নিম্ন আদালতের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলেন সুপ্রিম কোর্ট। দেশের প্রথম সংবিধানে এ সংক্রান্ত যে বিধান ছিল সেটি পুনর্বহাল করা হয়েছে। এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সর্বোচ্চ আদালত বিদ্যমান সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ সংবিধান পরিপন্থী বলে ঘোষণা করেন। আদালতের রায়ে ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করা হয়। এতে অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত সব ধরনের পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষমতা ফিরে পাচ্ছেন সুপ্রিম কোর্ট।
১৯৭২ সালে সদ্য স্বাধীন দেশে জনগণের সার্বিক কল্যাণ ও অগ্রগতি নিশ্চিত করার আন্তরিক আকাক্সক্ষা থেকে যতদূর সম্ভব একটি কার্যকর সংবিধান রচনার চেষ্টা ছিল সংশ্লিষ্ট সংবিধানপ্রণেতাদের। কিন্তু মাত্র কিছু দিন যেতেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দেশে চরম দুঃশাসন প্রতিষ্ঠা করে। রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থতা ঢাকতে তারা বিশেষ ক্ষমতা আইনসহ নানা কালাকানুন তৈরি করেই ক্ষান্ত হয়নি; সংবিধানের মৌলিক চরিত্র পাল্টে দিয়ে বিচার বিভাগের ওপর হস্তক্ষেপের আইন তৈরি করে। তারা সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীতে বিচার বিভাগের এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত করে। ১৯৭৯ সালে সংবিধানের বহু নন্দিত পঞ্চম সংশোধনীতে সেটি সংশোধন করা হলেও বিচার বিভাগের সিদ্ধান্ত গ্রহণে নির্বাহী বিভাগের পরামর্শের বিধান যুক্ত করা হয়। ২০১৭ সালে আওয়ামী লীগ নিম্ন আদালতের বিচারকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের কর্তৃত্ব খর্ব করে। এসব কারণে গত ৫০ বছরে বিচার বিভাগ কখনো স্বাধীনভাবে নিজের এখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারেননি। আওয়ামী লীগের সর্বশেষ ফ্যাসিবাদী শাসনে আদালতের ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ করে বিরোধী দলের নেতাদের বিচারিক হত্যা পর্যন্ত করা হয়েছে, যা বিশ্বে নজিরবিহীন।
মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ফলে বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগের প্রভাবের অবসান ঘটবে। অর্থাৎ ক্ষমতাসীনরা ইচ্ছা করলেই বিচার বিভাগের কাজে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। শুধু তাই নয়, এই রায়ের ফলে নির্বাহী, বিচার ও সংসদ- রাষ্ট্রের এই তিনটি বিভাগের পরস্পরের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাবের অবসান ঘটবে। এর ফলে প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে সক্ষম হবে প্রতিটি বিভাগ। রাষ্ট্রযন্ত্রের সুষ্ঠু পরিচালনা ও বিকাশে এটিই সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা।
এই রায় দেশের ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের সূচনা করবে- তা নিশ্চিত। এই রায়ের মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্ব এবং রাজনৈতিক প্রভাব থেকে অধস্তন বিচার বিভাগ মুক্তি পেল। আত্মমর্যাদা ও সম্মান ফিরে পেলেন অধস্তন আদালতের বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তারা। এই রায় বাস্তবায়ন হলে আর কোনো বিচারিক হত্যার সুযোগ থাকবে না। নির্বাহী বিভাগ তথা আইন মন্ত্রণালয় যখন তখন যেমন ইচ্ছা ছড়ি ঘুরাতে পারবে না। আশা করা যায়, এতে বিচার ব্যবস্থার ওপর জনগণের ক্ষয়িষ্ণু আস্থা ফিরে আসবে।
তবে সন্দেহ নেই, সব কিছুই নির্ভর করছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর। পতিত স্বৈরাচার ফিরিয়ে আনতে একটি মহল যেভাবে মরিয়া হয়ে উঠেছে, তা উদ্বেগজনক। আওয়ামী লীগের মতো দল কোনোভাবে আবার ক্ষমতায় ফিরে এলে সব কিছুই ওলট-পালট হবে। কারণ, লুটেপুটে খাওয়া ছাড়া আর কিছু তারা জানে না।