জাতীয় বেতন স্কেল নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের যে অপেক্ষা, অবশেষে তার অবসান হয়েছে। সরকার নতুন জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুমোদন করেছে। নিঃসন্দেহে এটি প্রায় ২৪ লাখ সামরিক-বেসামরিক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্তের ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত; কিন্তু একটি বেতন স্কেল শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর বিষয় নয়; এর সাথে জড়িয়ে থাকে রাষ্ট্রের অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আয়, বেসরকারি খাতের মজুরিকাঠামো, পেনশন-ব্যবস্থা এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়। প্রশ্নটি তাই শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কত বাড়ল, তা নয়। প্রশ্ন এটিও যে, এ বেতন বৃদ্ধির অর্থনৈতিক মূল্য কে দেবে এবং এর সুফল কতটা বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাবে।
গত ৩১ আগস্ট ২০২৬ মন্ত্রিসভার বৈঠকে নতুন বেতন স্কেল অনুমোদন করা হয়েছে। নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের মূল বেতন আট হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ বৃদ্ধি প্রায় ১৪২ শতাংশ। অন্য দিকে প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে দ্বিগুণ করে এক লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। নতুন কাঠামোয় বিদ্যমান ২০টি গ্রেডই বহাল থাকছে।
সরকারের যুক্তি হলো— মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনমান এবং রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে এই কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। যুক্তিটি অস্বীকারের উপায় নেই। কারণ গত কয়েক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও পরিবহন ব্যয় যে হারে বেড়েছে, তার সাথে পুরনো বেতনকাঠামোর সামঞ্জস্য ক্রমে দুর্বল হয়েছে।
তবে এখানে আরেকটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে। সরকারি চাকরিজীবীদের আয় বাড়লে বাজারে পণ্যের চাহিদা বাড়বে। যদি একই সময়ে উৎপাদন ও সরবরাহ না বাড়ে, তাহলে বাড়তি আয় আবারো মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করতে পারে। ফলে বেতন বৃদ্ধির একটি অংশ যদি বাজারদরের বৃদ্ধিতে শেষ হয়ে যায়, তাহলে প্রকৃত অর্থে সরকারি চাকরিজীবীদের ক্রয়ক্ষমতা কতটা বাড়বে?
এটি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন কোনো অভিজ্ঞতা নয়। অতীতের প্রায় প্রতিটি জাতীয় বেতন স্কেলের পর সরকারি চাকরিজীবীদের আয় বেড়েছে; কিন্তু একই সাথে বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপও দেখা গেছে। অবশ্য মূল্যস্ফীতির জন্য শুধু বেতন বৃদ্ধি দায়ী— এমন সরল সিদ্ধান্তও সঠিক হবে না। আমদানি ব্যয়, জ্বালানি মূল্য, বিনিময় হার, সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা, বাজার ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক পণ্যমূল্যসহ বহু কারণ মূল্যস্ফীতিকে প্রভাবিত করে; কিন্তু বেতন বৃদ্ধির প্রভাব যে সামগ্রিক চাহিদার ওপর পড়ে, তা-ও অস্বীকার করা যায় না।
নতুন বেতনকাঠামোর একটি ইতিবাচক দিক হলো— নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের তুলনামূলক বেশি হারে বেতন বৃদ্ধি। ২০তম গ্রেডে বৃদ্ধি ১৪২ শতাংশ, ১৯তম গ্রেডে ১৪১ শতাংশ, ১৮তম গ্রেডে ১৩৯ শতাংশ এবং ১৭তম গ্রেডে ১৩৮ শতাংশ। বিপরীতে প্রথম থেকে ১১তম গ্রেডে মূল বেতন বৃদ্ধির হার প্রধানত ১০০ শতাংশের মধ্যে আছে। অর্থাৎ নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের ওপর তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় আঘাত পড়ে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর। একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার আয় বৃদ্ধির সাথে একজন চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর আয় বৃদ্ধির বাস্তব প্রভাব এক নয়। তাই নিম্ন গ্রেডে বেশি বাড়ানোর নীতি সামাজিক ন্যায়বিচারের দিক থেকে যুক্তিসঙ্গত।
আরেকটি পরিবর্তনও লক্ষণীয়। পুরনো কাঠামোয় সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাত ছিল ১:১.৯৪৫। নতুন কাঠামোয় তা কমে ১:১.৭৮ হয়েছে। অর্থাৎ বেতনবৈষম্য কিছুটা কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে; কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, শুধু মূল বেতনের অনুপাত কমালেই কি সরকারি চাকরিতে প্রকৃত আয়বৈষম্য কমবে? বিভিন্ন ধরনের ভাতা, সুযোগ-সুবিধা, পদভেদে প্রাপ্ত সুবিধা এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার আর্থিক মূল্য হিসাবের মধ্যে না আনলে পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো— এর আর্থিক বোঝা। নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হবে আনুমানিক এক লাখ পাঁচ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। সরকারের জন্য এটি ছোট অঙ্ক নয়। আগামী দুই অর্থবছরে তিন ধাপে মূল বেতন বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। বিভিন্ন ভাতা একসাথে কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। ধাপে ধাপে বাস্তবায়নে সরকারের ওপর তাৎক্ষণিক চাপ কিছুটা কমবে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই বাড়তি অর্থের স্থায়ী সংস্থান করতে হবে।
এখানে রাষ্ট্রের রাজস্ব সক্ষমতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সরকার যদি বাড়তি বেতন ও পেনশনের অর্থ জোগাতে গিয়ে করের চাপ বাড়ায়, ঋণনির্ভরতা বাড়ায় অথবা উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষার ব্যয় সঙ্কুুচিত করে, তাহলে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সাধারণ মানুষের ওপর পড়তে পারে। আবার রাজস্ব আয় না বাড়িয়ে বাড়তি অর্থ অর্থনীতিতে প্রবেশ করানো হলে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
অন্য দিকে বেসরকারি খাতের কর্মীদের বিষয়টিও উপেক্ষা করা যায় না। সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে আয় ও সুযোগ-সুবিধার ব্যবধান যত বাড়ে, তত শ্রমবাজারে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে। দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী সরকারি চাকরির বাইরে। কৃষক, শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহনকর্মী, বেসরকারি চাকরিজীবী ও স্বনির্ভর মানুষের আয় একই হারে না বাড়লে, শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে পারবে না। এ কারণে জাতীয় বেতন স্কেলকে বিচ্ছিন্ন কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সাথে একটি জাতীয় মজুরি নীতি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বেসরকারি খাতের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার নীতি থাকা দরকার।
অতীত থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। কোনো সরকার শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের সন্তুষ্ট করতে বেতনকাঠামো তৈরি করতে পারে না। সরকারি চাকরিজীবীরা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ; কিন্তু রাষ্ট্র কেবল তাদের নিয়েই গঠিত নয়। কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, সাংবাদিক, উদ্যোক্তা, বেসরকারি কর্মী— সবাই মিলে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করেন।
আগের সরকারের সময় বেতন বৃদ্ধির রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছিল, সরকারি চাকরিজীবীদের আনুগত্য ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের সাথে বেতনকাঠামোর সম্পর্ক নিয়েও বিতর্ক ছিল। বর্তমান সরকারের ক্ষেত্রে জনগণের প্রত্যাশা আরো বেশি। কারণ এটি নির্বাচিত সরকার। তাই এ সরকারের কাছে প্রত্যাশা, বেতন স্কেল হবে সরকারি চাকরিজীবীদের ন্যায্য অধিকার পূরণের; পাশাপাশি জনগণের অর্থনৈতিক স্বার্থের সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়বে, এটি স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়; কিন্তু সেই সাথে বাজারদর নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। দুর্নীতি কমাতে হবে। করের আওতা বাড়াতে হবে। উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একই সাথে সাধারণ মানুষের আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করতে হবে। নইলে বেতন বাড়বে এক দিকে, অন্য দিকে বাজারের দাম সেই বাড়তি আয় কেড়ে নেবে।
জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ তাই শুধু বেতন বাড়ানোর ঘোষণা নয়; এটি সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার জন্যও একটি বড় পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় সফল হতে হলে সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত— সরকারি চাকরিজীবীদের আয় বাড়বে; কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় যেন তার চেয়ে দ্রুত না বাড়ে।
জনগণের টাকায় পরিচালিত রাষ্ট্রে সরকারি চাকরিজীবীদের ন্যায্য বেতন নিশ্চিত করা যেমন সরকারের দায়িত্ব, তেমনি সেই অর্থের সর্বোচ্চ জনকল্যাণ নিশ্চিত করাও সরকারের দায়িত্ব। নতুন বেতন স্কেলের প্রকৃত সাফল্য তাই নির্ধারিত হবে শুধু ২০তম গ্রেডের ২০ হাজার টাকা কিংবা প্রথম গ্রেডের এক লাখ ৫৬ হাজার টাকায় নয়; নির্ধারিত হবে এই বেতন বৃদ্ধির পর একজন সাধারণ নাগরিকের জীবন কতটা স্বস্তির হলো, তার ওপর।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই— বেতন বাড়ল; কিন্তু জনগণের ক্রয়ক্ষমতা কি বাড়ল? এ প্রশ্নের উত্তর বলে দেবে জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ রাষ্ট্রের জন্য কতটা কল্যাণকর হয়েছে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক