দেশে সড়ক দুর্ঘটনা নিত্যদিনের ঘটনা। প্রতিদিন সড়কে প্রাণ ঝরছে মানুষের। পঙ্গুত্ব বরণ করছেন অনেকেই। আহতদের চিকিৎসায় নিঃস্ব হচ্ছে পরিবার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় বছরে প্রাণহানির সংখ্যা ২০ হাজার ৭৩৬ থেকে ২১ হাজার ৩১৬ জনের মধ্যে। এতে বার্ষিক অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ জিডিপির ১ দশমিক ৫ থেকে ৩ শতাংশ পর্যন্ত। এসব দুর্ঘটনা কেবল ‘দুর্ভাগ্য’ বা ‘চালকের ভুল’ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আমাদের সড়কে যে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী অব্যবস্থাপনার সৃষ্টি হয়েছে, দুর্ঘটনা এর স্বাভাবিক পরিণতি। সড়ক দুর্ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি কাঠামোগত দুর্বলতার চূড়ান্ত প্রকাশ। নয়া দিগন্তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমন চিত্র ফুটে উঠেছে।

টিআইবি ও বিআইজিডির তথ্যমতে, ঢাকার ফুটপাথ থেকে বার্ষিক প্রায় এক হাজার ৮২৫ কোটি টাকার অবৈধ ভাড়া বা চাঁদাবাজি হয়। পরিণামে ফুটপাথের ৪০ শতাংশ দোকান, হকার ও নির্মাণসামগ্রীর দখলে থাকে। এতে সড়কে নামতে বাধ্য হন পথচারীরা। পরিণতিতে দ্রুতগতির যানবাহনের চাপায় প্রাণ হারান অনেকে। বিআরটিএর তথ্যমতে, দেশে প্রায় ১৮ লাখ ৭৭ হাজার চালকের বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই।

দুর্ঘটনার পেছনে চালকের বেপরোয়া গতি, ট্রাফিক আইন অমান্য, ফিটনেসবিহীন যানবাহন কিংবা অদক্ষ চালকের দায় অবশ্যই আছে। কিন্তু সমস্যার গভীরে গেলে দেখা যায়, এর সাথে যুক্ত পুরো পরিবহনব্যবস্থার একাধিক স্তরের ব্যর্থতা। ট্রাফিক সিগন্যাল অকার্যকর, ফুটপাথ দখল, অবৈধ পার্কিং, পাল্টাপাল্টি করে বাস চলাচল, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক নকশা এবং আইন প্রয়োগে শিথিলতা, সব মিলিয়ে সারা দেশের সড়কগুলো পরিণত হয়েছে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ মৃত্যুফাঁদে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়- আইন আছে কিন্তু প্রয়োগ নেই। লাইসেন্সহীন চালক ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের অবাধ চলাচল এর প্রমাণ। বিআরটিএর জনবল সঙ্কট, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য এবং সনদ প্রদানের অনিয়ম পরিস্থিতি আরো বিপজ্জনক করে তুলেছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে পরিবহন খাতে রাজনৈতিক প্রভাব। চাঁদাবাজি, অবৈধ লেনদেন এবং মালিক-শ্রমিক সংগঠনের প্রভাব আইন প্রয়োগে বাধা হয়ে দাঁড়ানোয় সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো যাচ্ছে না। দুর্ঘটনার আরেকটি বড় কারণ চালকদের অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা ও অসুস্থ প্রতিযোগিতা। তাই শুধু চালককে শাস্তি দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না। মালিক, পরিবহন কোম্পানি, সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।

নিরাপদ ফুটপাথ, কার্যকর জেব্রা ক্রসিং, পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা এবং যথাযথ গতি নিয়ন্ত্রণ ছাড়া আধুনিক সড়কব্যবস্থা সম্ভব নয়। নিবন্ধনহীন যানবাহন, অবৈধ পার্কিং, ফুটপাথ দখল ও বেপরোয়া চালনা বন্ধে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীলতা এবং প্রশাসনিক দৃঢ়তার বিকল্প নেই।

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে একটি সমন্বিত জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। সেই সাথে প্রতিটি যানবাহন ও চালকের নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি, লাইসেন্স ও ফিটনেস পরীক্ষায় দুর্নীতি বন্ধ, চালকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কর্মঘণ্টা নিয়ন্ত্রণ, ফুটপাথ দখলমুক্ত করা এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় প্রকৌশলগত ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়া পরিবহন খাতে রাজনৈতিক প্রভাবের অবসানে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। তবেই সড়কে প্রাণহানি কমিয়ে আনা সম্ভব।