সমৃদ্ধ দেশ গড়ার মূল ভিত্তি হলো আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক নিরাপত্তা। শক্তিশালী আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা কিংবা বৈদেশিক বিনিয়োগ কোনোটিই নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। চব্বিশের বিপ্লব হয়েছিল সমৃদ্ধ বাংলাদেশের আশায়। বিপ্লবের পর গঠন হয় অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর নির্বাচনের মাধ্যমে এসেছে গণতান্ত্রিক সরকার। প্রত্যাশা ছিল সমৃদ্ধির দিকেই এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। তৈরি হবে নিরাপদ ও শান্তির পরিবেশ। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, সেটি স্বস্তিকর নয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ ছয় মাসের চেয়ে গণতান্ত্রিক সরকারের প্রথম ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলার অবনতি হয়েছে। হত্যার ঘটনা বেড়েছে ২৬ শতাংশ। এসব প্রাণহানি হয়েছে রাজনৈতিক কোন্দল, দখলদারি ও চাঁদাবাজির ঘটনায়। প্রতিদিন ঘটছে প্রায় ১০টি হত্যাকাণ্ড।
অপরাধ বিশ্লেষকদের তথ্য বলছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এটিকে সুযোগ হিসেবে নিচ্ছে সন্ত্রাসী ও অপরাধীরা। আবার রাজনৈতিক পরিচয়ে হাট-বাজার, বাসটার্মিনাল, টেন্ডার এবং ফুটপাথে চাঁদাবাজির প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। এর পরিণতিতে ঘটছে প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ড। আশঙ্কার বিষয় হলো- রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ সঙ্ঘাত মেটাতে ভাড়াটে সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করা হচ্ছে। তারা অবৈধ অস্ত্র নিয়ে অরাজকতা তৈরি করছে। যারা রাজনীতি করেন, তাদের উদ্দেশ্য হওয়ার কথা জনসেবা এবং নীতির চর্চা করা। দেশের জন্য কোনটি ভালো হবে, সে অনুযায়ী কাজ করা। কিন্তু আমাদের দেশের রাজনীতির সাধারণ চিত্র হচ্ছে, পদ-পদবির প্রতিযোগিতা। দল ক্ষমতায় থাকলে এলাকা দখল ও অর্থ-ভাগাভাগির প্রতিযোগিতা চলে। এমনকি নিজের দলের মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়াও স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনীতির এই চিত্র পাল্টে দেয়ার আশাতেই একটি বিপ্লব হয়ে গেছে। তারপরও কেন পরিবর্তন হচ্ছে না?
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে পুলিশ ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে পুলিশ সদর দফতর থেকে। টহলদারি, গোয়েন্দা নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহ বাড়ানো হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে অপরাধীর দলীয় পরিচয় বিবেচনা করা হচ্ছে না। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এসব ইতিবাচক অবস্থানের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এখন নানামুখী পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। ২০২৪ সালের উত্তাল সময়ে লুণ্ঠন হয়ে যাওয়া অনেক অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা যায়নি। অস্ত্রগুলো পেশাদার ও ভাড়াটে খুনিদের হাতে চলে গেছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখতে হবে। পুলিশকে বিশেষ অভিযান জোরদার করতে হবে। খুনিদের দ্রুততম সময়ে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
ক্ষমতাসীন ও বিরোধী- সব রাজনৈতিক দলকে তাদের নিজস্ব নেতাকর্মীদের বিশৃঙ্খলা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় যেন কোনোভাবেই অপরাধের লাইসেন্স বা ঢাল না হয়, এ বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করা দরকার।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের প্রধান সাংবিধানিক দায়িত্ব। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পুরোপুরি সক্রিয়, নিরপেক্ষ ও কঠোর ভূমিকায় দেখতে চায় মানুষ। আমরা আশা করি, পরিস্থিতি উন্নত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে সরকার।