ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ার কারিগর জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত কোটি কোটি শিক্ষার্থীর হাতে বিনামূল্যে মানসম্মত বই তুলে দেয়ার দায়িত্ব এই প্রতিষ্ঠানের। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে এনসিটিবি ঘিরে রেখেছে সিন্ডিকেট। গড়ে উঠেছে অনিয়ম ও দুর্নীতির বৃত্ত। জুলাই বিপ্লবের পর আশা করা হয়েছিলÑ এই বৃত্ত ভেঙে বের হয়ে আসা যাবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত বের হওয়া যায়নি।
গতকাল এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সহযোগী একটি দৈনিক। এতে উল্লেখ করা হয়, আগামী শিক্ষাবর্ষের প্রায় ৩০ কোটি বই ছাপানোর এক হাজার ৭০০ কোটি টাকার বিশাল প্রকল্পকে কেন্দ্র করে আবারো সক্রিয় হয়ে উঠেছে পুরনো সেই দুর্নীতিবাজ ও বিতর্কিত চক্র। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও এনসিটিবির গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পুনর্বাসন এবং মুদ্রণ জগতের মাফিয়াচক্র থেকে গেছে।
প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগ রেজিমে নিম্নমানের বই ছাপানো এবং আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তাধীন কর্মকর্তারাও রাজনৈতিক ভোল পাল্টে ফেলেছেন। এনসিটিবির সচিব ও সদস্যের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী পদে আসীন হয়েছেন তাদের কেউ কেউ। বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পদায়নের পেছনে প্রভাবশালী কয়েকজন প্রেস মালিক ও এক শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা সক্রিয় ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। আগামী শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই মুদ্রণের দরপত্রে নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে সরকারি টাকা লুটপাটের পাঁয়তারা করছেন তারা।
দরপত্রের শর্ত এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে ছোট ও মাঝারি প্রেসগুলো প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারে। এবার দরপত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) মূল্যায়নপদ্ধতি যুক্ত করা হলেও সেটা পাশ কাটাতে সমঝোতার কৌশল নেয়া হচ্ছে। একই গ্রুপের একাধিক প্রতিষ্ঠান ভিন্ন নামে দরপত্র জমা দিয়ে কাজ নিশ্চিত করার চক্রান্ত করছে।
উদ্বেগের বিষয় হলো- নিম্নমানের বই ছাপানোর অপরাধে কালো তালিকাভুক্ত সাতটি প্রতিষ্ঠানকে মাত্র এক মাসের মাথায় রহস্যজনকভাবে শর্তসাপেক্ষে ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। অতীতেও নামমাত্র জরিমানা করে পার পেয়ে গেছে অপরাধীরা। এই দায়মুক্তির সংস্কৃতি সিন্ডিকেটকে বারবার বেপরোয়া করে তোলে। এতে শুধু সরকারের বিপুল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি নয়; সময়মতো শিক্ষার্থীদের হাতে মানসম্মত পাঠ্যবই পৌঁছানো নিয়েও পুরনো শঙ্কা থেকে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে যৌক্তিক কারণ ছাড়াই দরপত্র উন্মুক্ত করার তারিখ দফায় দফায় পেছানো হয়েছে, যা পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বই ছাপার কাজে কোনো অনিয়ম সহ্য করা হবে না। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ও প্রশ্নবিদ্ধ পদায়ন এই আশ্বাসের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। নতুন বাংলাদেশের বুকে পুরনো সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কেউ চায় না। মানসম্পন্ন বই ছাপানো নিয়ে ছিনিমিনি খেলা যাবে না। এনসিটিবির মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে পদায়নের ক্ষেত্রে সততা, দক্ষতা ও নিরপেক্ষতাকে একমাত্র মাপকাঠি করতে হবে। বিতর্কিত কর্মকর্তাদের তদন্তের মুখোমুখি করতে হবে। দরকার হলে সরিয়ে দিতে হবে। দরপত্র প্রক্রিয়ায় পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। মানসম্মত পাঠ্যবই যথাসময়ে শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছানো তাদের অধিকার। এই অধিকার রক্ষায় যেকোনো মূল্যে অসাধু চক্রের জাল ছিন্ন করতে হবে।