বাংলাদেশের গ্যাস-সঙ্কট এখন শিল্প, বিদ্যুৎ, কৃষি, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতির সঙ্কট। শিল্পকারখানা প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ পাচ্ছে না, বিদ্যুৎকেন্দ্র বসে থাকছে এবং নতুন বিনিয়োগ অনিশ্চয়তায় পড়ছে। সঙ্কট দ্রুত মোকাবেলা করতে হবে; কিন্তু ভুল অর্থনৈতিক ভিত্তিতে সমাধান খুঁজলে আজকের ঘাটতি সাময়িকভাবে কমলেও আগামী দিনের সঙ্কট আরো গভীর হবে।

এই প্রেক্ষাপটে মহেশখালীর কুতুবজোম এলাকায় দৈনিক ৬০০ এমএমসিএফডি ক্ষমতার নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের উদ্যোগকে শুধু অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সাথে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক মুদ্রার দায়, আন্তর্জাতিক মূল্যঝুঁকি, ভর্তুকি, রাষ্ট্রীয় নিশ্চয়তা এবং আমদানিনির্ভরতার প্রশ্ন। আমাদের অবস্থান আবেগনির্ভর এলএনজি-বিরোধিতা নয়। বর্তমান ঘাটতিতে কিছু এলএনজি প্রয়োজন; কিন্তু সেটি সহায়ক নিরাপত্তাব্যবস্থা হবে, দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার স্থায়ী মেরুদণ্ড নয়।

সরকার জানিয়েছে, প্রস্তাবিত টার্মিনালটি ডিসেম্বর ২০২৮ নাগাদ চালু হলে প্রতিদিন আরো ৬০০ এমএমসিএফডি এলএনজি গ্রহণ ও পুনরায় গ্যাসে রূপান্তরের সক্ষমতা তৈরি হবে; কিন্তু টার্মিনালের ধারণক্ষমতা আর গ্যাস সরবরাহের নিশ্চয়তা এক বিষয় নয়। টার্মিনাল এক ঘনফুট গ্যাসও উৎপাদন করে না; এটি বিদেশ থেকে আনা তরলীকৃত গ্যাস খালাস ও পুনরায় গ্যাসে রূপান্তরের প্রবেশদ্বার মাত্র।

প্রবেশের এই দরজা সচল রাখতে প্রতি বছর আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কার্গো কিনতে, বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে এবং গ্যাস জাতীয় গ্রিডে নেয়ার জন্য পর্যাপ্ত পাইপলাইন নির্মাণ করতে হবে। পূর্ণ মূল্য শিল্পের ওপর চাপালে উৎপাদন ব্যয় ও পণ্যের দাম বাড়বে; মূল্য না বাড়ালে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে। দুই ক্ষেত্রেই জনগণকে বিল দিতে হবে।

২০২৬ সালের ১৫ আগস্ট পেট্রোবাংলার হিসাবে জাতীয় গ্রিডে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল দৈনিক প্রায় দুই হাজার ৪৪৩ এমএমসিএফডি। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে এসেছে এক হাজার ৬১৫ এবং এলএনজি থেকে ৮২৮ এমএমসিএফডি। অর্থাৎ প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ছিল দেশীয় গ্যাস। দেশের দৈনিক চাহিদা প্রায় তিন হাজার ৮০০ থেকে চার হাজার এমএমসিএফডি বলে জানানো হয়েছে। প্রধান ভিত্তি দেশীয় উৎপাদন; একে দুর্বল রেখে আমদানি বাড়ানো আত্মঘাতী নির্ভরতা তৈরি করতে পারে।

নতুন টার্মিনালের আর্থিক দায় বোঝার জন্য ২০২৫ সালের হিসাব যথেষ্ট। ওই বছর বাংলাদেশ ১০৯টি এলএনজি কার্গো আমদানিতে প্রায় ৩ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। কার্গোগুলোতে প্রায় ৩৫০ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন এমএমবিটিইউ জ্বালানি ছিল; গড় ক্রয়মূল্য দাঁড়ায় প্রতি এমএমবিটিইউ প্রায় ১১ দশমিক ০৫ ডলার।

গড় তাপমান ধরে দৈনিক ৬০০ এমএমসিএফডি গ্যাস এক বছর সরবরাহ করতে প্রায় ২১৯ মিলিয়ন এমএমবিটিইউ এলএনজি প্রয়োজন। ২০২৫ সালের গড় মূল্য ধরে শুধু কার্গো কিনতেই বছরে প্রায় ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার লাগবে। প্রতি ডলার ১২২ টাকা ধরে এটি প্রায় সাড়ে ২৯ হাজার কোটি টাকা। এটি সরকারি চূড়ান্ত প্রাক্কলন নয়; ২০২৫ সালের গড় দাম, আনুমানিক তাপমান ও উল্লিখিত বিনিময় হারে করা তুলনামূলক হিসাব।

এর সাথে টার্মিনালের ফি যোগ হবে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত টার্মিনালের জন্য চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সিএনইই দৈনিক তিন লাখ ৪২ হাজার ডলার পুনর্গ্যাসীকরণ ফি চেয়েছে, যা বিদ্যমান দুই টার্মিনালের তুলনায় ৩৫-৩৭ শতাংশ বেশি। এই ফি বছরে প্রায় ১২ কোটি ৪৮ লাখ ডলার বা প্রায় এক হাজার ৫২৩ কোটি টাকা। আলোচনাকারী কমিটি ১২ শতাংশ ছাড়ের হার ধরে ১৫ বছরের অর্থপ্রদানের দায়ের বর্তমান মূল্য হিসাব করেছে প্রায় ১ দশমিক ০০২ বিলিয়ন ডলার বা ১২ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে এলএনজি কার্গোর দাম নেই। প্রস্তাবটি প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক দরপত্রেও আসেনি এবং মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা স্বাধীনভাবে নির্ধারিত হয়নি।

সুতরাং ২০২৫ সালের গড় মূল্য ধরে পূর্ণ ৬০০ এমএমসিএফডি ব্যবহার করতে শুধু কার্গো ও টার্মিনাল ফি মিলিয়েই বছরে প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। এর বাইরে থাকবে পাইপলাইন, অর্থায়ন ব্যয়, রাষ্ট্রীয় নিশ্চয়তা ও ভর্তুকি। বিদেশী অর্থায়নও বিনামূল্যের নয়; দৈনিক ফি ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে মূলধন, সুদ ও মুনাফা নেয়া হবে।

এলএনজির মূল্য বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণেও নেই। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ প্রায় ১০ ডলার প্রতি এমএমবিটিইউ দরে স্পট এলএনজি কিনেছিল; মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাত ও কাতারের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার পর মার্চে কিছু কার্গোর দাম ২৩ থেকে ২৮ ডলারের বেশি হয়। তখন সরকারকে বেশি দামে কার্গো কিনে রিজার্ভে চাপ দিতে হবে, ভর্তুকি বাড়াতে হবে অথবা আমদানি কমিয়ে টার্মিনাল আংশিক খালি রাখতে হবে।

বিদ্যমান দু’টি টার্মিনালের মোট পুনর্গ্যাসীকরণ সক্ষমতা প্রায় এক হাজার ১০০ এমএমসিএফডি; কিন্তু দুর্ঘটনা, আবহাওয়া, মেরামত ও কার্গোর ঘাটতিতে সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। ২০২৬ সালের ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে আগুনের ঘটনায় দৈনিক প্রায় ৪৫০ এমএমসিএফডি সরবরাহ বন্ধ হয়। নতুন টার্মিনাল কিছু বিকল্প দেবে; কিন্তু মহেশখালী অর্থাৎ একই এলাকায় হলে ভৌগোলিক ও সমুদ্রপথের ঝুঁকি থাকবে। এটি সাশ্রয়ী কার্গো বা ডলারের বিকল্প দিতে পারবে না।

এই অবস্থায় দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনকে জাতীয় জরুরি কর্মসূচি হিসেবে নিতে হবে। তবে ১০০টি কূপ খনন করলেই নিশ্চিতভাবে দৈনিক ৬০০ বা এক হাজার এমএমসিএফডি পাওয়া যাবে— এমন দাবি করা উচিত নয়। অনুসন্ধান কূপ ব্যর্থ হতে পারে, মজুদ ছোট হতে পারে এবং উৎপাদন দ্রুত কমে যেতে পারে। পেট্রোবাংলার একটি পরিকল্পনায় ১০০ কূপ সফল হলে দৈনিক প্রায় ৯৮৫ এমএমসিএফডির সম্ভাবনা দেখানো হয়েছিল; এটি পরিকল্পনাগত প্রত্যাশা, নিশ্চিত উৎপাদন নয়। (পেট্রোবাংলার বার্ষিক প্রতিবেদনগুলো)

এই অনিশ্চয়তাকে দেশীয় অনুসন্ধান অবহেলার অজুহাত করা যাবে না। ২০২৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর সংসদে জানানো হয়, সম্পন্ন ৩০টি কাজ থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ১০০ এমএমসিএফডি গ্যাস যুক্ত হয়েছে এবং সাতটি চলমান কূপ থেকে আরো ৮৫ এমএমসিএফডির আশা রয়েছে। আরেক সরকারি বক্তব্যে ৩০টি কূপ থেকে ১৪০ এমএমসিএফডি যোগ হওয়ার কথা বলা হয়। এই অসামঞ্জস্য কূপভিত্তিক স্বাধীন যাচাইয়ের প্রয়োজন প্রমাণ করে।

গ্যাস আবিষ্কৃত হলেও পাইপলাইন না থাকলে তা জাতীয় সঙ্কট কমায় না। ২০২৪ সালে সম্পন্ন ১১টি কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ১২৬ এমএমসিএফডি গ্যাসের সম্ভাবনা নিশ্চিত হলেও গ্রিডে যুক্ত হয়েছিল মাত্র ৪১ এমএমসিএফডি; বাকি গ্যাসের বড় অংশ ভোলায় আটকে ছিল। দ্য ডেইলি স্টার তাই জরিপ, অনুসন্ধান, উন্নয়ন কূপ, পুরনো কূপ পুনরুজ্জীবন, চাপ বৃদ্ধির ব্যবস্থা, প্রক্রিয়াকরণ এবং গ্যাস গ্রিডে নেয়ার পাইপলাইনকে একই বিনিয়োগ কর্মসূচিতে আনতে হবে।

দেশীয় গ্যাস কর্মসূচিও বিনা খরচের নয়। ভোলায় পাঁচটি কূপ খননের একটি প্রস্তাব প্রায় ৯০৭ কোটি টাকা ব্যয়ে অনুমোদন হয়েছে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা তাই শুধু ‘দেশীয় গ্যাস সস্তা’ বললেই হবে না। প্রতিটি প্রকল্পকে সম্ভাব্য উত্তোলনযোগ্য মজুদ, টেকসই উৎপাদন, গ্রিডে পৌঁছানোর সময় এবং প্রতি ইউনিট সরবরাহযোগ্য গ্যাসের পূর্ণ ব্যয়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। একই মানদণ্ডে এলএনজির কার্গো, টার্মিনাল, পাইপলাইন, ভর্তুকি ও বৈদেশিক মুদ্রার পূর্ণ ব্যয়ও হিসাব করতে হবে।

এই পরীক্ষায় দেশীয় গ্যাসের মৌলিক সুবিধা হলো— সফল বিনিয়োগের পর কূপ, মজুদ, তথ্য, দক্ষ জনবল ও অবকাঠামো বাংলাদেশের সম্পদ হয়ে থাকে। এলএনজি কার্গোর অর্থ গ্যাস ব্যবহারের সাথে শেষ হয়ে যায়। দেশীয় কর্মসূচিকে লাভজনক প্রমাণ করতে পুরো ৬০০ এমএমসিএফডি উৎপাদনেরও প্রয়োজন নেই। ২০২৫ সালের গড় মূল্য ধরে দৈনিক ১০০ এমএমসিএফডি দেশীয় গ্যাস বছরে প্রায় ৪০ কোটি ডলার, ৩০০ এমএমসিএফডি প্রায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন এবং ৪০০ এমএমসিএফডি প্রায় ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের আমদানি প্রতিস্থাপন করতে পারে।

সবার আগে অর্থ দিতে হবে পুরনো ও বন্ধ কূপ পুনরুজ্জীবন, উৎপাদন কমে যাওয়া কূপে চাপ বাড়ানো, বিদ্যমান ক্ষেত্রের উন্নয়ন কূপ, প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র এবং আবিষ্কৃত গ্যাস গ্রিডে নেয়ার পাইপলাইনে। এরপর উচ্চ সম্ভাবনাময় নতুন অনুসন্ধান চালাতে হবে। বাপেক্সকে আধুনিক রিগ, প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল ও পরিচালন সক্ষমতা দিতে হবে; পাশাপাশি স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক চুক্তিতে আন্তর্জাতিক অনুসন্ধান বিনিয়োগ আনতে হবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, নতুন টার্মিনাল ডিসেম্বর ২০২৮-এর আগে গ্যাস দেবে না। একই সময়ে বহু পুরনো কূপ পুনরুজ্জীবন, উন্নয়ন কূপ, প্রক্রিয়াকরণ ও পাইপলাইন প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব। তাই স্বাধীন পর্যালোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত নতুন টার্মিনালের চূড়ান্ত চুক্তি স্থগিত রাখা হোক। ৯০ দিনের মধ্যে কূপভিত্তিক জাতীয় গ্যাস নিরীক্ষা এবং টার্মিনালের পুরো মেয়াদের ব্যয়, কার্গো, বৈদেশিক মুদ্রা, ভর্তুকি, পাইপলাইন ও গ্রাহকের মূল্য বহনের সক্ষমতা প্রকাশ করা হোক।

দেশীয় গ্যাসের অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিসঙ্গত ও দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগানোর পরও যে ঘাটতি থাকবে, শুধু সেই যাচাই করা ঘাটতি ও জরুরি নিরাপত্তার জন্য সর্বনিম্ন প্রয়োজনীয় এলএনজি সক্ষমতা রাখা হোক। বাংলাদেশের মাটির নিচের গ্যাস জাতীয় সম্পদ; আমদানি করা এলএনজি প্রতি বছরের ডলার দায়। সাশ্রয়ী কার্গো, পর্যাপ্ত পাইপলাইন, বৈদেশিক মুদ্রা এবং দাম পরিশোধে সক্ষম গ্রাহক ছাড়া একটি টার্মিনাল জ্বালানি নিরাপত্তা নয়— এটি একটি ব্যয়বহুল প্রবেশদ্বার, যার অপর পাশে গ্যাসের স্থায়ী নিশ্চয়তা নেই।

জ্বালানি নিরাপত্তা আমদানি করা যায় না— অনুসন্ধান, বিনিয়োগ, দক্ষতা, সুশাসন এবং নিজের সম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে নির্মাণ করতে হয়।

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য

rtlbddhaka@yahoo.com