বাংলাদেশে অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা তলানিতে পৌঁছেছে। নির্বাচন কমিশন, নিরাপত্তা বিভাগের মতো প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের আস্থা সামান্যই। কিন্তু যে সরকারি দফতরের ওপর আস্থা একেবারেই তলানিতে সেটি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএস। প্রতিষ্ঠানটির ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ সবসময়ই ছিল। কিন্তু দীর্ঘ ১৫ বছরের স্বৈরশাসনকালে তা মাত্রা ছাড়ায়। অবস্থা এমন জায়গায় পৌঁছে যে, কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রকাশের আগে খোদ ব্যুরোর কর্মকর্তারা সরকারের সবুজ সঙ্কেতের অপেক্ষায় থাকতেন। এটি কোনো জল্পনা নয়, গণমাধ্যমেও এমন খবর প্রকাশ পেয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে দেখানো, আদমশুমারিতে প্রকৃত তথ্য চেপে রাখা, উন্নয়নের সূচকগুলোর ক্রমাবনতির তথ্য গায়েব করে দেয়া- এমন সব অভিযোগ ওঠে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। অথচ তথ্যের যথার্থতা ছাড়া জাতীয় অগ্রগতির চিন্তা করা বাতুলতামাত্র।

বলা হয়, তথ্য-উপাত্তই হচ্ছে শক্তি। সঠিক উপাত্ত ছাড়া বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রণয়ন ও ভবিষ্যতের পথরেখা তৈরি অসম্ভব। ভুল বা ত্রুটিপূর্ণ উপাত্ত ভুল সিদ্ধান্ত, অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং গবেষণার গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট করে। তাই পরিসংখ্যানের উপাত্ত বা তথ্যের যথার্থতা নিশ্চিত করা জরুরি। মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, দারিদ্র্য, আয়-বৈষম্য, কৃষি উৎপাদন, শিল্প উৎপাদন, শ্রমবাজার, জনসংখ্যা, স্বাস্থ্য, শিক্ষাÑ প্রতিটি ক্ষেত্রেই সময়োপযোগী, নির্ভুল তথ্য দরকার। কারণ ভুল পরিসংখ্যানের ওপর সঠিক নীতি তৈরি করা অসম্ভব।

দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কত, মূল্যস্ফীতি কত, বেকারের হার কত, কত পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে- এসব তথ্য জাতীয় বাজেট, সামাজিক নিরাপত্তা, সুদহার, মজুরি, বিনিয়োগ, করনীতি এবং উন্নয়ন প্রকল্প, সবকিছুর সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। উন্নয়ন কৌশল গড়ে তুলতে, উন্নয়ন অর্জন এবং ফলাফল মূল্যায়নের জন্যও সঠিক উপাত্ত ও পরিসংখ্যান প্রয়োজন। পরিসংখ্যান যদি ভুল হয়, তাহলে উন্নয়ন মুখ থুবড়ে পড়বে। সমাজে বস্তুনিষ্ঠ উন্নয়ন বিতর্কের জন্য ও আলোচনার জন্য সঠিক তথ্য-উপাত্ত ও পরিসংখ্যান প্রয়োজনীয় পূর্বশর্ত। বিবিএস এতদিন সে শর্ত পূরণে অসফল ছিল।

সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি আস্থার সঙ্কট কাটিয়ে ওঠার উদ্যোগ নিয়েছে। নয়া দিগন্তের খবরে বলা হয়েছে, সরকারি পরিসংখ্যান তৈরির প্রচলিত পদ্ধতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে। এতদিন বড় ধরনের জাতীয় হিসাব সংশোধনের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ ও ব্যবহারকারীদের অংশগ্রহণ সীমিত ছিল। এবার সেই প্রক্রিয়ায় বাইরের বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এই উদ্যোগ জরুরি। সে জন্যই অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে বিবিএস নিয়ে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ টাস্কফোর্স গঠন করে। টাস্কফোর্সের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ছিল, সরকারি পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা ফেরাতে কেবল নতুন প্রযুক্তি যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন স্বাধীনতা, মান, স্বচ্ছতা, প্রবেশাধিকার ও জবাবদিহির ব্যবস্থা। পরে বিবিএসকে আধুনিক ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের জন্য ব্যাপক কাঠামোগত সংস্কারের সুপারিশ করে টাস্কফোর্স।

বিবিএসের বর্তমান উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও শুধু বিশেষজ্ঞদের মতামত নিলেই পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জিত হবে না। প্রয়োজন তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি ও প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ও পেশাগত স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করতে হবে, যাতে সরকার পাল্টালেই পরিসংখ্যানের পদ্ধতি ও প্রতিষ্ঠানগত মানদণ্ড পাল্টে না যায়।

সরকারি পরিসংখ্যান হতে হবে রাষ্ট্রের নির্ভুল, অবিতর্কিত ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্যভাণ্ডার।