সৌদি আরব, পাকিস্তান এবং তুরস্কের মধ্যে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা জোটের চুক্তি স্বাক্ষরের আগে, রিয়াদ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইসলামাবাদের সাথে একটি কৌশলগত প্রতিরক্ষাচুক্তি স্বাক্ষর করেছিল।

বিভ্রান্তিকর ও অস্থিতিশীল আঞ্চলিক পরিস্থিতি রিয়াদকে এমন কৌশল নিতে প্ররোচিত করেছিল যা রিয়াদ, ইসলামাবাদ এবং আঙ্কারার ত্রিপক্ষীয় ব্লক গঠনের মাধ্যমে এই অঞ্চলে নতুন বাস্তবতা তৈরি করবে। মক্কা চুক্তি এই অঞ্চল এবং বিশ্বের দেশগুলোর সাথে তার সম্পর্ক জোরদারের ক্ষেত্রে সৌদি কূটনীতির সাফল্য। এটি তার প্রতিরক্ষা পদক্ষেপগুলোকে বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলোর জন্য পারস্পরিক স্বার্থ অর্জনের আগ্রহের ফলাফল।

স্বাক্ষরের পরে, চুক্তির পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তিনটি বিষয়ের ওপর জোর দেয়া সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল : চুক্তিটি কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে না বা নির্দিষ্ট দেশগুলোকে লক্ষ্য করে না এবং এর কাজগুলো মৌলিকভাবে আগ্রাসনের পরিবর্তে প্রতিরোধ এবং প্রতিরক্ষার দিকে মনোনিবেশ করে। চুক্তিটি একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে বলে ইরানি দাবির ভিত্তি নেই।

তিনটি দেশ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামরিকভাবে প্রভাবশালী শক্তি। তারা মিলিশিয়া নয় বা তারা গোপনে কাজ করে না। চুক্তিটি বিশেষত ইরানের দিকে পরিচালিত নয় বা ইসরাইলের দিকে নয়, যা তার সংবাদমাধ্যম ইসলামিক ন্যাটো হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

পাকিস্তান একটি উন্নত পারমাণবিক রাষ্ট্র যা তার সামরিক শিল্পের বিকাশ অব্যাহত রেখেছে, বিশেষত তার নৌবাহিনীর কাঠামোর মধ্যে, তুরস্ক ন্যাটো জোটের সদস্য, যা প্রতিরক্ষামূলক এবং আক্রমণাত্মক সামরিক কর্মকাণ্ড কার্যকর করার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সৌদি আরব আট দশকেরও বেশি সময় ধরে বেসামরিক উন্নয়ন, রাষ্ট্র গঠন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার দিকে তার শক্তি সম্পদকে পরিচালিত করেছে। যাই হোক, আজ এটি একটি অশান্ত অঞ্চলে সামরিক ক্ষেত্রে প্রবেশ করছে। এই জাতীয় শিল্পগুলোর প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং প্রশিক্ষণের জন্য সময়, বিশেষজ্ঞ এবং অংশীদারদের প্রয়োজন। তবুও বন্ধু দেশগুলোর সাথে অংশীদারত্ব তৈরি এবং চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রতিরক্ষামূলক সুরক্ষা নিঃসন্দেহে একটি চতুর কৌশল যা দিয়ে রিয়াদ এই অঞ্চলকে বিস্মিত করেছে।

এ ধরনের চুক্তি দীর্ঘ সময়ের জন্য স্থায়ী হতে পারে, এটি সক্রিয় করার প্রয়োজনের কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই। যারা এই চুক্তিটি কেবল নিরাপত্তার কারণেই নয়; বরং এক বিলিয়নেরও বেশি মুসলমানের প্রতিনিধিত্বকারী ইসলামী সংহতির প্রতীক হিসেবেও উদযাপন করেছে।

মক্কা জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার অত্যন্ত ইতিবাচক, একই সাথে কৌশলী ও সতর্ক।

Makka-Treaty

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান জাতীয় সংসদে স্পষ্ট করেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, মক্কা প্যাক্টকে বাংলাদেশ একটি ভালো উদ্যোগ এবং ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে। তবে জোটে যোগ দেয়ার চূড়ান্ত বিষয়টি নির্ভর করছে বর্তমান তিন সদস্যের (সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান) সিদ্ধান্তের ওপর। তারা যদি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে এই জোটে অন্তর্ভুক্ত করার অভিপ্রায় বা প্রস্তাব প্রকাশ করে, তবে সরকার তা গুরুত্বের সাথে এবং ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে। সরকার এই চুক্তিকে সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ও আত্মরক্ষামূলক হিসেবে বর্ণনা করেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষায়— ‘মক্কা প্যাক্ট হচ্ছে বিশ্ব মুসলিম সমাজের আত্মরক্ষার একটি ব্যবস্থা এবং এটি আমাদের মুসলিম পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিষয়। সুতরাং এটি নিয়ে অন্য কোনো দেশের উদ্বেগ প্রকাশের কোনো অবকাশ নেই।’

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যেকোনো প্রতিরক্ষা চুক্তি বা জোটে যোগ দেয়ার ক্ষেত্রে দেশ এবং দেশের জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হবে। বাংলাদেশ তার নিজস্ব স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির সমীকরণ মেনেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

সামরিক শক্তির দিক দিয়ে তুলনামূলক দুর্বল দেশের মক্কা চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের লাভ রয়েছে। পাকিস্তানের মতো পারমাণবিক শক্তিধর এবং তুরস্কের মতো শক্তিশালী সামরিক শক্তির সাথে প্রতিরক্ষা জোট গঠন বাংলাদেশকে বড় নিরাপত্তা গ্যারান্টি দিতে পারে। তুরস্কের ড্রোন প্রযুক্তি এবং পাকিস্তানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির সহজ ও সস্তা প্রবেশাধিকার পাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

মিয়ানমারের সীমান্ত আগ্রাসন বা রোহিঙ্গা সঙ্কট মোকাবেলায় বাংলাদেশ এই জোটের শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামরিক সমর্থন পেতে পারে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের কৌশলগত ও দরকষাকষির ক্ষমতা অনেক বেড়ে যাবে। বাংলাদেশ ছাড়াও মিসর, ইরান, সিরিয়া যুক্ত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদানের সম্ভাবনা চীনের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো নেতিবাচক বা গভীর সঙ্কট তৈরি করবে না; বরং বেশ কিছু ক্ষেত্রে এটি বেইজিংয়ের কৌশলগত স্বার্থের অনুকূলে যেতে পারে।

মক্কা চুক্তির তিন মূল অংশীদারের সাথে চীনের অত্যন্ত গভীর বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে পাকিস্তান হচ্ছে সব পরিস্থিতিতে চীনের কৌশলগত বন্ধু। সুতরাং, নিজের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের এই জোটে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিকে চীন কোনো হুমকি মনে করবে না। চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্পের অর্থনৈতিক ভিত্তি মূলত আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল। বেইজিং মনে করে, এই ধরনের আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা জোট নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তাদের বাণিজ্য পথ আরো সুরক্ষিত করবে। সংক্ষেপে বলা যায়, মক্কা চুক্তির কারণে চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কে ফাটল ধরবে না।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও অস্থিরতার কারণে মুসলিম দেশগুলো নিজেদের যৌথ প্রতিরক্ষার একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে চাইছে। মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষাচুক্তির প্রথম সেক্রেটারি-জেনারেল নিয়োগের বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়েছে। ২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট তুরস্কের ইস্তাম্বুলে জোটের প্রতিষ্ঠাতা তিন দেশের প্রথম উচ্চপর্যায়ের কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটির বৈঠক শেষে এই ঘোষণা দেয়া হয়। জোটের প্রথম সেক্রেটারি-জেনারেল বা মহাসচিব নিযুক্ত হবেন পাকিস্তান থেকে। প্রথম দফায় এই মহাসচিবের মেয়াদকাল হবে তিন বছর। জোটের সব প্রশাসনিক কার্যক্রম ও সহযোগিতা পরিচালনার জন্য সৌদি আরবে একটি স্থায়ী সচিবালয় বা সেক্রেটারিয়েট প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে এবং এই পাকিস্তানি সেক্রেটারি-জেনারেল হবেন সেই সচিবালয়ের প্রধান।

ইস্তাম্বুলের এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে দেশটির উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার, প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ এবং সশস্ত্রবাহিনীর প্রধান (সিডিএফ) ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান জোটের এই প্রশাসনিক কাঠামোর পাশাপাশি নতুন দেশের অন্তর্ভুক্তির সুনির্দিষ্ট ‘রোডম্যাপ’ তৈরির বিষয়টিও নিশ্চিত করেছেন। এই প্রসঙ্গে, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলা যায়।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব ও গ্রন্থকার