বাংলাদেশের ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত আছে, যেগুলো কেবল ক্ষমতার পালাবদল ঘটায় না; রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথও নতুন করে নির্ধারণ করে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরে গণ-অভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মতো ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানও তেমনি এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। এটি কেবল একটি সরকারের পতনের ঘটনা ছিল না; বরং দীর্ঘদিন ধরে সঞ্চিত বৈষম্য, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, প্রশাসনিক দলীয়করণ, অর্থনৈতিক লুণ্ঠন এবং নাগরিক স্বাধীনতার সঙ্কোচনের বিরুদ্ধে একটি প্রজন্মের সম্মিলিত প্রতিবাদ। একে বিপ্লব বলা হোক বা গণ-অভ্যুত্থান- তার মূল তাৎপর্য নিহিত জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনে।
কিন্তু ইতিহাস আরেকটি কঠিন সত্যও শিক্ষা দেয়। বিপ্লবের চেয়ে বিপ্লবোত্তর রাষ্ট্রগঠন দুরূহ। পুরনো শাসকের পতন যত দ্রুত ঘটে, নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা নির্মাণ তত সহজ হয় না। কারণ, রাষ্ট্র কেবল সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমে বদলায় না; বদলাতে হয় প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, ক্ষমতার কাঠামো এবং নাগরিক-রাষ্ট্র সম্পর্কের মৌলিক চরিত্র। সেই অর্থে প্রশ্নটি আজ আর এই নয় যে, জুলাই সফল হয়েছিল কি না; বরং প্রশ্ন হলো- জুলাইয়ের স্বপ্ন কতখানি বাস্তবতায় রূপ নিতে পেরেছে?
জুলাইয়ের সূচনা হয়েছিল আপাতদৃষ্টিতে একটি সীমিত দাবি ঘিরে। সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার সংস্কার ছিল আন্দোলনের তাৎক্ষণিক উপলক্ষ। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে ‘ট্রিগারিং ইভেন্ট’ বলা হয়, সেটি কখনোই বৃহত্তর রাজনৈতিক বিস্ফোরণের একমাত্র কারণ নয়। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভ, বঞ্চনা ও অবিশ্বাস একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে বিস্ফোরিত হওয়ার সুযোগ খোঁজে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছিল। কোটা প্রশ্ন দ্রুতই রূপ নেয় রাষ্ট্রের বৈধতা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা, আইনের শাসন এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে। আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে তখন আর শুধু চাকরি ছিল না; ছিল ন্যায়বিচার, মর্যাদা এবং একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের আকাক্সক্ষা।
এই আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল এর প্রজন্মগত চরিত্র। স্বাধীনতার পর জন্ম নেয়া এক নতুন প্রজন্ম রাষ্ট্রকে অতীতের রাজনৈতিক আবেগের পরিবর্তে বর্তমানের বাস্তবতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করেছে। তারা রাষ্ট্রের কাছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির চেয়ে সুশাসনের নিশ্চয়তা চেয়েছে; দলীয় আনুগত্যের চেয়ে সাংবিধানিক সমতা চেয়েছে; উন্নয়নের পরিসংখ্যানের চেয়ে ন্যায়সঙ্গত অংশগ্রহণের অধিকার দাবি করেছে। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, যখন রাষ্ট্র তার নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা অনুধাবনে ব্যর্থ হয়, তখন রাজনৈতিক সঙ্কট অনিবার্য হয়ে ওঠে।

জুলাই-আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ শেষ পর্যন্ত এমন রাজনৈতিক বাস্তবতার সৃষ্টি করে, যেখানে দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা ছিল দ্বিমুখী। অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, দুর্নীতি ও অর্থপাচারের বিচার; অন্যদিকে এমন সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, যাতে ভবিষ্যতে কোনো ব্যক্তি বা দল আবার রাষ্ট্রকে এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে। এই প্রত্যাশার ভেতরেই জুলাই বিপ্লবের প্রকৃত দর্শন নিহিত ছিল।
অন্তর্বর্তী সময়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেয়া হয়। অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা, আর্থিক খাতের পুনর্গঠন, নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফেরানো এবং সংস্কার কমিশন গঠন, এসব ছিল ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু একই সাথে রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সংস্কারের প্রশ্ন যত এগিয়েছে, ততই পুরনো রাজনৈতিক শক্তিগুলোর স্বার্থ সামনে এসেছে। ফলে বিপ্লবের আদর্শ এবং ক্ষমতার বাস্তব রাজনীতির মধ্যে দূরত্ব ক্রমশ দৃশ্যমান হয়েছে।
পরবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। গণতন্ত্রের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নির্বাচন কখনোই বিপ্লবের সমাপ্তি নয়; বরং একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা। কারণ, জনগণ কেবল ভোটাধিকার ফিরে পেতে আন্দোলন করেনি। তারা এমন রাষ্ট্র চেয়েছিল, যেখানে প্রশাসন দলীয় প্রভাবমুক্ত হবে, বিচারব্যবস্থা স্বাধীন থাকবে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হবে এবং রাষ্ট্রের সম্পদ কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। যদি এই মৌলিক প্রশ্নগুলো অনুচ্চারিত থেকে যায়, তাহলে কেবল নির্বাচনের মাধ্যমে বিপ্লবের লক্ষ্য পূরণ হয়েছে, এ কথা বলা কঠিন।
ইতিহাসের নির্মম বৈশিষ্ট্য হলো- বিপ্লবের পর পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রায়ই নতুন মুখ নিয়ে ফিরে আসে। ব্যক্তি বদলায়, কিন্তু ক্ষমতা ব্যবহারের ধরন বদলায় না। প্রতিষ্ঠানগুলো যদি আগের মতোই দুর্বল থাকে, প্রশাসন যদি রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হয় এবং রাষ্ট্র যদি আবারো দলীয় স্বার্থের অধীন হয়ে পড়ে, তাহলে বিপ্লব ধীরে ধীরে স্মৃতিতে পরিণত হয়। বিপ্লব তখন ইতিহাসের পাতায় বেঁচে থাকে; কিন্তু রাষ্ট্রের চরিত্রে তার প্রতিফলন আর দেখা যায় না।
এ কারণেই আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ক্ষমতার নয়, বৈধতার। একটি সরকার কেবল নির্বাচনের মাধ্যমে নয়, জনগণের প্রত্যাশা পূরণের মাধ্যমেও বৈধতা অর্জন করে। জুলাইয়ের আত্মত্যাগ যদি কেবল ক্ষমতার পালাবদলে সীমাবদ্ধ হয়ে যায় এবং রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কার অসমাপ্ত থাকে, তবে ইতিহাস একে একটি সম্পূর্ণ বিপ্লব হিসেবে নয়; বরং একটি অসমাপ্ত বিপ্লব হিসেবেই মূল্যায়ন করবে।
বিপ্লবের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়; কোনো বিপ্লবই কেবল শাসক পরিবর্তনের জন্য সংঘটিত হয় না। প্রতিটি বিপ্লবের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য থাকে রাষ্ট্রক্ষমতার চরিত্র পরিবর্তন। ফরাসি বিপ্লবের পর ইউরোপ বহুবার রাজতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন দেখেছে; কিন্তু সামন্ততান্ত্রিক বৈধতা আর কখনো আগের অবস্থায় ফেরেনি। রুশ বিপ্লব নতুন রাষ্ট্র নির্মাণ করলেও ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের সমস্যা অতিক্রম করতে পারেনি। আরব বসন্তে বহু দেশে সরকার বদলেছে; কিন্তু রাষ্ট্রের কাঠামো অপরিবর্তিত থাকায় বিপ্লবের আকাক্সক্ষা পূর্ণ হয়নি। বাংলাদেশের জুলাইও সেই বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার বাইরে নয়। এখানে শাসক বদলেছে, কিন্তু রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার এখনো একটি চলমান প্রক্রিয়া।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সংস্কার নিয়ে যে জাতীয় আলোচনা শুরু হয়েছিল, সেটি ছিল জুলাই-পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অর্জন। দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশে সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা, পুলিশ সংস্কার, স্থানীয় সরকার, দুর্নীতি দমন এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় এটিই ছিল ‘প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের জানালা’ যে সুযোগ ইতিহাসে বারবার আসে না। কিন্তু সেই সুযোগ পুরোপুরি রূপায়ণের আগেই নির্বাচন চলে আসে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা আবার প্রধান আলোচ্য হয়ে ওঠে।
এখানেই জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটি দৃশ্যমান হয়। বিপ্লবের নেতৃত্বে ছিল মূলত একটি প্রজন্ম; কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব ফিরে যায় পুরনো রাজনৈতিক শক্তির হাতে। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় ঘটানো সহজ ছিল না। যারা রাস্তায় জীবন দিয়েছে, তাদের প্রত্যাশা ছিল দ্রুত ও গভীর পরিবর্তন। অন্য দিকে নির্বাচিত সরকার পরিচালিত হচ্ছে প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা, অর্থনৈতিক বাস্তবতা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক সমীকরণের ভেতর দিয়ে। ফলে বিপ্লবের নৈতিক প্রত্যাশা এবং শাসনের বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
তবে এই বাস্তবতার আড়ালে একটি মৌলিক প্রশ্ন কখনো হারিয়ে যাওয়া উচিত নয়। জুলাই কি কেবল একটি তারিখ, নাকি একটি রাজনৈতিক দর্শন? যদি জুলাই কেবল একটি স্মারক দিবসে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তবে তার ঐতিহাসিক শক্তি ক্ষয় হবে। কিন্তু যদি জুলাইকে জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র, আইনের শাসন, নাগরিক স্বাধীনতা এবং সাংবিধানিক ভারসাম্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়, তাহলে তার প্রভাব বহু দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করবে।
আজকের সরকারের জন্যও এটি অনিবার্য বাস্তবতা। জনগণ নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়েছে; কিন্তু সেই ক্ষমতার নৈতিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে জুলাইয়ের আত্মত্যাগের ওপর। ফলে ক্ষমতার বৈধতা শুধু নির্বাচনের ফলাফল থেকে নয়; বরং জুলাই-পরবর্তী সংস্কারের ধারাবাহিকতা রক্ষা থেকেও নির্ধারিত হবে। যদি রাষ্ট্র আবার ব্যক্তিনির্ভর হয়ে পড়ে, যদি প্রতিষ্ঠানগুলো আবার নির্বাহী বিভাগের ছায়ায় পরিচালিত হয়, যদি প্রশাসনে মেধার ওপর দলীয় আনুগত্য প্রাধান্য পায় এবং যদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইনের প্রয়োগ নির্বাচনী বিবেচনায় সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই, পরিবর্তনটি কোথায় ঘটল?
অর্থনীতির ক্ষেত্রেও একই সত্য প্রযোজ্য। অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ছাড়া রাজনৈতিক স্বাধীনতা টেকসই হয় না। জুলাইয়ের অন্যতম প্রেরণা ছিল বেকারত্ব, বৈষম্য ও সীমিত অর্থনৈতিক সুযোগ। কাজেই নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হচ্ছে এমন অর্থনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করা, যেখানে তরুণ সমাজ রাষ্ট্রকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, অংশীদার হিসেবে দেখতে পারে। কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা এবং সম্পদের ন্যায্য বণ্টন- এসব প্রশ্নে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে রাজনৈতিক অর্জন ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়বে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জাতীয় ঐক্য। ইতিহাসে বিজয়ী পক্ষের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় বিজয়ের পর। প্রতিহিংসা নয়, ন্যায়বিচার; প্রতিশোধ নয়, আইনের শাসন; দলীয় আধিপত্য নয়, প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য- এসব নীতিই বিপ্লবকে স্থায়ী ভিত্তি দেয়। অন্যথায় পরাজিত শক্তি নতুন ভাষ্য নির্মাণের সুযোগ পায়। রাজনৈতিক ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, শূন্যতা দীর্ঘদিন থাকে না। বিজয়ীরা নিজেদের আদর্শ বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে পরাজিতরাই একসময় নিজেদের পুনর্গঠন করে ফিরে আসে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেই সতর্কতা প্রযোজ্য। জুলাইয়ের মূল্যায়নে ইতোমধ্যে বিভিন্ন বয়ান তৈরি হচ্ছে। কেউ একে গণ-অভ্যুত্থান বলছেন, কেউ বিপ্লব, কেউ রাজনৈতিক পরিবর্তন, আবার কেউ এর বৈধতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছেন। ইতিহাসে এমন বিতর্ক নতুন নয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো ঘটনার স্থায়ী মূল্যায়ন নির্ধারণ করে রাজনৈতিক বক্তৃতা নয়; বরং সেই ঘটনার বাস্তব ফলাফল। যদি জুলাই একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তাহলে ইতিহাস তাকে বিপ্লব হিসেবেই স্বীকৃতি দেবে। আর যদি রাষ্ট্রের চরিত্র অপরিবর্তিত থাকে, তবে সেটি একটি অসমাপ্ত প্রচেষ্টা হিসেবেই চিহ্নিত হবে।
বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে রয়েছে নতুন সম্ভাবনা, অন্যদিকে পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রত্যাবর্তনের ঝুঁকি। এই দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যেই আগামী দিনের পথ নির্ধারিত হবে। ক্ষমতার প্রতিযোগিতা গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ; কিন্তু রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কারকে যদি দলীয় প্রতিযোগিতার কাছে বিসর্জন দেয়া হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে কোনো একটি দল নয়- পুরো রাষ্ট্র।
ইতিহাসের আদালতে ব্যক্তি নয়, প্রজন্মের বিচার হয়। ২০২৪ সালে তরুণরা যে আত্মত্যাগ, সাহস ও প্রত্যয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছিল, সেই সম্ভাবনার বাস্তবে রূপ দেয়ার দায়িত্ব এখন রাষ্ট্র, সরকার, রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজ- সবার। বিপ্লবের স্মৃতি সংরক্ষণ যথেষ্ট নয়; বিপ্লবের আদর্শ প্রতিষ্ঠাই প্রকৃত দায়িত্ব।
বাংলাদেশের সামনে তাই আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি ক্ষমতার নয়, রাষ্ট্রচিন্তার। আমরা কি আবার সেই পুরনো কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার চক্রে ফিরে যাবো, নাকি জবাবদিহি, প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য এবং নাগরিক মর্যাদার ভিত্তিতে একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি নির্মাণ করব? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে জুলাই কেবল ইতিহাসের একটি গৌরবময় অধ্যায় হয়ে থাকবে, নাকি বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের নতুন ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে চিরস্থায়ী স্বীকৃতি লাভ করবে।
জুলাইয়ের বিপ্লব তাই এখনো শেষ হয়নি। এটি এখনো নির্মাণাধীন। এর সাফল্য নির্ভর করবে সংস্কার বাস্তবায়নের ওপর; প্রতিষ্ঠানের ওপর; রাষ্ট্রের চরিত্র পরিবর্তনের ওপর। সেই কারণেই বলা যায়, জুলাই একটি অসমাপ্ত বিপ্লব; আর সেই অসমাপ্ততাই আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সত্য।
লেখক : অধ্যাপক (অব:), সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়