শৈশবে অনেকের পাঠক্রমে একটি ছোট পুস্তিকা ছিল, নাম তার ‘দ্য মোরাল এথিক্স।’ বইটি ছোট হলেও তাতে ভারী ভারী কথা ছিল। বইটির একটি চরণ দেশের সমাজ বাস্তবতার নিরিখে মনে নানান প্রশ্ন তৈরি করছে। যতদূর মনে পড়ে, চরণটি এমন ছিল, টহযড়ষু ফবংরৎবং ধহফ ৎিড়হম ধপঃরড়হং ধৎব নড়ঃয ংরহং. সরল বাংলা, ‘অশুভ আকাঙ্ক্ষা এবং অন্যায় আচরণ উভয়ই পাপ।’ এই পাপ এখনো সমাজে হচ্ছে না কি? অথচ অতীতের মতো এখনো একশ্রেণীর ক্লেদাক্ত বাসনা, গর্হিত কর্মকাণ্ড চলছে। মুদ্রার এটি একটি পিঠ। অন্য পিঠে আছে জীবনযুদ্ধে ক্ষত-বিক্ষত জনতার দুঃখ-যাতনা এবং পুঞ্জীভূত রোষ। এমন দুঃখ-বেদনা, রোষ প্রতিকারে এগিয়ে আসবে কে? বর্তমান সরকার। তাহলে অতীতের দায়টা কার। বোদ্ধাদের মতামত, এই দায় শুধু নবীন এই সরকারের নয়, বহু পক্ষের। সেই বহু পক্ষকে না হয় খুঁজে দেখা যাক। আশা করা যায়, নিবন্ধের সম্মুখে স্তরে স্তরে সেই বহু পক্ষকে আবিষ্কার করা যাবে, যা এখন লুকিয়ে আছে সমাজের নানা পরতে। গত দেড় দশকে এখানে সেখানে রোপিত সেই বিষবৃক্ষের শিকড় উপড়ে ফেলা হয়নি।
শুরু থেকেই বাংলাদেশের সামনে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ ছিল। অর্থনৈতিক বৈষম্য, দুর্নীতি, বেকারত্ব, রাজনৈতিক বিভাজন, সুশাসনের ঘাটতি, আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতা। কিন্তু এসব সমস্যার অন্তর্নিহিত কারণ অনুসন্ধান করলে বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়, নীতিনৈতিকতা ও মূল্যবোধের নিদারুণ সঙ্কট। সন্দেহ নেই, দেশে নৈতিকতার সঙ্কট আছে। তবে এটিই একমাত্র সঙ্কট এমন নয়। একটি দেশের সমস্যাগুলো অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক ও ঐতিহাসিক নানা কারণের সমন্বয়। নৈতিকতার দুর্বলতা এসব সমস্যাকে আরো গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী করে তুলতে পারে। কারণ আইন, প্রতিষ্ঠান ও নীতিমালা যতই ভালো হোক, সেগুলো বাস্তবায়ন করে মানুষই। মানুষের মাঝে সততা, দায়িত্ববোধ, ন্যায়বোধ ও জবাবদিহির চেতনা দুর্বল হলে প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র পর্যায়ক্রমে দুর্বল হতে থাকে। নীতিনৈতিকতা বলতে শুধু মিথ্যা না বলা বা ঘুষ না নেয়াই নয়। এর সাথে জড়িয়ে আছে সততা, ন্যায়বোধ, দায়িত্বশীলতা, কর্তব্যবোধ, গভীর আত্মসংযম, জবাবদিহি এবং জনস্বার্থকে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখার মানসিকতা। নৈতিকতার সঙ্কট তখনই তৈরি হয়, যখন মানুষ জানে কোনটি ন্যায় ও কোনটি নয়। কিন্তু ব্যক্তিগত স্বার্থে অতীতে অন্যায়কে বেছে নেয়া হয়েছে এবং এখনো জেনেশুনে একই কাজ হচ্ছে।
সমাজে সেই অন্যায়কে অন্যায় বলে মনে করা হয় না, সত্যকে মিথ্যার মাঝে প্রবেশ করানো বা অন্যায় করা নিয়ে কেউ দ্বিধায় ভোগে না। এটি উদ্বেগের। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় আরো একটি প্রবণতা বিশেষভাবে উদ্বেগের। ঘুষ, তদবির, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রতারণা বা নিয়ম ভঙ্গকে অনেকসময় বাস্তবতা বা সুযোগ নেয়া হিসেবে গ্রহণ করা হয়। বিগত ১৭-১৮ বছর এমন দুর্বৃত্তায়নের চাষাবাদ করা হয়েছে।
ইতঃপূর্বে দুর্নীতি নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানও উদ্বেগের কারণ। ঞৎধহংঢ়ধৎবহপু ওহঃবৎহধঃরড়হধষ-এর ২০২৫ সালের ঈড়ৎৎঁঢ়ঃরড়হ চবৎপবঢ়ঃরড়হং ওহফবী-এ ১০০-এর মধ্যে ২৪ স্কোর নিয়ে ১৮২ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১৫০তম অবস্থানে ছিল। এই সূচক নৈতিকতার সামগ্রিক পরিমাপ নয়। এটি সরকারি খাতে দুর্নীতির ধারণাভিত্তিক মূল্যায়ন। তবে রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দুর্বলতার এটি একটি ইঙ্গিত। একজন নাগরিক যখন আইন না মেনে চলার বিষয়টিকে স্বাভাবিক ভাবে। ব্যবসায়ী যখন প্রতারণাকে ব্যবসার অংশ ভাবে। একজন কর্মকর্তা যখন ঘুষ ছাড়া সেবা দিতে অনীহা প্রকাশ করে এবং একজন অভিভাবক যখন সন্তানের অন্যায় উপায়ে অর্জিত সাফল্য উপভোগ করেন, তখন আসলে সমস্যার বিস্তৃতি প্রকাশ পায়।
নৈতিক সঙ্কট প্রথমে ব্যক্তির বিবেক ও চরিত্রকে আঘাত করে। ব্যক্তিগত সততার পরিবর্তে যখন অর্থ, ক্ষমতা ও সুবিধা মুখ্য হয়, তখন মানুষ অন্যায়ের সাথে আপস করে। অবশ্যই পরিবার হচ্ছে মূল্যবোধ তৈরির প্রথম সোপান; কিন্তু পরিবারে যদি সন্তানের সাফল্যের মাপকাঠি হয় অর্থ, চাকরি, বাড়ি, গাড়ি ও সামাজিক মর্যাদা— সন্তানের অতিরিক্ত অর্থ কিভাবে অর্জিত হলো— এই প্রশ্নটি যদি পরিবারের কাছে না আসে তাহলে এখান থেকেই নৈতিক অবক্ষয় শুরু। এভাবে একটি প্রজন্মের নৈতিকতা নিয়ে আপস হলে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এসব স্বাভাবিক হতে পারে। ব্যক্তি নিয়ে পরিবার, পরিবার নিয়ে সমাজ এবং সমাজ নিয়ে রাষ্ট্র। পর্যায়ক্রমে রাষ্ট্র স্বয়ং নৈতিক অবক্ষয়জনিত দূষণে বৃত্তাবদ্ধ হয়। সমাজের কাছে অন্যায় স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। ঘুষ যখন হয়ে যায় খরচাপাতি, তদবির হয়ে যায় পরিচিতি, স্বজনপ্রীতি হয়ে যায় আপনজনকে সাহায্য করা। শব্দগুলো বদলে গেলেও আচরণের নৈতিক চরিত্র বদলায় না; কিন্তু ভাষার এই পরিবর্তন সমাজকে ধীরে ধীরে অন্যায়ের দিকে ধাবিত করে। শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল বা চাকরি পাওয়া নয়। একজন দায়িত্বশীল ও নৈতিক নাগরিক তৈরি করা শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য। নকল, জাল সনদ যদি গ্রহণযোগ্য হয় তাহলে শিক্ষাব্যবস্থা জ্ঞান ও চরিত্র গঠনের পরিবর্তে শুধু সনদ অর্জনের ব্যবস্থায় পরিণত হবে। ইদানীং তাই ঘটছে। এ নিয়ে কারো কোনো প্রশ্ন নেই। কর্মক্ষেত্রে নৈতিকতার সঙ্কটের বড় প্রকাশ হলো, যোগ্যতার পরিবর্তে পরিচয়, দক্ষতার পরিবর্তে তদবির এবং কর্মদক্ষতার পরিবর্তে ব্যক্তিগত সম্পর্কের মূল্যায়ন। এসব দৃশ্যমান হলে যোগ্যদের পদস্খলন হতে পারে। রাষ্ট্রের জন্য এটি অপরিসীম ক্ষতিকর। কারণ দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়নের ভিত্তি হলো দক্ষ ও যোগ্য মানবসম্পদ। এমন মানুষ যদি পদে পদে হোঁচট খায়, তবে তার কর্মস্পৃহা থেমে যায়। প্রশাসনের উদ্দেশ্য জনসেবা; কিন্তু রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাব যখন সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে তখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান তার নিরপেক্ষতা হারিয়ে ফেলে। বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়। নৈতিকতার সঙ্কট অর্থনীতির ওপর নানামুখী প্রভাব ফেলে। আইনের শাসনের মূল কথা হলো— আইন সবার জন্য সমান; কিন্তু মানুষ যদি বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, অর্থবিত্ত থাকলে আইনের ঊর্ধ্বে থাকা যায় তখন আইন ও বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা হ্রাস পায়। বিচারহীনতা সংস্কৃতি বিকশিত হয়। রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার আইন বা অস্ত্রে নয়। নাগরিকের আস্থার ওপরও রাষ্ট্রের শক্তি নির্ভর করে। নৈতিকতার সঙ্কট রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় ক্ষতি করছে। রাজনীতি যদি জনসেবা ও আদর্শের পরিবর্তে ক্ষমতা, ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের মাধ্যম হয়ে ওঠে তাহলে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো তার মূল্য হারাবে। এমন নৈতিকতার সঙ্কট রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। নাগরিক যদি মনে করে আইন মেনে কাজ করলে সফল হবে না, পরিচিতি আর ক্ষমতা লাগবে, তাহলে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা তৈরি হবে। একটি প্রজন্মের মাঝে হতাশা ব্যাপক হলে, তখন তা জাতির ভবিষ্যতের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনে। তবে তার প্রতিকার কী হতে পারে? নীতিনৈতিকতার সঙ্কটের প্রতিকার শুধু বক্তৃতা, নৈতিক শিক্ষা কিংবা কয়েকটি আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সম্ভব নয়। প্রয়োজন ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়— এই চার স্তরে সমন্বিত এবং দৃশ্যমান পরিবর্তন। একই সাথে পবিত্র কামনাগুলোর বিকাশের সুযোগ পাওয়া নিরন্তর হওয়া। অর্থাৎ সংস্কার করা, সংস্কারের জন্য বিলম্ব নয়। তাৎক্ষণিকভাবে কিছু দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়া জরুরি হয়ে পড়ে। এর মাঝে থাকতে পারে ক্ষমতাবান ও সাধারণ নাগরিকের জন্য একই আইন নিশ্চিত করা। বড় ও ছোট— সবধরনের দুর্নীতির ক্ষেত্রে তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। সরকারি অর্থ ব্যয়ের প্রতিটি স্তরে প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছতা ও নজরদারি বৃদ্ধি করা। দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সম্পদের হিসাব যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা জরুরি। কারণ উপর থেকেই পচন নিচে নামে।
তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের পর প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করা। পদোন্নতি হবে কর্মদক্ষতায়, সরকারি ক্রয় হবে প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছ। সেবা হবে ডিজিটাল ও সহজলভ্য। অভিযোগের প্রতিকার হবে দ্রুত এবং আইন হবে নিরপেক্ষ। মানুষকে শুধু সৎ হওয়ার উপদেশ দিয়ে লাভ হয় না। ব্যবস্থাও এমন হতে হবে যাতে অসততার সুযোগ না থাকে। পরিবার ও শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। আজও শিশু-কিশোর ও যুবকদের জন্য নৈতিক শিক্ষার কোনো উদ্যোগ নেই।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষা শুধু পাঠ্যবইয়ের বিষয় না হয়ে বাস্তব আচরণের অংশ হতে হবে। নকল করে ভালো ফল পাওয়া যাবে না। এমন একটি নৈতিক পরিবেশ তৈরি এখন সময়ের দাবি। নৈতিক সমাজ প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে শক্তিশালী উপায় হলো— দৃষ্টান্ত স্থাপন। যেমন নিজে আচরি ধর্ম পরেরে শিখাও। সমাজ ও রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্ব যদি ক্ষমতার অপব্যবহার না করেন, ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির ক্ষেত্রেও আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করেন, রাষ্ট্রীয় সম্পদকে ব্যক্তিগত সম্পদ হিসেবে না ভাবেন; একইভাবে পরিবারে অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক, কর্মক্ষেত্রে কর্মকর্তা এবং সমাজে নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তির আচরণও পরিশীলিত হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের নীতিনৈতিকতার সঙ্কটকে কোনো শ্রেণী, দল বা প্রতিষ্ঠানের সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করলে, এর প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না। এটি যখন ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র— সব স্তরকে স্পর্শ করে তখন এটি একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে। এই চ্যালেঞ্জ সাহসিকতার সাথে মোকাবেলার জন্য দৃঢ় মানসিকতা তৈরি করা ভিন্ন দ্বিতীয় পথ নেই। তবে তা করতে হবে পর্যায়ক্রমে। এমন ভাবা ঠিক নয় যে, বাংলাদেশের নৈতিক পুনর্গঠনের সম্ভাবনা শেষ হয়ে গেছে; বরং এখনই যদি আইনের শাসন, জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, যোগ্যতার মূল্যায়ন এবং পারিবারিক-সামাজিক মূল্যবোধ পুনরুজ্জীবিত করা যায়, তাহলে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব। রাষ্ট্রের কাজ শুধু দুর্নীতিবাজদের ধরার মধ্যেই শেষ হয় না; বরং প্রয়োজন এমন একটি নৈতিক রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার জন্য অবিরাম চেষ্টা। সুতরাং বাংলাদেশের জন্য পথটি হতে হবে দৃশ্যমান নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের সূচনা। সবাই জানেন, বিগত ১৭-১৮ বছরে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে পাহাড় পরিমাণ আবর্জনা জমেছে, তা এক দিনে হটানো সম্ভব নয়। তবে পরিশীলিত হওয়ার একটি সুন্দর সূচনা জাতির বিবেকে প্রাণ সঞ্চার করবে।
লেখক : সম্পাদক, নয়া দিগন্ত