২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বিপুল ঋণনির্ভরতা নিয়েই জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। বৈদেশিক ঋণপ্রবাহে অনিশ্চয়তা এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণে সীমাবদ্ধতার কারণে এবার দেশীয় ঋণের ওপর চাপ আরো বাড়তে পারে। ফলে উন্নয়নকার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি ঋণ ব্যবস্থাপনা ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি সরকারের উন্নয়ন অগ্রাধিকার, অর্থনৈতিক কৌশল এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত পরিকল্পনার প্রতিফলন। কিন্তু বাংলাদেশে সীমিত রাজস্ব আয়ের কারণে ঘাটতি বাজেট দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। ঘাটতির বড় অংশ দেশীয় ও বৈদেশিক ঋণের মাধ্যমে পূরণ করা হয়। সময়ের সাথে এই ঋণনির্ভরতা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ফলে সদ্য পাস হওয়া ঘাটতি বাজেট ঋণের বোঝা কতটা বাড়াবে এবং ভবিষ্যতে এর প্রভাব কী হতে পারে, এসব প্রশ্ন সামনে আসছে।
বাজেট পাস হওয়ার পর অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকদের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে সীমিত রাজস্ব আয় দিয়ে ঘোষিত উন্নয়ন কর্মসূচির কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। সাধারণভাবে বাজেটের বড় অংশ ব্যয় হয় পরিচালন খাতে, অর্থাৎ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ভর্তুকি, ঋণের সুদ পরিশোধ ও প্রশাসনিক ব্যয় ইত্যাদিতে। ফলে উন্নয়ন কর্মসূচিতে অর্থের জোগান দিতে ঋণনির্ভরতা অব্যাহত থাকতে পারে।
বাজেটের কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মোট সরকারি ব্যয়ের তুলনায় রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশানুরূপ নয়। ফলে বাজেট ঘাটতি পূরণে দেশীয় ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বৈদেশিক ঋণপ্রবাহে অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে দেশীয় উৎস থেকে ঋণ গ্রহণের চাপ বাড়তে পারে, যা বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ, সুদের হার এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বাজেটের সফল বাস্তবায়নের জন্য রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করা এবং টেকসই ঋণ ব্যবস্থাপনা এখন সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।
ঘাটতি পূরণের প্রধান উৎস হিসেবে দেশীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা, সঞ্চয়পত্র, সরকারি বন্ড এবং বৈদেশিক উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
উন্নয়ন ব্যয়ের ক্রমবর্ধমান চাপ বাংলাদেশের বাজেট কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ দিক। অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও সামাজিক খাতে উচ্চ বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তায় উন্নয়ন বাজেটের উল্লেখযোগ্য অংশ ঋণনির্ভর অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল।
ঘাটতি বাজেট আধুনিক অর্থনীতিতে সুপরিচিত একটি নীতিগত উপকরণ। অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইনসের মতে, অর্থনৈতিক মন্দা বা ধীরগতির সময়ে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি সামগ্রিক চাহিদা, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়িয়ে অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে অবকাঠামো, জ্বালানি, যোগাযোগ এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের কারণে ঘাটতি বাজেট অনেক সময় বাস্তবসম্মত ও প্রয়োজনীয় নীতিগত বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে এই ঘাটতি যদি দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী ঋণনির্ভরতায় পরিণত হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঘাটতি বাজেট বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়ক হলেও দুর্বল রাজস্ব আহরণ, ব্যয়ের অদক্ষতা ও প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি এর কার্যকারিতা সীমিত করছে।
সরকার যখন ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বেশি পরিমাণ ঋণ গ্রহণ করে, তখন বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রাপ্তি কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে উদ্যোক্তারা নতুন শিল্প স্থাপন বা ব্যবসায় সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধন সংগ্রহে বাধার সম্মুখীন হন। অর্থনীতিতে এটি ‘পৎড়ফিরহম ড়ঁঃ বভভবপঃ’ নামে পরিচিত, যেখানে সরকারি ঋণ বেসরকারি বিনিয়োগকে প্রতিস্থাপিত করে। দীর্ঘমেয়াদে এটি উৎপাদন বৃদ্ধির গতি ধীর করতে পারে।
অন্যদিকে, সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে ঋণ গ্রহণ বৃদ্ধির ফলে সরকারের সুদ ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। পাস হওয়া বাজেটেও ঋণের সুদ পরিশোধে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে, ফলে বাজেটের একটি বড় অংশ শুধু সুদ পরিশোধেই ব্যয়িত হবে। এর ফলে উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয়ের সুযোগ সীমিত হতে পারে, যা আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে এবং ভবিষ্যৎ বাজেট ব্যবস্থাপনাকে আরো জটিল করে তুলবে। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ ঋণ বৃদ্ধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো মুদ্রানীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়া। ব্যাংকিং খাতে তারল্য সঙ্কট তৈরি হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বাজারে অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহ করতে হতে পারে, যা পরোক্ষভাবে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়ায়। ইতোমধ্যেই খাদ্য ও জ্বালানি মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিদ্যমান এবং ঋণনির্ভর বাজেট বাস্তবায়নের সময় এই চাপ আরো তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সরকার যখন ব্যাংকিং খাত থেকে বড় পরিমাণে ঋণ গ্রহণ করে, তখন বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যায়। ফলে উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় মূলধন না পেয়ে নতুন শিল্প স্থাপন বা ব্যবসায় সম্প্রসারণে পিছিয়ে পড়েন। এর ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ ধীর হয়ে পড়ে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিকে দুর্বল করে দেয়। বিনিয়োগ কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থানের ওপর। নতুন শিল্প ও ব্যবসায় না বাড়লে নতুন চাকরির সুযোগও কম তৈরি হয়। বাংলাদেশ বর্তমানে যে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে, তা যথাযথভাবে কাজে লাগানো না গেলে বেকারত্ব একটি কাঠামোগত সমস্যায় রূপ নিতে পারে।
অন্যদিকে, অভ্যন্তরীণ ঋণবৃদ্ধির কারণে বাজারে অর্থ সরবরাহ বাড়লেও উৎপাদন সেই অনুপাতে না বাড়লে মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি হয়। খাদ্য ও জ্বালানি খাতে এই চাপ আরো বেশি প্রকট হয়ে ওঠে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে সামষ্টিক অর্থনীতিতে ভোগ্য চাহিদার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। দীর্ঘমেয়াদে এসব প্রভাব জিডিপি প্রবৃদ্ধির গতিকেও দুর্বল করে দিতে পারে। স্বল্পমেয়াদে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অর্থনীতি কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও, বিনিয়োগ ও উৎপাদন কমে গেলে প্রবৃদ্ধির গতি ধীরে ধীরে শ্লথ হয়ে পড়তে পারে। এতে অর্থনীতি একটি নিম্ন-প্রবৃদ্ধির চক্রে আটকে পড়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে, যা থেকে বের হয়ে আসা তুলনামূলকভাবে কঠিন হয়ে যায়।
ঘাটতি বাজেট ও ঋণনির্ভর অর্থনীতির প্রভাব বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতায় ভিন্নভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। শ্রীলঙ্কা অতিরিক্ত ঋণ এবং দুর্বল রাজস্ব ব্যবস্থাপনার কারণে গুরুতর অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়ে এবং এক পর্যায়ে ঋণ পরিশোধে অক্ষম হয়ে যায়। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে ঋণনির্ভর অর্থনীতির চাপে থেকে বারবার আইএমএফের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়েছে, ফলে দেশটির অর্থনীতি দীর্ঘস্থায়ী চাপের মধ্যে রয়েছে। ভারতের ক্ষেত্রে বৃহৎ অর্থনীতি ও শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ বাজার কিছুটা স্থিতিশীলতা দিলেও রাজ্যপর্যায়ের ঋণবৃদ্ধি এবং সামাজিক ব্যয়ের চাপ কেন্দ্রীয় বাজেটের ওপর নিয়মিত চাপ সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া ঘাটতি বাজেটকে উৎপাদনমুখী খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে রফতানি, শিল্পায়ন এবং বিদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে রূপান্তর করে তুলনামূলক সফলতা অর্জন করেছে। এসব অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট, ঘাটতি বাজেট নিজে সমস্যা নয়; বরং এর ব্যবস্থাপনা, ব্যয়ের গুণগত মান এবং উৎপাদনমুখী খাতে কার্যকর প্রয়োগই এর চূড়ান্ত প্রভাব নির্ধারণ করে।
দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিগুলোর একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো উচ্চ উন্নয়নচাহিদা এবং সীমিত রাজস্ব সক্ষমতা, যার ফলে প্রায় সব দেশই ঘাটতি বাজেটের ওপর নির্ভরশীল। শ্রীলঙ্কায় দীর্ঘদিনের অবকাঠামো-কেন্দ্রিক ও ভোগবাদী ব্যয় বৈদেশিক আয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না থাকায় ঋণসঙ্কট তৈরি হয়। পাকিস্তানে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সাথে ঘাটতি অর্থায়নের ধারাবাহিকতা দেশটিকে দীর্ঘমেয়াদি আইএমএফ-নির্ভরতায় নিয়ে গেছে। ভারতের ক্ষেত্রে রাজ্যপর্যায়ের ঋণবৃদ্ধি এবং সামাজিক ব্যয়ের চাপ আর্থিক ভারসাম্যে চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। একইভাবে নেপাল ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলো উন্নয়ন প্রকল্পনির্ভর ঘাটতি বাজেটের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি বজায় রাখলেও দুর্বল রাজস্ব সংগ্রহ দীর্ঘমেয়াদে চাপ সৃষ্টি করছে।
উপসংহারে বলা যায়, ঋণভার নিয়ে পাস হওয়া বাজেটের সফলতা মূলত নির্ভর করবে ঋণের দক্ষ ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং ব্যয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করার ওপর। সুশাসন, দক্ষ প্রকল্প বাস্তবায়ন, রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার এবং উৎপাদনমুখী খাতে বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে এই বাজেটই টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি শক্তিশালী করতে পারে। তাই পাস হওয়া বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের মূল অগ্রাধিকার হওয়া উচিত শুধু ব্যয় বৃদ্ধি নয়; বরং প্রতিটি ব্যয়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা, সম্পদের দক্ষ ব্যবহার বৃদ্ধি করা এবং ঋণকে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তিতে পরিণত করা।
লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট