সভ্যতার ইতিহাসে জ্ঞান কি কেবল তথ্যের সমষ্টি? না। জ্ঞান হলো মানুষের অস্তিত্ব, নৈতিকতা ও সত্যানুসন্ধানের মৌলিক ভিত্তি। জ্ঞানতত্ত্বের মরকজি সওয়াল হলো- কোন জ্ঞান সত্য? সত্য যাচাই করার মানদণ্ড কী? সমকালীন মুসলিম সমাজে এই সওয়াল কেন্দ্র থেকে কিনারে চলে গেছে ক্রমেই। এখানে জ্ঞানের বৈধতা নির্ধারিত হচ্ছে বহিরাগত প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতার কাঠামোর মাধ্যমে। অথচ মৌলিক সওয়াল হলো- জ্ঞান কিভাবে হাসিল হবে, কোন উৎসকে দালিলিক মানা হবে এবং কোন নৈতিক ভিত্তির ওপর জ্ঞানের মূল্যায়ন হবে।

আজ জ্ঞানের যাচাই হচ্ছে বাজারের চাহিদা, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি, রাষ্ট্রের নীতিমালা এবং প্রযুক্তির কার্যকারিতার আলোকে। বাজার নির্ধারণ করছে- কোন জ্ঞান ফায়দার। বিশ্ববিদ্যালয় নির্ধারণ করছে- কোন জ্ঞানকে কবুল করা হবে। রাষ্ট্র নির্ধারণ করছে- কোন জ্ঞান রাজনৈতিকভাবে উপযোগী। প্রযুক্তি নির্ধারণ করছে- কোন জ্ঞানের দ্রুত উৎপাদন ও প্রচার করা সম্ভব। ফলে জ্ঞানের মূল্যায়ন ক্রমেই হয়ে উঠছে উপযোগবাদী, প্রাতিষ্ঠানিক ও বস্তুবাদী।

কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় একটি মৌলিক মাসয়ালা হারিয়ে যাচ্ছে। সেটি হলো- সত্যের উৎস কোথায়? ইসলামী জ্ঞানতত্ত্বে সত্যের চূড়ান্ত উৎস আল্লাহ, যিনি ওহির মাধ্যমে মানবজাতিকে হিদায়াত দান করেছেন। মানুষের বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা এবং ইন্দ্রিয় জ্ঞানার্জনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলেও এগুলো চূড়ান্ত সত্যের উৎস নয়। ওহির আলোকে পরিচালিত হলে তবেই এগুলো সঠিক পথনির্দেশ করতে সক্ষম। যখন জ্ঞান তার অধিবিদ্যাগত ভিত্তি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তখন সত্য আপেক্ষিক হয়ে পড়ে এবং জ্ঞান কেবল ক্ষমতা, দক্ষতা বা অর্থনৈতিক উৎপাদনের উপকরণে পরিণত হয়।

এই বিচ্ছিন্নতার ফলেই আজ বিপুল তথ্য উৎপাদিত হচ্ছে, কিন্তু হিকমাহর গরহাজিরি বাড়ছে; অর্থাৎ যথাস্থানে জ্ঞান প্রয়োগের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক প্রজ্ঞা গায়েব হচ্ছে। ডিজিটাল যুগে তথ্যের প্রবাহ অভূতপূর্ব। কিন্তু তথ্যের আধিক্য হিকমার নিশ্চয়তা দেয় না। তথ্যের বিস্ফোরণ অনেক সময় মানুষের বিচারবোধকে কমজোর বানায়। কারণ তথ্যকে অর্থপূর্ণ জ্ঞানে এবং জ্ঞানকে প্রজ্ঞায় রূপান্তরের জন্য প্রয়োজন আখলাকি হেদায়েত, তাজকিয়া এবং হকের প্রতি অঙ্গীকার।

ইসলামী আকলের ঐতিহ্যে ‘ইলম’ ও ‘হিকমাহ’র মধ্যে গভীর রিশতা বিদ্যমান। প্রকৃত জ্ঞান সেটিই, যা মানুষকে আল্লাহর পরিচয়, নৈতিক দায়িত্ব এবং মানবকল্যাণের দিকে রাহবরি করে। অতএব, জ্ঞানতাত্ত্বিক সঙ্কটের প্রকৃত সমাধান সঙ্কটের ডালপালায় নয়। কেবল আরো তথ্য উৎপাদন করলেই সমাধান এসে যাবে, এমন ভাবা গলত। সমাধান নিহিত জ্ঞানের উৎস, উদ্দেশ্য এবং নৈতিক ভিত্তি পুনর্বিবেচনার মধ্যে।

ইলমিয়তে সঙ্কটের কারণ অনেক। এর মধ্যে আছে- ক. জ্ঞান ও নৈতিকতার বিচ্ছিন্নতা। আধুনিক জ্ঞানচর্চার বড় মুসিবত হলো- জ্ঞানকে মূল্যবোধ থেকে আলাদা করে দেখা। জ্ঞানের প্রশ্নে আসল গুরুত্বের বিষয় যে সওয়ালগুলো, তা হলো- কোন জ্ঞান কতটা কার্যকর? কতটা লাভজনক? কতটা প্রযুক্তিগতভাবে সফল? কিন্তু সেই জ্ঞান মানবতার জন্য কতটা কল্যাণকর, তা অনেক সময় আড়ালে থেকে যাচ্ছে। ফলে এমন জ্ঞানও তৈরি হচ্ছে, যা শক্তিকে আরো ভয়ানক বানাচ্ছে; কিন্তু জিম্মাদারির বোধ বাড়াচ্ছে না।

খ. ওহি, আকল এবং তাজরেবার (অভিজ্ঞতা) মধ্যে ভারসাম্যের অভাব। ইসলামী জ্ঞানতত্ত্বে ওহি হলো চূড়ান্ত হেদায়েত, আর আকল হলো সেই নির্দেশনা বোঝার ও বাস্তবতায় প্রয়োগের ওসিলা। কিন্তু হালে এক দিকে দেখা যায় এমন খাসলত, যেখানে কেবল বস্তুগত পর্যবেক্ষণকেই জ্ঞানের একমাত্র মানদণ্ড ধরা হয়; অন্য দিকে আছে এমন প্রবণতা, যেখানে যুক্তি ও বাস্তব অভিজ্ঞতাকে গৌণ ভাবা হয়। উভয় চরমপন্থাই ইলমিয়তের ভারসাম্য বরবাদ করে।

গ. জ্ঞান উৎপাদনের প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইসলামী বিশ্বদৃষ্টির কমজোর হাজিরি। মুসলিম সমাজে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো জ্ঞান গ্রহণ করছে; কিন্তু জ্ঞানের দর্শন, উদ্দেশ্য এবং নৈতিক ভিত্তি নিয়ে পর্যাপ্ত জিকির ও ফিকির হচ্ছে না। ফলে শিক্ষিত ব্যক্তি তৈরি হচ্ছে; কিন্তু জ্ঞানকে হিকমাহর সাথে পরিচালনা করার তাকত ও আদত তৈরি হচ্ছে না।

ঘ. তথ্য ও জ্ঞানের ফারাক ভুলে যাওয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে সবাই তথ্যের নাগালে রয়েছে। কিন্তু তথ্য যাচাই, বিশ্লেষণ, প্রেক্ষাপট বোঝা এবং হক-বাতিল আলাদা করার সাবালকত্ব কমে গেলে জ্ঞানের চেয়ে বিভ্রান্তি বাড়ে বেশি। ইলমিয়তের সঙ্কটের একটি বড় দিক হলো- তথ্যের বিস্তার ঘটছে আকসার। কিন্তু গভীর চিন্তা, ধ্যান, গবেষণা ও রূহানিয়তের চর্চা দুর্বল হচ্ছে।

চ. ইলমের আদব ও তাওয়াজুর সঙ্কট। ইসলামী ঐতিহ্যে ইলম কেবল জানার বিষয় নয়; এটি একই সাথে শেখার আদব, ওস্তাদের হক, মতভেদের শিষ্টাচার ও সত্যের সামনে আত্মসমর্পণের নাম। কিন্তু আজ অনেক ক্ষেত্রে জ্ঞান অহঙ্কার, আত্মপ্রদর্শন ও তর্কে বিজয়ী হওয়ার ওসিলায় পরিণত হচ্ছে। ফলে ইখলাস কমে যায়, আর হাকিকত তলবের বদলে নিজের অবস্থান প্রমাণের প্রবণতা বাড়ে। যে ইলম বিনয় সৃষ্টি করে না, তা ধীরে ধীরে হিকমাহ থেকে মাহরুম হয়ে যায়।

ছ. গভীর অধ্যয়ন ও তাফাক্কুরের দুর্বলতা। দ্রুত তথ্য গ্রহণের সংস্কৃতি মানুষের ধৈর্যশীল পাঠ, দীর্ঘ গবেষণা এবং গভীর চিন্তার আদতকে কমজোর বানাচ্ছে। অনেক সময় শিরোনাম, সারসংক্ষেপ কিংবা ছোট ছোট বক্তব্যই পূর্ণ জ্ঞানের বিকল্প হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অথচ ইসলামী ইলমিয়তের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো- তাদাব্বুর, তাফাক্কুর ও তাহকিক। এই চর্চা দুর্বল হলে তথ্য বাড়ে; কিন্তু অন্তর্দৃষ্টি বাড়ে না।

জ. জ্ঞানগত স্বাধীনতার গরহাজিরি। অনেক ক্ষেত্রে মুসলিম সমাজ নিজস্ব জ্ঞানতাত্ত্বিক মানদণ্ড থেকে মাসয়ালা বিচার না করে পশ্চিমা ফিকরি কাঠামোর নির্বিচার এত্তেবা গ্রহণ করছে। আবার কোথাও পূর্ববর্তী ফিকির বা মতের এমন তাকলিদ দেখা যায়, যেখানে নতুন বাস্তবতার ইজতিহাদি মূল্যায়নের সুযোগ সঙ্কুুচিত হয়ে পড়ে। উভয় প্রবণতাই ইলমিয়তের প্রাণশক্তিকে দুর্বল করে এবং সৃজনশীল জ্ঞান উৎপাদনের পথ সঙ্কীর্ণ করে।

ঝ. ইলমের মাকসাদে পরিবর্তন। ইসলামী দৃষ্টিতে ইলমের মাকসাদ হলো আল্লাহর মারিফাত, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা ও মানবকল্যাণ। কিন্তু যখন জ্ঞানের গায়াত চাকরি, প্রতিযোগিতা, ক্ষমতা কিংবা সামাজিক প্রতিপত্তিতে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তখন ইলম তার রূহ হারাতে শুরু করে। বাহ্যিক সাফল্য বৃদ্ধি পেলেও হিকমাহ, আখলাক ও আল্লাহ-সচেতনতা দুর্বল হয়ে পড়ে।

ইলমিয়তের সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্য প্রথম জরুরত হলো- জ্ঞানের উৎস ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে নতুন করে চিন্তা করা। জ্ঞানকে কেবল পেশা, অর্থনীতি বা ক্ষমতার ওসিলা হিসেবে না দেখে আল্লাহর সৃষ্টি, মানবজীবনের জিম্মাদারি এবং কল্যাণের সাথে সম্পর্কিত আমানত হিসেবে দেখতে হবে।

দ্বিতীয় জরুরত হলো- শিক্ষাব্যবস্থায় ইলম ও হিকমাহর সমন্বয়। এমন শিক্ষা দরকার, যেখানে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, মানবিক জ্ঞান ও ইসলামী নৈতিকতা পরস্পরের সাথে সংযুক্ত থাকবে। জ্ঞান হাসিলের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সত্যের প্রতি ভালোবাসা, নৈতিক সাহস, দায়িত্ববোধ এবং মানুষের প্রতি মমত্ববোধ তৈরি করতে হবে।

তৃতীয় জরুরত হলো- মুসলিম সমাজে মৌলিক গবেষণা ও চিন্তার সংস্কৃতিকে মজবুত করা। অতীতের জ্ঞান-ঐতিহ্যকে শুধু স্মরণ ও হিফজ করাই যথেষ্ট নয়; বরং বর্তমান বাস্তবতায় তাকে নতুনভাবে বিশ্লেষণ ও পুনরোৎপাদন করতে হবে। যথাক্ষেত্রে যথাজনদের ইজতিহাদ, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং সৃজনশীল গবেষণার পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।

চতুর্থ জরুরত হলো- আলেম, গবেষক ও আধুনিক জ্ঞানচর্চাকারীদের মধ্যে সংলাপ বাড়ানো। দ্বীনি জ্ঞান ও দুনিয়ার জ্ঞানের নামে কৃত্রিম বিভাজন দূর করে এমন সমন্বিত জ্ঞানচর্চা গড়ে তুলতে হবে, যা মানুষের বাস্তব সমস্যার সমাধানে সক্ষম এবং একই সাথে সত্য ও নৈতিকতার ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত।

পঞ্চম জরুরত হলো- ব্যক্তিগত পর্যায়ে ইলম হাসিলের সাথে তাজকিয়া ও আমলের সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করতে হবে। ইসলামী ঐতিহ্যে জ্ঞান শুধু মস্তিষ্কের বিষয় নয়; এটি চরিত্র ও আচরণের বিষয়ও। যে জ্ঞান মানুষকে বিনয়ী, ন্যায়পরায়ণ এবং আল্লাহ-সচেতন করে না, সেই জ্ঞান তার পূর্ণ মাকসাদ হাসিল করতে পারে না।

ষষ্ঠ জরুরত- ইলমকে আবার আমানত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। জ্ঞান ব্যক্তিগত উন্নতি বা সামাজিক মর্যাদার হাতিয়ার নয় কেবল; জ্ঞান আল্লাহর দেয়া আমানত। অতএব, জ্ঞান উৎপাদন, প্রচার ও প্রয়োগের প্রতিটি স্তরে সত্যবাদিতা, ইনসাফ ও জবাবদিহির নীতি কায়েম করতে হবে। যে ইলম মানুষের ওপর জুলুম, প্রতারণা কিংবা বিভ্রান্তি বাড়ায়, সে তার প্রকৃত মাকসাদ থেকে বিচ্যুত হয়।

ইলমিয়তের সঙ্কট মূলত সভ্যতাগত সঙ্কট। কারণ কোনো সভ্যতা তার জ্ঞানতত্ত্ব, সত্যবোধ ও নৈতিক ভিত্তির ওপরই কায়েম হয়। যখন জ্ঞানের উৎস, উদ্দেশ্য এবং মানদণ্ড সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়, তখন তার প্রভাব রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি স্তরে দূষণ তৈরি করে। তাই ইলমিয়তের সংস্কার কেবল পাঠ্যক্রমের সংস্কার নয়; বরং এটি এক পূর্ণাঙ্গ সভ্যতাগত পুনর্জাগরণের ভিত্তি নির্মাণের প্রকল্প।

অতএব, এ সঙ্কটের সুরাহায় নতুন কর্মসূচি, প্রতিষ্ঠান নির্মাণ বা আরো বেশি তথ্য সংগ্রহ দরকার। তবে এটিই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক ইনকিলাব, যেখানে ওহি, আকল, অভিজ্ঞতা এবং নৈতিকতার মধ্যে ভারসাম্য কায়েম হবে। যখন সত্যের সুর ও সার পুনরায় জ্ঞানের কেন্দ্রে ফিরে আসবে, তখনই তথ্য প্রজ্ঞায় রূপান্তরিত হবে এবং জ্ঞান মানবসভ্যতার প্রকৃত কল্যাণে ভূমিকা রাখার লায়েক হবে।

লেখক : কবি, গবেষক

72.alhafij@gmail.com