রাজধানী ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা এখন কেবল যানজট বা ট্রাফিক বিশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত সঙ্কটে রূপ নিচ্ছে। নীরবে ছড়িয়ে পড়ছে সিসা দূষণ। এর পরিণতি মারাত্মকভাবে ভোগ করছে আমাদের শিশুরা।
ঢাকায় অন্তত ২০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করছে। প্রতিটি রিকশায় ব্যবহার হচ্ছে চারটি করে সিসা ও এসিডসমৃদ্ধ ব্যাটারি। এগুলো বছরে অন্তত দু’বার পরিবর্তন করতে হয়। এতে বছরে প্রায় এক কোটি ৬০ লাখ ব্যাটারি পরিত্যক্ত হচ্ছে। প্রতিটি ব্যাটারিতে থাকে ১০ থেকে ১৫ কেজি সিসা। এগুলো মাটি, পানি, বাতাস ও নদীতে ছড়িয়ে পড়ছে। কেবল ঢাকায় নয়, সিসা দূষণ এখন বাংলাদেশের গ্রামগুলোতেও হচ্ছে। এই দূষণের দৃশ্যমান কোনো বিস্ফোরণ নেই; কিন্তু এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী ও প্রজন্মব্যাপী।
ইউনিসেফের তথ্য বলছে, সিসায় দূষিত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। রাজধানীর শিশুদের রক্তে সিসার ভয়াবহ উপস্থিতির তথ্য আন্তর্জাতিক গবেষণায় উঠে এসেছে। আইসিডিডিআর,বির গবেষণায় দেখা গেছে, দুই থেকে চার বছর বয়সী শিশুদের ৯৮ শতাংশের রক্তে বিপজ্জনক মাত্রার সিসা রয়েছে। এই বাস্তবতা কেবল পরিসংখ্যান নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বৌদ্ধিক সক্ষমতা ও শারীরিক সুস্থতার ওপর সরাসরি আঘাত।
সিসা দূষণের সাথে যুক্ত হয়েছে খাবারে ভেজাল ও রাসায়নিক দূষণ। গর্ভবতী মায়েদের শরীরে এই বিষাক্ত উপাদান ঢুকছে। এতে জন্মগত ত্রুটি, বিকলাঙ্গতা ও মানসিক প্রতিবন্ধকতার ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই ব্যবস্থা না নিলে আগামী এক দশকে এ সঙ্কট নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
উদ্বেগজনক বিষয় হলো– পরিস্থিতি মোকাবেলায় রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। পরিবেশ অধিদফতর, সিটি করপোরেশন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাজের সমন্বয়ে ঘাটতি আছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে নতুন করে অনুমোদিত রিকশাগুলোতে লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহারের কথা থাকলেও বাস্তবে সিসাযুক্ত ব্যাটারি যুক্ত করার অভিযোগ উঠেছে। এসব ব্যাটারি সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও নিরাপদভাবে ধ্বংস করার কোনো নীতিমালা বা অবকাঠামো নেই।
সঙ্কট উত্তরণে এখনই সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ দরকার। এ জন্য ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
পর্যায়ক্রমে নিম্নমানের লেড-এসিড ব্যাটারির ব্যবহার নিষিদ্ধ করা যেতে পারে। পরিত্যক্ত ব্যাটারি রিসাইক্লিংয়ের জন্য পরিবেশবান্ধব ও তদারকিপূর্ণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নজরদারি নিশ্চিত করতে পরিবেশ অধিদফতর ও সিটি করপোরেশনের যৌথ মনিটরিং টিম গঠন করতে হবে। এর পাশাপাশি খাবারে ভেজাল রোধ, নিরাপদ পানি সরবরাহ, গর্ভবতী মায়েদের পুষ্টি নিশ্চিত করাও এই সঙ্কট মোকাবেলার অংশ।
ব্যাটারিচালিত রিকশা নগর জীবনের বাস্তবতা, এটি সত্য। তবে এটি যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যগত ক্ষতির কারণ না হয়। নীতিনির্ধারকদের উদাসীনতা ও অব্যবস্থাপনার মাশুল দিচ্ছে শিশুরা। এই শিশুদের কণ্ঠ এখনো শোনা যায় না; কিন্তু সিসা-সঙ্কট উপেক্ষা করলে আগামী দিনে তাদের আর্তনাদ উপেক্ষার সুযোগ থাকবে না। নীরব বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার এখনই সময়।