু ঢাকা’র মুখে দুঃশাসনের যবনিকা টেনে দেয়।
অভ্যুত্থানোত্তর বাংলাদেশে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর জনপ্রত্যাশার পারদ ছিল আকাশচুম্বী। ধ্বংসস্তূপে পরিণত রাষ্ট্রযন্ত্র, ভঙ্গুর অর্থনীতি ও বিপর্যস্ত আইনশৃঙ্খলার মধ্যে এই সরকার সংবিধান, বিচার বিভাগ, নির্বাচনব্যবস্থা, জনপ্রশাসন ও পুলিশ সংস্কারে একাধিক কমিশন গঠন করে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দীর্ঘ সংলাপের ফসল হিসেবে ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ গৃহীত হয়, যা হওয়ার কথা ছিল অভ্যুত্থানের স্পিরিটভিত্তিক এক নতুন জাতীয় রাজনৈতিক বন্দোবস্তের ভিত্তিদলিল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হান্না আরেন্ট ‘অন রেভোলিউশন’ গ্রন্থে সতর্ক করেছিলেন, স্বৈরাচারের পতন ঘটানো যত কঠিন, তার চেয়ে বহুগুণ কঠিন বিপ্লবী চেতনাকে টেকসই রাজনৈতিক-আইনি কাঠামোয় রূপ দেয়া। জুলাই সনদের ক্ষেত্রেও আরেন্টের সেই সতর্কবাণী অক্ষরে অক্ষরে ফলতে দেখা গেল। সনদ স্বাক্ষরের পরপরই এর বাস্তবায়ন আদেশ, নোট অব ডিসেন্টের অন্তর্ভুক্তি, গণভোটের সময় ও পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে শুরু হয় তীব্র বিবাদ-বিভ্রাট। যে দলিলটির কথা ছিল জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হওয়ার, তা-ই হয়ে দাঁড়াল বিভাজনের নতুন উপলক্ষ। রাজনীতিতে আদর্শিক বিতর্ক স্বাভাবিক ও কাম্য; কিন্তু সেই বিতর্ক যখন অভ্যুত্থানের ঐক্যের ভিত্তিমূলেই আঘাত হানে, তখন তা জাতির জন্য অশনিসঙ্কেত।
এরপর এলো সেই বহুকাক্সিক্ষত দিন ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই সনদের ওপর গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হলো। প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটারের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে জনগণ দু’টি রায় দিলো ব্যালটে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিজয়ী করে রাষ্ট্রপরিচালনার ম্যান্ডেট, আর গণভোটে ‘হ্যাঁ’ রায়ের মাধ্যমে জুলাই সনদকে জাতীয় স্বীকৃতি। জামায়াতে ইসলামী প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসল। দেড় যুগ পর একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর নিঃসন্দেহে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে এক মাইলফলক; এ জন্য অন্তর্বর্তী সরকার, নির্বাচন কমিশন ও ধৈর্যশীল জনগণ ইতিহাসে স্বীকৃতি পাবে। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের নির্মোহ সত্য হলো নির্বাচন গণতন্ত্রের প্রবেশদ্বার মাত্র, গন্তব্য নয়। ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতার হাতবদল নিশ্চিত হয়েছে; কিন্তু যে কাঠামোগত রূপান্তরের জন্য হাজারো তরুণ জীবন দিলো, সেই রূপান্তর নিশ্চিত হয়েছে কি?
নির্বাচনের ছয় মাসের মাথায় এসে এই প্রশ্নটিই আজ জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। একদিকে সরকারের দায়িত্বশীলরা বারবার ঘোষণা করছেন, জুলাই সনদের প্রতিটি অঙ্গীকার অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হবে; প্রধানমন্ত্রী নিজেও সনদ বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানানো হচ্ছে। অন্যদিকে অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী তরুণদের দল ও বিরোধী শিবির থেকে অভিযোগ উঠছে- সরকার গঠনের পর সনদ বাস্তবায়নের গতি মন্থর, কোথাও কোথাও তা অস্বীকারের প্রবণতাও দৃশ্যমান; আবার সরকারপক্ষ থেকে সনদের বাস্তবায়ন আদেশে ভিন্নমতের নোট উপেক্ষিত হওয়ার প্রশ্ন তুলে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রক্রিয়াকেই দায়ী করা হচ্ছে। অর্থাৎ- সনদ নিয়ে অভ্যুত্থানপূর্ব বিবাদ নির্বাচনোত্তর বাংলাদেশেও নতুন রূপে অব্যাহত। রাজপথে আবার পাল্টাপাল্টি বক্তৃতা, হুঁশিয়ারি, আন্দোলনের হুমকি। যে ছাত্র-জনতা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়েছিল, অভ্যুত্থানের সেই সম্মিলিত শক্তি আজ পরস্পরের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াচ্ছে, এর চেয়ে বেদনাদায়ক দৃশ্য আর কী হতে পারে? ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বিপ্লবের শক্তিগুলোর অন্তর্কলহই প্রতিবিপ্লবের সবচেয়ে উর্বর ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। পরাজিত ফ্যাসিবাদী শক্তি দেশে-বিদেশে বসে এই বিভাজনের ফাটল দিয়েই পুনর্বাসনের স্বপ্ন দেখছে- এ কথা ভুলে গেলে চলবে না।
দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা একটি সরকারের জন্য যেমন অভূতপূর্ব সুযোগ, তেমনি ভয়ঙ্কর পরীক্ষাও বটে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বারবার ক্ষমতার ঔদ্ধত্য, বিরোধী মত দলনের প্রবণতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দলীয়করণের জন্ম দিয়েছে ১৯৭৩-এ দিয়েছে, ২০০৮-পরবর্তী সময়ে দিয়েছে। বর্তমান সরকারকে মনে রাখতে হবে, তাদের এই ম্যান্ডেট কোনো দলীয় বিজয়ের ফসল নয়; এটি জুলাই শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়ানো এক ঐতিহাসিক আমানত। জনগণ ভোট দিয়েছে অতীতের ধারাবাহিকতার জন্য নয়; বরং অতীত থেকে চূড়ান্ত বিচ্ছেদের প্রত্যাশায়। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন হিসাবটাও নির্মম নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থানের সঙ্কট, আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতা আর সেবা খাতে ঘুষ-দুর্নীতির পুরনো চিত্র যদি বদলাতে না দেখা যায়, তবে জনগণের কাছে অভ্যুত্থান আর নির্বাচনের সব অর্জনই অর্থহীন মনে হবে। প্রত্যাশার সাথে প্রাপ্তির এই ব্যবধানই টকভিল-কথিত সেই বিপজ্জনক মুহূর্ত যেখান থেকে জন্ম নেয় নতুন হতাশা, নতুন অস্থিরতা।
তৃতীয় ৫ আগস্ট সামনে রেখে তাই কয়েকটি অগ্রাধিকার আজ অনস্বীকার্য। প্রথমত, গণভোটে জাতীয় স্বীকৃতিপ্রাপ্ত জুলাই সনদের বাস্তবায়নকে দলীয় সুবিধার পাল্লায় না মেপে একটি সুনির্দিষ্ট, সময়াবদ্ধ ও আইনি রূপরেখার মধ্যে আনতে হবে; কোন সংস্কার কবে, কিভাবে বাস্তবায়িত হবে- জাতির সামনে তার স্বচ্ছ রোডম্যাপ ঘোষণা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জুলাই গণহত্যাসহ বিগত ফ্যাসিবাদী আমলের অপরাধের দৃশ্যমান, নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিচার ত্বরান্বিত করতে হবে; বিচারহীনতার সংস্কৃতিই স্বৈরাচারের জন্মভূমি। তৃতীয়ত, নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা এবং স্বাধীনতা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো দল রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যক্তিগত জমিদারিতে পরিণত করার দুঃসাহস না পায়। চতুর্থত, গণমাধ্যম ও ভিন্নমতের স্বাধীনতাকে সরকারের সমালোচনা সহ্য করার সক্ষমতা দিয়েই প্রমাণ করতে হবে; কারণ যে জাতি সমালোচনার কারণে গণমাধ্যম বন্ধের ইতিহাস দেখেছে, সে জাতি কণ্ঠরোধের সামান্যতম আলামতও ক্ষমা করবে না। আর পঞ্চমত, অভ্যুত্থানের শক্তিগুলোকে সরকারি দল, বিরোধী দল, তরুণদের নতুন রাজনৈতিক ধারা ও নাগরিক সমাজ ন্যূনতম জাতীয় কর্মসূচিতে ঐকমত্যে ফিরতে হবে। মতপার্থক্য থাকবেই; কিন্তু ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান রোধ ও রাষ্ট্র মেরামতের প্রশ্নে বিভাজন মানে অভ্যুত্থানের কবর রচনা।
ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না, আর গণ-অভ্যুত্থান জাতির জীবনে বারবার আসে না। চব্বিশের জুলাই-আগস্ট আমাদের এনে দিয়েছিল শতাব্দীতে একবার আসা এক রূপান্তরের সুযোগ; ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারি সেই সুযোগকে গণতান্ত্রিক বৈধতার সিংহদুয়ারে পৌঁছে দিয়েছে। এখন দায়িত্ব নির্বাচিত নেতৃত্বের তারা কি জুলাইয়ের আমানতের মর্যাদা রাখবেন, নাকি ক্ষমতার চিরাচরিত মোহে সেই আমানত খেয়ানত করবেন? আবু সাঈদ, মুগ্ধসহ হাজারো শহীদের রক্ত যেন কেবল ক্ষমতার পালাবদলের সিঁড়ি না হয়; প্রত্যাশা যেন মরীচিকা না হয়। ৫ জুলাইয়ের চেতনাকে বুকে ধারণ করে, ৫ আগস্টের ঋণ শোধের অঙ্গীকারে শাসক, বিরোধী দল, রাষ্ট্রচিন্তক ও তরুণ প্রজন্ম সবাই দলীয় সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে এক ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণে ব্রতী হোক। দুই বছর পূর্তির এই লগ্নে সেটিই হোক জাতির একমাত্র অঙ্গীকার।
লেখক : অধ্যাপক (অব:), সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়