বাংলাদেশে সরকার পরিচালনা এখনো পুরনো ধারার ব্রিটিশ আমলাতন্ত্রনির্ভর। এতে জনগণের সেবকরা কর্তা সেজে যান। তারা উল্টো জনগণকে বাধ্য করেন তাদের সেবা দিতে। ফলে ঘুষ-দুর্নীতি, অনিয়ম-গাফিলতি ও দীর্ঘসূত্রতাই হয়ে ওঠে সরকারি কাজের অনিবার্য ধারা। এর ওপর গত সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদ তাদের জন্য বাড়তি এক সুযোগ এনে দেয়। শাসকদল ও আমলাদের মধ্যে গড়ে ওঠে অশুভ আঁতাত। এই চক্রের হাতে বন্দী হয়ে যায় সরকারি প্রশাসন। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেয়ার পর বড় ধরনের সংস্কারের প্রয়োজন থাকলেও তা করা যায়নি এদের বাধার কারণে।

সরকারে যোগ দেয়া অদক্ষ অনভিজ্ঞ উপেদেষ্টারা ক্ষেত্রবিশেষে পুরনো চক্রের সাথে সহযোগী হয়েছেন। এই সুযোগ আমলাদের একটি অংশ সরকারের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। তাই আগের সরকারের কাজের ধারাবাহিকতার খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। সততা-যোগ্যতার কারণে যারা বঞ্চনার শিকার হয়েছেন, তারা নতুন সরকারে গুরুত্ব পেলে কাজের গতি পেত। সেই ক্ষেত্রে দেখা গেছে বঞ্চিতদের কেউ কেউ কিছু সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন। কিন্তু তারা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আসতে পারেনি পুরনো চক্রের কারণে। সরকারি কাজে স্থবিরতার মূল কারণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরকারের অগ্রাধিকার সচিবালয়ে বাধার মুখে পড়েছে। হাসিনা সরকারের সময় সার্ভিস রুল বাদ দিয়ে দলীয় ও ব্যক্তিবিশেষের চাওয়া অনুযায়ী সরকারি প্রশাসন চলেছে। এ দিকে অন্তর্বর্তী সরকার শুরুতে এই চক্র ভেঙে দেয়ার বদলে তাদের ওপর নির্ভর করেছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষে থেকে সচিবালয়মুখী আন্দোলন হয়েছে। তাতেও কোনো কাজ হয়নি; বরং এই সুবিধাবাদী আমলারা হট্টগোল-চেঁচামেচি এমনকি কাজ বন্ধ রাখার মতো অস্বস্তিকর কাজও করেছেন, যাতে সরকার বারবার বিব্রত হয়েছে। এ কারণে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে মানুষের যে উচ্চাশা ছিল তা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পূরণ হয়নি।

পরবর্তী নির্বাচিত সরকারকে আমলাতন্ত্রের এই অচলাবস্থা মাথায় নিয়ে কার্যক্রম শুরু করতে হবে। আমলাতন্ত্রের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে গেছে হাসিনা সরকারের উপদেষ্টা দুর্নীতিগ্রস্ত এইচ টি ইমাম। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আরেক সাবেক আমলা আলী ইমাম মজুমদার শুধু তার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন। নামমাত্র কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগে আমলাদের বদল করা হলেও দফতর-অধিদফতরসহ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অভিযুক্তরা বসে আছেন। এ দিকে বিপ্লবকে ধারণ করে যারা সরকারি প্রশাসনে গতি আনতে পারতেন, তারা সাইডলাইনে থেকে গেছেন। আমলাতন্ত্রের সহযোগিতা না পেয়ে কয়েকজন উপদেষ্টা প্রকাশ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। একজন উপদেষ্টা খেদে বলে ফেলেছেন বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমানটি স্কুলে আঘাত না করে সচিবালয়ে আঘাত করলে ঠিক হতো। এ ধরনের ক্ষোভ প্রকাশ কোনো তুচ্ছ বিষয় নয়।

প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি অনিয়ম জেঁকে বসেছে। কাজ সহজ করার বদলে তারা আরো কঠিন করছে। এই পরিস্থিতি বদলাতে না পারলে রাজনৈতিক সরকারও হাবুডুবু খাবে। দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতি আবারো একই স্থবিরতায় পড়বে। আসন্ন রাজনৈতিক সরকারকে প্রথমে আমলাতন্ত্র নিয়ে ভাবতে হবে। একটি স্বচ্ছ গতিশীল প্রশাসন গড়ে তুলতে হলে আগের অশুভ চক্র ভেঙে দিতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ পদে সৎ দক্ষ ও দেশপ্রেমিকদের নিয়োগ দিতে হবে। এ জন্য বড় ধরনের পরিবর্তনের হোমওয়ার্ক করে রাজনৈতিক সরকারকে দেশ পরিচালনায় নামতে হবে।