একজন ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ বা রাষ্ট্র তখনই শক্ত পাটাতনে পা রেখে গতি সঞ্চার করতে পারে, যখন সেখানে নিরবচ্ছিন্ন জ্ঞানচর্চা জারি থাকে। কারণ প্রায়োগিক জ্ঞান, গবেষণা ও সৃজনশীলতার বিকাশ ব্যক্তি ও রাষ্ট্রকে উন্নতির পথে এগিয়ে নেয়। সমকালীন বিশ্বে যেসব দেশ জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চায় যত এগিয়ে, তার অর্থনৈতিক ও সামাজিক শক্তি তত বেশি সুদৃঢ়। এ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে তৃতীয় বিশ্বে কাক্সিক্ষত উন্নয়ন না হওয়ার প্রধানতম বাধা জ্ঞানভিত্তিক সমাজের যথাযথ মূল্যায়নের অভাব।
বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। এ দেশে জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রমের যথাযথ মূল্য না থাকায় সাংবাদিক, লেখক, গবেষক, শিক্ষক, কবি, শিল্পী ও অন্যান্য সৃজনশীল পেশার মানুষকে প্রায়ই বঞ্চনার শিকার হতে হয়। আর্থিক অনিশ্চয়তায় জীবন কাটাতে হয়।
এর সর্বশেষ নজির হলেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সৈয়দ গোলাম বতুল কাজিম রেজা। তিনি সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদান রাখায় দেশের মর্যাদাপূর্ণ ফিলিপস পুরস্কারে ভূষিত হন। গত ২ সেপ্টেম্বর ইন্তেকাল করেছেন তিনি। প্রবীণ এই সাংবাদিক মৃত্যুর আগে গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে তার চিকিৎসাব্যয় মেটাতে জরুরি আর্থিক সহায়তার প্রয়োজনের সংবাদ প্রকাশিত হয়। তার শেষজীবন আর্থিক সঙ্কট ও চিকিৎসা সহায়তার প্রয়োজনীয়তার যে চিত্র প্রকাশ্যে এসেছে, তা সত্যি বেদনার। একজন পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক যদি জীবন সায়াহ্নে আর্থিক অনিশ্চয়তায় ভোগেন, তাহলে সাধারণ একজন সাংবাদিকের অবস্থা কী তা সহজে অনুমেয়।
স্বাধীন চিন্তা, গবেষণা, লেখালেখি, শিল্প-সংস্কৃতি কিংবা জ্ঞানচর্চা করতে হলে দরকার প্রয়োজনীয় আয়, প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ও আর্থিক স্বাধীনতা। এ দেশের এখনকার সমাজবাস্তবতায় এসবের ঘাটতি প্রকট। এর মধ্যে সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিতদের আর্থসামাজিক নিরাপত্তাহীনতা বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। যদিও তথ্যের এই বিস্ফোরণের যুগে সাংবাদিকের গুরুত্ব একটুও কমেনি। আরো বেড়েছে। হাতে হাতে স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইন্টারনেটের বিস্তারে তথ্যের অবাধ প্রবাহ। তথ্যের কোনো অভাব নেই; কিন্তু সেই তথ্যের সাথে গুজব, অপতথ্য ও প্রচারণাও বেড়েছে। যে জন্য সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ে নির্ভরযোগ্য সংবাদ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি যারা আনজাম দেন, তাদের আর্থসামাজিক অবস্থার খবর কি আমরা রাখি? বাস্তবতা সুখকর নয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার সাথে তাল মিলিয়ে সাংবাদিকদের বড় অংশের আয় বাড়েনি। অনেক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে যথাযথ বেতনকাঠামো বাস্তবায়িত হয়নি। শুধু তাই নয়, কোথাও কোথাও নিয়মিত বেতন পাওয়াও অনিশ্চিত। ফলে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্নের সাথে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে।
একজন সাংবাদিক অন্যের চাকরি হারানোর খবর রাখেন। দুস্থ রোগীর চিকিৎসাব্যয় নিয়ে প্রতিবেদন করেন। কৃষক উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন কি না, তা প্রকাশ করেন। শ্রমিকের বঞ্চনা নিয়ে প্রতিবেদন করেন। দুর্নীতির অনুসন্ধান করেন ঝুঁকি নিয়ে। দ্রব্যমূল্যের চাপে সাধারণ মানুষের জীবনযাপন কিভাবে বিপর্যন্ত হচ্ছে, তা সরেজমিন তুলে ধরেন; কিন্তু সেই সাংবাদিক যখন নিজের বেতন নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকেন, তখন তার খবর কে রাখেন?
বাংলাদেশে সাংবাদিকতার আর্থিক রূঢ় বাস্তবতায় কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘রানার’ কবিতায় চিত্রায়িত রানারের গভীর মিল পাওয়া যায়। সুকান্তের রানার রাতের আঁধার ভেদ করে মানুষের চিঠি পৌঁছে দেয়। সেই চিঠিতে থাকে আনন্দ, থাকে দুঃখ। রানার শুধু ঘাড়ে বয়ে তা পৌঁছে দেয়; কিন্তু তার নিজের ক্লান্তি, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের খবর এই সমাজের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। এ দেশে সাংবাদিকের জীবনও যেন সুকান্তের রানার কবিতায় বর্ণিত চিত্রের সমার্থক হয়ে উঠেছে। তিনি অন্যের কথা লিখেন, নিজের কথা থেকে যায় আড়ালে। তবে এ কথাও সত্যি, এ দেশে শুধু সাংবাদিক নন; কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষক, গবেষক, শিল্পী ও সমাজচিন্তক অর্থাৎ— বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে যারাই নিয়োজিত তাদের সবার বেলায়ও একই বাস্তবতা কমবেশি বিদ্যমান।
আমরা একজন লেখকের বই পড়ি। কবির কবিতা উদ্ধৃত করি। গবেষকের চিন্তা নিয়ে বিতর্ক করি। শিল্পীর সৃষ্টিতে আনন্দ পাই; কিন্তু তাদের আর্থসামাজিক নিরাপত্তার কথা কতটা ভাবি? এ প্রসঙ্গে দু’টি ঘটনার নজির দিতে চাই। প্রথম জন কবি ফররুখ আহমদ। বাংলা সাহিত্যে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকা সত্ত্বেও জীবনের শেষবেলায় তাকে দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত হতে হয়েছে। রাষ্ট্র তার রেডিওর চাকরিটি কেড়ে নেয়। সমাজে তিনি প্রান্তিক হয়ে পড়েন শুধু তার আদর্শবাদিতার কারণে। জীবন সায়াহ্নে অসুস্থতার সাথে লড়াই করে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুবরণ করতে হয় তাকে। তার ছেলে আহমদ আখতারও একজন কবি ও সাংবাদিক ছিলেন। সাহিত্য ও সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত থেকেও শেষজীবন কেটেছে অনটনে। তাকেও ফ্যাসিবাদী জমানায় বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার চাকরি হারাতে হয়। একই পরিবারের দুই প্রজন্মের তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। সৃজনশীল ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানের মূল্য আমরা আসলে কতটা দিই?
দ্বিতীয় যে উদাহরণটি আমরা দিতে চাই— তিনি এবনে গোলাম সামাদ। ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, গবেষক, লেখক, কলামিস্ট ও চিন্তাবিদ। বিজ্ঞান পড়ালেও ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়ে লিখেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে এ দেশে তার মতো ধীশক্তিসম্পন্ন দেশপ্রেমিক গণবুদ্ধিজীবী ছিলেন হাতেগোনা দু-একজন। জীবনের শেষপর্যায়ে তার চিকিৎসা ও দেখাশোনা নিয়ে যে অনিশ্চয়তার চিত্র পাওয়া যায়, তা রীতিমতো অস্বস্তিকর। তার মতো ব্যক্তিত্ব যদি জীবনের শেষ সময়ে আর্থসামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তাহলে বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রমের সামাজিক মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
সাংবাদিকতার স্বাধীনতা নিয়ে আমরা অনেক কথা বলি; কিন্তু সাংবাদিকের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার কথা কতটা বলি? একজন সাংবাদিক যদি জানেন চাকরি চলে গেলে সংসার চালানোর বিকল্প নেই। মাসের পর মাস বেতন না পেলেও তাকে কাজ করতে হয়। কিংবা অবসরের পর আর্থিক কোনো নিরাপত্তা নেই। তাহলে তার ওপর চাপ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও সন্তানের লেখাপড়ার খরচ জোগানোর চিন্তা যদি সারাক্ষণ তাড়া করে, তাহলে দুর্নীতি বা ক্ষমতার বিরুদ্ধে নির্ভীক সাংবাদিকতা করা কঠিন হয়ে পড়ে বৈকি।
সাংবাদিকের আর্থিক নিরাপত্তা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। এটি সাংবাদিকতার স্বাধীনতার পূর্বশর্ত। রাষ্ট্র শুধু ওয়েজ বোর্ড ঘোষণা করে দায়িত্ব শেষ মনে করে। তা বাস্তবায়নে কোনো দায়বোধ করে না। অথচ ওয়েজ বোর্ড অনুযায়ী সাংবাদিকদের বেতনভাতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
আসলে সাংবাদিক, লেখক, গবেষক ও শিল্পীদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোটা এ দেশে এখন বড় প্রয়োজন। এ জন্য গুরুতর অসুস্থ সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের জন্য জাতীয় জরুরি সহায়তা তহবিল গঠন করা যেতে পারে। সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জাতীয় স্বার্থেই অতি জরুরি। তবে এই তহবিলের সহায়তা পেতে আনুগত্য নয়, যোগ্যতা ও অবদান হবে প্রধান মানদণ্ড। এ দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্রের নয়; সাংবাদিক সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোরও। তবে বর্তমান বাস্তবতা হলো— বেকার সাংবাদিকদের পুনর্বাসন, ন্যায্য পাওনা আদায় এবং জ্যেষ্ঠ ও অসুস্থ সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়ানো সাংবাদিক সংগঠনগুলোর দায়িত্ব হলেও কতটুকু পালন করছে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।
তবে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন। বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় যারা আত্মনিয়োগ করেন তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করা রাষ্ট্র-সমাজের নৈতিক দায়িত্ব। সাংবাদিক, লেখক, শিল্পী, গবেষক কিংবা বুদ্ধিজীবীরা ‘অবৈষয়িক’। তাদের অর্থনৈতিক প্রয়োজন নেই, এমন ধারণা ভুল। তারাও মানুষ। তাদেরও পরিবারের ভরণ-পোষণ করতে হয়। রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে চিকিৎসকের কাছে যেতে হয়। তাই যারা সারা জীবন অন্যের জীবন অর্থবহ, সচেতন ও আলোকিত করার কাজে নিজেদের সময় ব্যয় করেন, তাদের জীবন যদি অনিশ্চয়তা-অবহেলায় ডুবে যায়, তাহলে তা শুধু ব্যক্তির ব্যর্থতা নয়। রাষ্ট্র ও সমাজেরও ব্যর্থতা।
একটি রাষ্ট্র-সমাজ তার সাংবাদিক, কবি, লেখক, গবেষক ও চিন্তাশীল মানুষকে জীবদ্দশায় কতটা মর্যাদা ও নিরাপত্তা দেয়, তাও সেই রাষ্ট্র-সমাজের উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। আমরা যারা সারা জীবন অন্যের কথা বলা মানুষের কথা শুনি, তাদের নিজেদের কথা কি শুনব না? যে সমাজ তার বিবেকের কণ্ঠস্বরকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে না, সে সমাজের উন্নতির গল্প যত বড় হোক না কেন, কোথাও না কোথাও সেই উন্নতি অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত
camirhamza@.yahoo.com