বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাংলাদেশের শিল্প খাতে, বিশেষ করে তৈরী পোশাক কারখানায় ‘কমপ্লায়ান্স’ এখন একটি বহুল ব্যবহৃত শব্দ। নিরাপদ কর্মপরিবেশ, অগ্নিনিরাপত্তা, শ্রমিকের স্বাস্থ্যসেবা, কর্মঘণ্টা ও আন্তর্জাতিক শ্রমমান নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি হিসেবে কমপ্লায়ান্সের গুরুত্ব। দেখা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে কমপ্লায়ান্স শুধু পরিদর্শন ও সনদ অর্জনে সীমাবদ্ধ থাকছে। বাহ্যিক মানদণ্ড পূরণের আড়ালে শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ চাপা পড়ে থাকছে।
দেশের রফতানিমুখী শিল্পে বাইরের ক্রেতাদের কাছে কমপ্লায়ান্স বা শ্রমমান অনুসরণের ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরা হলেও বাস্তবে অনেক কারখানায় শ্রমিকদের অতিরিক্ত সময় কাজ করিয়ে কম মজুরি দেয়া, অতিরিক্ত কাজের হিসাব গোপন রাখা, নিরাপত্তাব্যবস্থায় ঘাটতি রেখে কাগজে-কলমে সব ঠিক দেখানো এবং ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের উদ্যোগ নিলে কৌশলে চাকরি থেকে সরিয়ে দেয়ার ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে তৈরী পোশাক কারখানায় অবকাঠামোগত নিরাপত্তায় অগ্রগতি হলেও শ্রমিকের অধিকার, ন্যায্য মজুরি এবং সংগঠনের স্বাধীনতা নিশ্চিত না হওয়ায় শ্রমমান অনুসরণের বড় একটি অংশ কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের (ডিআইএফই) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনেও একই তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থার বরাতে নয়া দিগন্তের খবর, দেশে ৫০ হাজারের বেশি নিবন্ধিত শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের আওতায় আছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪ সালে কয়েক হাজার কারখানায় নিয়মিত ও বিশেষ পরিদর্শন করে শ্রম আইন লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্ত করেছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) একাধিক পর্যবেক্ষণ, বাংলাদেশে নিরাপত্তায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হলেও শ্রমিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংগঠনের অধিকার নিশ্চিতে আরো কাজ করতে হবে।
অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে আধুনিক ভবন, উন্নত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা কিংবা পরিচ্ছন্ন কর্মপরিবেশ মনোরম। কিন্তু শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, সময়মতো বেতন দেয়া, ওভারটাইমের প্রকৃত পারিশ্রমিক কিংবা চাকরির নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত করা হয়।
কমপ্লায়ান্সের মূল উদ্দেশ্য শুধু কারখানার অবকাঠামো উন্নয়ন নয়; বরং শ্রমিকের মর্যাদা রক্ষা করা। বাস্তবে অডিটের আগে সাময়িক প্রস্তুতি, কাগজে-কলমে নিয়ম মানার প্রমাণ এবং বাস্তবতার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য উপস্থাপনের অভিযোগ পাহাড়সম। এতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে ইতিবাচক ভাবমর্যাদা তৈরি হলেও শ্রমিকের দৈনন্দিন জীবনে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন অধরাই রয়ে গেছে।
আমাদের শিল্প খাত বিশ্বে যতটুকু সুনাম অর্জন করেছে; বলা চলে তা এককভাবে শ্রমিকদের কঠোর পরিশ্রমের ফসল। সেই তাদের অধিকার নিশ্চিত না করে সনদ ও আনুষ্ঠানিকতা দিয়ে শিল্প খাতে প্রকৃত ঔৎকর্ষ অর্জন সম্ভব নয়। কমপ্লায়ান্স তখনই অর্থবহ হবে, যখন প্রতিবেদনে নয়, শ্রমিকের জীবনমানের উন্নয়নে প্রতিফলিত হবে। শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করে কমপ্লায়ান্স বাস্তবায়ন করতে হবে।
আমরা মনে করি, শিল্পের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে শ্রমিককে শিল্পমালিকদের সম্পদ হিসেবে বিবেচনায় নিতে হয়। তাদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা, বৈষম্যহীন আচরণ এবং শ্রম আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। এগুলো কমপ্লায়ান্সের অপরিহার্য অংশ। এ জন্য মালিকপক্ষ, সরকার এবং শ্রমিক প্রতিনিধিদের মধ্যে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সহযোগিতা গড়ে তোলা অপরিহার্য। সাথে সাথে কঠোর নজরদারিও করতে হবে।