‘দাদখানি চাল মুসুরির ডাল চিনি পাতা দই দুটি পাকা বেল, সরিষার তেল ডিমভরা কৈ’— শিশুসাহিত্যিক যোগীন্দ্রনাথ সরকারের (১৮৬৬-১৯৩৭) কালজয়ী ছড়া ‘কাজের ছেলে’র ভীমরতিতে ধরার কথা এখনো অনেকেরই কানে বাজে। বাজারের পথে যেতে যেতে ‘ভোলা ভুতো হাবা’র হার জিতের খেলা দেখতে গিয়ে’ তার স্মরণের ইশতেহারে ‘ডিমভরা বেল, দুটো পাকা তেল’ হয়ে যায় । ঘোষেদের ননী ঘুড়ি ধরে টান দিচ্ছে দেখে তারও তা ওড়াবার ইচ্ছা জাগে। এই ধান্ধায় তার বাজারের তালিকায় ‘দাদখানি তেল , দুটো পাকা দৈ, সরিষার চাল, চিনি পাতা ডাল আর মুসুরির কৈ’ ছটফট করতে থাকে। আর দোকানে গিয়ে সব সওদা আরো ওলটপালট হয়ে যায় ‘দাদখানি বেল, মুসুরির তেল, সরিষার কৈ , চিনি পাতা চাল, দুটো পাকা ডাল, ডিম ভরা দৈ’। পরিপার্শ্বের প্রভাবে কাজের ছেলে তালিকাভুক্ত বাজার সওদা সামগ্রীর নাম ভুলে যায়। যোগীন্দ্রনাথ সরকার কাজের ছেলে রচনা করেন ঊনবিংশ শতকের শেষভাগে, তৎকালীন শিশুদের মনোরঞ্জনের জন্য তো বটেই, তবে তার রচনার মধ্যে সমকালীন সমাজের ঔপনিবেশিক রাজনীতির মনোজগতের নানান কার্যকরণ নিয়ে তির্যক মনোভাব প্রকাশ পেত। যোগীন্দ্র বাবুর বড় ভাই প্রখ্যাত চিকিৎসক নীলরতন সরকারের জ্ঞান অন্বেষণের ধারা থেকে এটা জেনে ছিলেন যে, পরিপার্শ্ব মানুষের মনোযোগ বিভ্রান্ত করতে সদা প্রবহমান।
মনোযোগ বিভ্রান্ত হতে পারে এমন পরিবেশ পরিস্থিতিতে সামাজিক মাধ্যমে গুজবে কান দেয়া যেমন বিধেয় নয়, তেমনি ‘যে লাউ সেই কদু’র পরিবেশে না গিয়ে ইপ্সিত লক্ষ্যে পৌঁছানোয় স্থির প্রাজ্ঞ থাকার বিকল্প নেই। ভোরবেলা থেকে ব্যবসায়-বাণিজ্য শিল্প উৎপাদন ও দেশী-বিদেশী বিনিয়োগের পরিবেশ (বহধনষরহম বহারৎড়হসবহঃ) তৈরির আকাক্সক্ষা ও প্রত্যাশা যখন উচ্চারিত হয়ে সবার পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে, প্রকৃত অবস্থায় দেখা যায় বয়ান ও বাস্তবতার মধ্যে তাল লয় মিলছে না। এ কথা ঠিক যে শুল্ক ছাড় দেয়া পণ্য বাজারে যাওয়ার প্রাক্কালে শিল্প উৎপাদন পর্যায়ে তেল গ্যাস বিদ্যুৎ, নীতিসহায়তার জগদ্দল পাথর সরানোর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন পেরে উঠছে না। সক্ষমতার সম্মিলন ঘটছে না। সমস্যার নাড়ি নক্ষত্র সবার জানা, নেপথ্যের কুশীলবদের সবাই চেনে। তাদের জন্যই মাকড়সার মতো বোনা জটিল জাল ভেদ করা যাচ্ছে না। পুঁজি প্রবাহের সমস্যাগুলোর সীমাবদ্ধতার বাঁধ খুলে দেয়া যাচ্ছে না। একের জবাবদিহির দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে নিজেকে নির্ভার করার সনাতনী প্রথা প্রলম্বিত হচ্ছে। যত দোষ নন্দ ঘোষের ওপর গিয়ে আপতিত হওয়ার সংস্কৃতি থেকে নিষ্কৃতি মিলছে না। নন্দঘোষের ক্যালরি বার্ন করার ক্ষমতা কত, কিভাবে তিনিই সব সামলাবেন? তিনি শত চেষ্টা করে ভালো থাকার চেষ্টা করলেও তাকে ভালো থাকতে হয়তো দেয়া হচ্ছে না, দূরের ও কাছের সমস্যা তাকে দাঁড়াতে দিচ্ছে না বা দেবে না। এটি নিকট ও সুদূর অতীতে শুধু এই দেশ ও সমাজে নয় অধিকাংশ স্বৈরাচার সুখ্যাতি প্রাপ্ত দেশে ঘটেছে। সুতরাং এমন পরিস্থিতিতে ডিম ভরা কৈ যেন দু’টি মুসুরির ডাল, চিনি পাতা দই যেন ডিমভরা দৈ, দাদখানি চালে রূপান্তরিত না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখা পক্ষ-বিপক্ষ সবার জন্য জরুরি। সব কাজে চিন্তা-চেতনায় সম্প্রচারে মনের সাথে যোগাযোগ যেন থাকে, বাইরের চাপ, ব্যতিব্যস্ত রাখার কৌশল কিংবা ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের টোপ যেন না গেলা হয়। বারবার এটি মাথায় রাখতে হবে, কেউ অধম ছিল বলে নিজের উত্তম থাকার পথে যেন অধমের প্রেতাত্মারা বিপথগামী করে না দিতে পারে। মনে রাখা দরকার হবে, পক্ষের সফলতাই বিপক্ষের পরাজয় নিশ্চিত করবে, আর পক্ষের পরাজয়ই বিপক্ষের বিজয়।
অনেকে অজ্ঞাতসারে নিজের কথা ও কাজে নিজেই ধরা খায়। জুলাই অভ্যুত্থান নামে খ্যাত বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন স্বৈরাচারের পতন পলায়নপর্ব পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছিল। কবি সুকান্ত ছিলেন প্রেরণা, ‘জ্বলে পুড়ে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়’। সে সময়কার পুলিশ অফিসার বুঝাচ্ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে, ‘স্যার একজন গুলি খেয়ে মারা গেল এটি তার সহযাত্রী পাশের জন দেখেও ভয় পায় না, সরে যায় না। এমন অকুতোভয়দেরকে আমরা ভয় দেখিয়ে নিবৃত্ত করতে পারব না।’ সেই অকুতোভয় পরিবেশ পরিস্থিতি আজ স্রেফ স্ববিরোধিতায় পক্ষ বিপক্ষীয়করণের গোলকধাঁধায় যেন থমকে না যায় ।
দেশে একসময় বেসরকারি খাতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের স্বার্থে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের কথা ঢাকঢোল পিটিয়ে বলা হয়েছিল, জনগণকে লোভ দেখানো হলো লাখো কোটি জনবলের চাকরি হবে। বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণে বিনিয়োগের উদ্যোগ নিলেন। সরকারি পোষক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে তাদের জমি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, শুল্ক সুবিধাসহ অনেক কিছু সহায়তা পাওয়ার কথা থাকলেও তার আর সাক্ষাৎ মিলল না। পক্ষান্তরে সরকার নিজেই বিশাল শিল্পনগর প্রতিষ্ঠা করল সরকারি ফ্রি খাসজমি (বিশাল চরে) এবং টাকায় (বিশ্বব্যাংক থেকে লোন নিয়ে) স্থাপন করে বিদেশী বন্ধুরাষ্ট্রের কোম্পানিদের জন্য স্বল্পমূল্যে বিশাল এলাকা ছেড়ে দেয়া হলো। ফলে ১০০টি বেসরকারি এসইজেড বিদেশী বিনিয়োগ প্রাপ্তিতে নিদারুণ প্রতিযোগিতায় পড়ে গেল। সরকারের নিজস্ব শিল্পনগর বানানোর খায়েশই যদি ছিল তাহলে বেসরকারি খাতকে এভাবে বিনিয়োগে নামিয়ে নাস্তানাবুদ করা কেন? বেসরকারিদের জমি সংগ্রহে প্রাণান্ত প্রচেষ্টা, শুল্ক কর প্রণোদনা ও বিদ্যুৎ ও গ্যাসলাইন দেয়ার ব্যাপারে কেন টালবাহানা, কেন কস্ট অব ইনভেস্টমেন্ট দরকষাকষি? স্ববিরোধিতার মাত্রাটা বড্ড বেশি বেড়ে গিয়েছিল।
সাবেক সরকার সব কিছুকে ডিজিটাল করার ওপর জোর প্রচার ও গুরুত্ব দিত। দেখা গেল সেই ডিজিটাল কার্যক্রম যেভাবে যেখানে হওয়ার কথা সেখানে না হয়ে তা সাইবার সিকিউরিটির নামে ধামে লা-পাত্তা হতে চলল। অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ বলে একটি কথা আছে । দেখা যায়, তোষামোদি ও চাটুকারিতায় অনেকেই হিতাহিত জ্ঞান হারান। ফলে যার যা করার কথা তা বিনা কারণে অন্যের কথা ও কাজের চৌহদ্দিতে ঢুকে পড়ে। শেষে সে নিজের দলের কিংবা সবার জন্য ঝামেলার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিভিন্ন পরিবর্তন প্রেক্ষাপট পর্যালোচনায় দেখা যায়, দলীয় বাহিনী, চাটুকার, বর্ণচোরা, আত্মীয়বর্গ ও চাঁদাবাজ খয়ের খাঁ’রাই জাতীয় নেতৃত্বকে ডুবিয়েছে। এরাই সমাজে সরকারে ও রাষ্ট্রে বিভেদ ও বৈষম্য সৃষ্টির হোতা। মাত্র কয়েক বছর আগে এটা নগ্নভাবে প্রকাশ পেয়েছিল যে শান্তিশৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রণের কাজে দায়িত্বশীল প্রধান ব্যক্তিরাই সীমাহীন, লাগামহীন ঔদ্ধত্য দেখাতে সক্ষম হয়েছিলেন। মুখে অসাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার বুলি আউড়িয়েও ‘কিভাবে ঘোলা পানি পরিষ্কার করতে হয় এটি তারা জানেন’ বলে ধমক দিয়েও সংখ্যালঘুদের সহায় সম্পত্তি কুক্ষিগত করেছিলেন, বড় সমাবেশে ঠাণ্ডা মাথায় গণহত্যা চালিয়েছিলেন। সমাজে সর্বত্র দুর্নীতির দৌরাত্ম্যে আস্থাহীন পরিবেশ সৃষ্টি করে জনগণের নাম করে জনগণের সাথে প্রতারণার ফাঁদ পেতে, পাতানো নির্বাচনের দ্বারা ইতিহাসের সেরা স্ববিরোধিতার, প্রতারণার উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছিল। রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যকে ভ্রুকুটি করে রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে দলীয়করণ করে ন্যায় নৈতিকতা ও নীতিনির্ভরতার ঘাট মাঠ পয়মাল করা হয়। আয়নাঘর সৃষ্টির মাধ্যমে চরম অমানবিক ও মৌলিক অধিকার হরণকারী আচরণ চলে। তবে ‘মা তোর বদনখানি মলিন হলে আমি কাঁদি’ এ কথা বলে গেয়ে মানুষকে গুম করে, মৌলিক অধিকার হরণ করে, শিক্ষাব্যবস্থাকে পঙ্গু করে, স্বাস্থ্যসেবাকে অসম্ভব করে, ন্যায়নীতিকে নৈরাজ্যের অভিসারী করে স্ববিরোধী স্বৈরাচারের গণতান্ত্রিক দাপট চালানোর চেষ্টা শেষমেশ হালে পানি পায়নি। যারা পালিয়ে বেঁচেছে তারা সংখ্যা ও শক্তিতে কিন্তু কম নয়। তাদের কায়েমি স্বার্থবাদী সমর্থকরা একসময় ভোল পাল্টিয়ে নতুনদের ওপর দোষ চাপানোর পথ ধরতে পারে। বারবার বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে নিজেরাই নিজেদের সহায় সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি করতে থাকবে। ঘরে-বাইরে থেকে নানান ষড়যন্ত্র, গুপ্তচর সেজে হাঙ্গামা বাধাতে থাকবে। স্বৈরাচার একটানা বহু দিন মাস ও বছর একচ্ছত্র শাসন, সাজানো প্রশাসন, শোষণ, লুটপাট, মানবাধিকার লঙ্ঘনের কাজে ছিল বিধায় তাদের ছত্রছায়ায় বহু সুবিধাভোগী গ্রুপ গড়ে ওঠে। এখন তারা নিজেদের আড়াল করার জন্য পদে পদে বাধা সৃষ্টি করতে থাকবে। এমনকি নতুনরা নিজেরাই নিজেদের মধ্যে শত্রু মিত্র সেজে নানান আত্মঘাতী পথ-পন্থা, দখলদারিত্ব কায়েম করতে শুরু করতে পারে। বৈষম্য দূরের কথা বলে এসে কেউ কেউ নিজেরাই কোটারি সৃষ্টিতে মগ্ন হতে পারে। এসব ধৈর্যের সাথে মোকাবেলা করেই সবাইকে সম্পৃক্ত করে দেশ রাজনীতি সমাজ সংসার অর্থনীতির সংস্কার সাধনে সাধনার প্রয়োজন হবে।
শিক্ষাই শক্তি, সুস্বাস্থ্যই শক্তি। সবাই যে যে পর্যায়ে আছে তার তার লেখাপড়ায় মন দেয়ার বিকল্প নেই। কোটাবিরোধী আন্দোলন করে যে মেধাবীদের চাকরি পাওয়ার অধিকার আদায় হলো চাকরি পাওয়ার জন্য সেই মেধাবীরা নিজেদেরকে গড়ে না তুললে প্রতিবেশী ও দেশীয় পক্ষভুক্ত চালাকরা তা ছিনিয়ে নিয়ে যেতেই থাকবে, এটি মাথায় রাখতে হবে। মনোযোগ বিভ্রান্তিতে নয় নীতিনির্ভরতায় থিতু হওয়ার সময় শেষ হয়ে যায়নি, যেতে পারে না।
লেখক : উন্নয়ন অর্থনীতির বিশ্লেষক