শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে দুর্নীতি, লুটপাট ও অব্যবস্থাপনা দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। এ সময় একের পর এক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার দেশকে বড় ধরনের এক অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছে। খাদের কিনার থেকে টেনে তুলছে। ব্যাংকব্যবস্থা ক্রমে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। ঋণের নামে লুটে নেয়া অর্থ ব্যাংক ব্যবস্থায় যে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে তা থেকে জাতীয় অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে সময় লাগছে।
নয়া দিগন্তের এক প্রতিবেদন জানিয়েছে, ২০২৫ সালের মার্চ শেষে মোট খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ২৪ দশমিক ১৩ শতাংশ। এটি এক বছর আগের খেলাপি ঋণের তুলনায় ১১৭ শতাংশ বেশি। একই সময় নিট খেলাপি ঋণ দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন আরেক বছরের মধ্যে ব্যাংক আমানতের অর্ধেক খেলাপি হয়ে পড়তে পারে। অন্তর্বর্তী সরকার দুর্নীতি বন্ধ ও সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেয়ার পরও ব্যাংক খাতের দুর্বলতার মূলে রয়েছে কোষাগার থেকে দেদার অর্থ লুটে নেয়া। শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার কয়েক বছর আগে থেকে বড় অঙ্কের যে অর্থ সরানো হয়েছে; সেগুলো খেলাপি হিসেবে প্রতি বছর নতুন করে যুক্ত হচ্ছে। কার্যত এ অর্থ আর কখনো ফিরে কি না তা নিয়ে গভীর সন্দেহ রয়েছে। এর যে চক্রাকার অভিঘাত সেটি নানা সূচকে উন্নতির পরও অর্থনীতিকে ইতিবাচক ধারায় ফেরাতে বাধাগ্রস্ত করছে।
বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের গতি এ সময় আশানুরূপ বেড়েছে। প্রবাসী আয়ে বড় উল্লম্ফন দেখা গেছে। ২০২৫ সালে প্রবাসী আয় প্রথম ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ বেশি। একই সময়ে রফতানি আয়ও বেড়েছে ৭ দশমিক ৭২ শতাংশ। এ সময়ে রফতানি হয়েছে ৪৩ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। হুন্ডির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বৈধ চ্যানেলে অর্থ প্রেরণের উৎসাহ দেয়ার পাশাপাশি বিদেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি প্রবাসী আয় বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। এ দিকে বাণিজ্যের আড়ালে মুদ্রাপাচারের বিরুদ্ধেও সরকার সক্রিয়। সম্প্রতি ২১টি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান এক হাজার ১০০ কোটি টাকা অর্থ দেশে ফেরত এনেছে। রফতানির আড়ালে এ অর্থ পাচার করার অভিসন্ধি ছিল তাদের। গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতায় মামলার ভয়ে তারা এ অর্থ পাচার করতে পারেনি। অর্থনীতির অন্যান্য সূচকেও ইতিবাচক ধারা পরিলক্ষিত হচ্ছে। পুঁজিবাজারের সূচক ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতির রাশ টেনে ধরা যায়নি। এটি এক অঙ্কের ঘরে নেমে এলেও এখনো ৯ দশমিক ৫৮ শতাংশ। বাজারে জিনিসপত্রের দাম নতুন করে না বাড়লেও চড়া।
দেশের অর্থনীতি এখনো বড় ধরনের ঝুঁকিতে রয়ে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করছে। এই সরকার দক্ষ কিছু অর্থনীতিবিদকে এ কাজে নিয়োগ দিয়েছে। এর পরিপূর্ণ সুফল পেতে হলে দীর্ঘ মেয়াদে তাদের নীতি অনুসরণ করতে হবে। বর্তমান সরকার বিদায় নিলেও একই ধরনের নীতি যাতে বজায় থাকে সে বিষয়ে নিশ্চয়তা তৈরি করতে হবে।