দেশে ক’দিন পরপরই গ্যাস আর বিদ্যুৎ নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। কোথাও গ্যাসের চাপ কমে যায়, কোথাও লোডশেডিং, কারখানায় উৎপাদন বন্ধ, সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন। কারণ হিসেবে বলা হয়, এলএনজি আমদানি কমেছে, টার্মিনালে যান্ত্রিক গোলযোগ হয়েছে বা মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে। কথাগুলো মিথ্যা নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি টার্মিনাল বিকল হলেই কেন পুরো দেশের জ্বালানি সরবরাহ ধসে পড়ে? সমস্যাটা কি শুধু ঘাটতির, নাকি পেছনে গভীর কোনো কাঠামোগত দুর্বলতা আছে?

সাম্প্রতিক সঙ্কট আসলে কী
এ বছর জুলাই মাসে মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুনে বড় ক্ষতি হয়। এতে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। দেশে স্বাভাবিক গ্যাসের চাহিদা দৈনিক প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু সরবরাহ আগেই কম ছিল। এর সাথে কাতার থেকে আমদানি কমে যাওয়ায় ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাতের কারণে সঙ্কট আরো তীব্র হয়। এই ঘটনা দেখিয়েছে- দেশের জ্বালানি ব্যবস্থা হাতেগোনা কয়েকটি উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। একটি জায়গায় সমস্যা হলেই পুরো দেশ কাঁপতে শুরু করে।

সরকারকেই কেন সব বিদ্যুৎ কিনতে হবে
বাংলাদেশে বেসরকারি কোম্পানি বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেও তা সরাসরি কারখানা বা বাসাবাড়িতে বিক্রি করতে পারে না। প্রথমে বিপিডিবি কিনে নেয়, পরে বিতরণ কোম্পানির মাধ্যমে গ্রাহকের কাছে যায়। অর্থাৎ, সরকারই প্রায় সব বিদ্যুতের ক্রেতা।

বিদ্যুৎ জরুরি সেবা। তাই সরকারের ভূমিকা অবশ্যই থাকবে। কিন্তু সেটি হওয়া উচিত নীতিনির্ধারণ, জাতীয় গ্রিডের কাঠামো গড়ে তোলা ও গ্রাহক সুরক্ষা। সরকার যখন একমাত্র বড় ক্রেতা, তখন কার সাথে কী চুক্তি হবে, কে কত দাম পাবে এসব সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বজনপ্রীতির সুযোগ বাড়ে।

অন্য দেশ কিভাবে করে
অনেক দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী, সরবরাহকারী, গ্রিড অপারেটর ও নিয়ন্ত্রক- এই চার ভূমিকা আলাদা। সরকারকে বাধ্যতামূলক ব্যবসায়ী হয়ে থাকতে হয় না। ফ্রান্সে গ্রাহক নিজের বিদ্যুৎ সরবরাহকারী বেছে নিতে পারেন।

২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের ৭৭ শতাংশ বাজারভিত্তিক দামে কেনাবেচা হচ্ছিল। তবু গ্রিড ব্যবহারের খরচ ও গ্রাহক সুরক্ষা নিয়ন্ত্রিত। যুক্তরাজ্যেও বহু কোম্পানি প্রতিযোগিতা করে; কিন্তু সাধারণ গ্রাহকের জন্য প্রাইস ক্যাপ রয়েছে। অর্থাৎ, প্রতিযোগিতা মানেই লাগামছাড়া দাম নয়। ভারতে ২০০৩ সালের আইনের মাধ্যমে বড় শিল্প-কারখানাকে স্থানীয় বিতরণ কোম্পানির বাইরে অন্য উৎপাদনকারীর কাছ থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ কেনার সুযোগ দেয়া হয়েছে; তারা শুধু গ্রিড ব্যবহারের মাশুল দেয়। বাংলাদেশের শিল্প খাতেও এটি প্রাসঙ্গিক।

কানাডা দেখায়, একটি মাত্র মডেল নেই। আলবার্টার বাজার প্রতিযোগিতামূলক। স্বাধীন সংস্থা পাইকারি বাজার চালায়, আলাদা নিয়ন্ত্রক সংস্থা গ্রিড ও দাম দেখাশোনা করে। আর অন্য সংস্থা বাজারে কারসাজি হচ্ছে কি না নজর রাখে। অন্য দিকে কুইবেকে রাষ্ট্রায়ত্ত হাইড্রো-কুইবেক উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণের প্রধান শক্তি। তবু দাম বাড়াতে স্বাধীন নিয়ন্ত্রক রেজি দ্য লেনার্জির অনুমতি লাগে এবং জনশুনানি হয়। নতুন উৎপাদনের জন্য প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রও হয়। অর্থাৎ, সরকারি মালিকানাও কার্যকর হতে পারে, যদি দাম নির্ধারণ স্বচ্ছ ও প্রভাবমুক্ত থাকে।

তবে ২০২৫ সালে কুইবেকের নতুন আইন সরকার ও হাইড্রো-কুইবেকের নির্বাহী প্রধানকে দাম নির্ধারণে বেশি প্রভাবের সুযোগ দেয় এবং নিয়ন্ত্রকের স্বাধীনতা খর্ব করে, যা সমালোচিত হয়েছে। বাংলাদেশের বিইআরসির ক্ষমতা খর্ব হওয়ার অভিজ্ঞতার সাথে এর মিল আছে। শিক্ষা একটাই, নিয়ন্ত্রকের স্বাধীনতা একবার প্রতিষ্ঠা করলেই শেষ নয়; তা রক্ষা করতে হয়।

বাংলাদেশও এই পথে হাঁটতে শুরু করেছে
এটি শুধু তাত্ত্বিক প্রস্তাব নয়। ২০২৫ সালে জ্বালানি উপদেষ্টা মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসির কথা বলেন, যেখানে বেসরকারি উৎপাদনকারী সরাসরি নিজের পছন্দের গ্রাহকের সাথে দরদাম করে বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারবে এবং জাতীয় গ্রিড ব্যবহারের জন্য মাশুল দেবে। সরকার সীমিত অংশ কিনবে, বাকিটা বাজারে যাবে।

ধরা যাক, কুমিল্লার একটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানার সাথে ১০-১৫ বছরের চুক্তি করল। বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিড দিয়েই যাবে; গ্রিড ব্যবহারের মাশুল কেন্দ্র দেবে। বিপিডিবির আগে কিনে পরে বিক্রি করতে হবে না। এতে সরকারের আর্থিক দায়ও কমবে। এই ব্যবস্থায় বিইআরসিকে আরো শক্তিশালী ও স্বাধীন করতে হবে, যাতে তারা ন্যায্য গ্রিড মাশুল নির্ধারণ এবং সাধারণ ও নিম্ন আয়ের গ্রাহকের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে।

‘কুইক রেন্টাল’ আমাদের যা শিখিয়েছে
২০১০ সালের বিদ্যুৎ সঙ্কটে জরুরি ভিত্তিতে কুইক রেন্টাল আনা হয়। সাময়িকভাবে এটি অস্বাভাবিক ছিল না। সমস্যা হলো, জরুরি ব্যবস্থা পরে দীর্ঘস্থায়ী নিয়মে পরিণত হয়, খোলামেলা প্রতিযোগিতা ছাড়াই চুক্তি করা হয় এবং তা বছরের পর বছর চলতে থাকে। এখানেই ক্যাপাসিটি চার্জের প্রশ্ন। একটি কেন্দ্র প্রস্তুত রাখতে কিছু নির্দিষ্ট খরচ থাকে, তাই উৎপাদন না হলেও কিছু অর্থ দেয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যেখানে দরকার একটি বাড়ির, সেখানে তিনটি বাড়ি ভাড়া নিলে সেটি আসলে পরিকল্পনার ব্যর্থতা।

সরকারের পর্যালোচনা কমিটি ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে জানায়, দেশে প্রায় সাত হাজার ৭০০ থেকে সাড়ে ৯ হাজার মেগাওয়াট বাড়তি বা অলস সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। বছরে প্রায় ৯ থেকে ১৫ কোটি ডলার শুধু ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। গত দুই দশকে বিদ্যুৎকেন্দ্রে মোট অর্থপ্রদান বেড়েছে ১১ গুণ, আর ক্যাপাসিটি চার্জ প্রায় ২০ গুণ। অনেক চুক্তিতে উৎপাদন না হলেও অর্থপ্রদান, সরকারি নিশ্চয়তা এবং বেসরকারি বিনিয়োগকারীর ঝুঁকি রাষ্ট্রের ঘাড়ে চাপানো ছিল। এ ক্ষেত্রে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ কার ঘাড়ে বর্তাবে তা আদালতের বিষয়। কিন্তু চুক্তি-কাঠামো দেশের স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে, এটি স্পষ্ট।

বিইআরসি কেন দুর্বল ছিল, এখন কী হচ্ছে
বিইআরসি ২০০৩ সালে স্বাধীন সংস্থা হিসেবে তৈরি হলেও এর ক্ষমতা বারবার খর্ব হয়েছে। ২০১০ সালের বিশেষ আইনে সরকার প্রতিযোগিতাবিহীন চুক্তি করার ক্ষমতা পায়। পরে আইন সংশোধন করে জনশুনানি ছাড়াই বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাম বাড়ানোর ক্ষমতাও সরকার নিজের হাতে নেয়। ২০২৪ সালের আগস্টে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার সেই বিশেষ আইন ও সংশোধনী স্থগিত করে এবং জনশুনানির মাধ্যমে দাম নির্ধারণের ক্ষমতা বিইআরসিকে ফিরিয়ে দেয়। বিএনপির নতুন সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী হয়েছেন ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। সরকার ২০২৬-২৭ বাজেটে ক্যাপাসিটি চার্জ ও বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি পর্যালোচনার ঘোষণা দিয়েছে। বিইআরসি বিপিডিবির অধীন উৎপাদন কোম্পানির অনুমোদিত রিটার্ন ১২ শতাংশ থেকে ৬ শতাংশে নামিয়েছে। পাঁচ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ এবং বঙ্গোপসাগরে নতুন অফশোর বিডিং রাউন্ডের পরিকল্পনাও আছে। এগুলো ইতিবাচক। কিন্তু একচেটিয়া ক্রেতা-কাঠামো এখনো অক্ষত। ক্যাপাসিটি চার্জ কমানো বা রিটার্নের হার সংশোধন জরুরি। কিন্তু এগুলো উপসর্গ। বিপিডিবিকে একচেটিয়া ক্রেতার ভূমিকা থেকে সরানো, গ্রিড উন্মুক্ত করা এবং বিইআরসিকে আইনগতভাবে সুরক্ষিত স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে গড়ে তোলাই হবে পরবর্তী কাঠামোগত ধাপ।

সামনে করণীয়
সঙ্কটের সমাধান শুধু আরো এলএনজি বা আরো বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়। দরকার পুরো কাঠামোর পরিবর্তন।

১. বিপিডিবিকে একচেটিয়া ক্রেতার ভূমিকা থেকে সরিয়ে বড় শিল্পকে সরাসরি উৎপাদনকারীর সাথে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির সুযোগ দিতে হবে।

২. জাতীয় গ্রিড উন্মুক্ত ও নিরপেক্ষ মাধ্যম করতে হবে; যাতে সবাই একই নিয়মে মাশুল দিয়ে ব্যবহার করতে পারে।

৩. বিইআরসিকে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রশাসনিক সংস্থার পরিবর্তে আইন দ্বারা সুরক্ষিত স্বাধীন নিয়ন্ত্রক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। মন্ত্রণালয় নীতি নির্ধারণ করবে; বিইআরসি মূল্য, লাইসেন্স, গ্রিড মাশুল, বাজার প্রতিযোগিতা ও গ্রাহক-স্বার্থ তদারক করবে।

৪. বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের নতুন চুক্তি শুধু খোলামেলা প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রে দিতে হবে।

৫. সব বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি, মূল্য হিসাব ও ক্যাপাসিটি-পেমেন্টের তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।

৬. বেসরকারি বিনিয়োগকারীকে ঢালাও সরকারি নিশ্চয়তা দেয়া বন্ধ করতে হবে।

৭. দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়িয়ে একাধিক উৎস, টার্মিনাল ও জ্বালানি মজুদ তৈরি করতে হবে।

৮. শিল্প খাতকে ধীরে ধীরে নিজস্ব গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎ থেকে নির্ভরযোগ্য গ্রিড-বিদ্যুৎ, সৌরশক্তি ও ব্যাটারি সংরক্ষণের দিকে নিতে হবে।

সরকার ব্যবসায়ী নয়, হবে নীতিনির্ধারক, বিইআরসি হবে রেফারি।

অতীতের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, সরকার একই সাথে নীতিনির্ধারক, নিয়ন্ত্রক, বৃহত্তম ক্রেতা, চুক্তি-আলোচক, জামিনদার ও ভর্তুকিদাতা হলে স্বার্থের সঙ্ঘাত এবং অপব্যবহারের সুযোগ বাড়ে। দরকার এমন ব্যবস্থা, যেখানে উৎপাদনকারী উৎপাদন করবে, গ্রাহক কিনবে, জাতীয় গ্রিড বিদ্যুৎ বহন করবে, আর স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা খেলার নিয়ম ঠিক করবে।

কুইক রেন্টালের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, ভুল কাঠামোয় হাজার হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎকেন্দ্র বানিয়েও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ নিশ্চিত হয় না; বরং অলস কেন্দ্রের বিল জনগণের ঘাড়ে চাপে। বর্তমান সঙ্কট তাই শুধু দুর্ভোগ নয়, পুরনো ব্যবস্থা বদলের সুযোগ। আরো বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, দরকার ভালো পরিকল্পনা, প্রতিযোগিতামূলক বাজার, জ্বালানি সরবরাহে বৈচিত্র্য এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান।

এই নতুন ব্যবস্থায় সরকারের কাজ হবে দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; আর বিইআরসি থাকবে আইনগতভাবে সুরক্ষিত একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে- যে মূল্য, লাইসেন্স, গ্রিড ব্যবহারের মাশুল, বাজারে প্রতিযোগিতা ও গ্রাহক-স্বার্থ নিরপেক্ষভাবে তদারক করবে।

লেখক : কানাডা প্রবাসী, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক