ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় লাভ করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’। ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) পদে আবু সাদিক কায়েম, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ ও সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) মো: মহিউদ্দিন খানসহ ২৮টি পদের ২৩টিতে জয়ী হয়েছেন শিবির-সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের শিবিরের প্রতি এটি এক ঐতিহাসিক রায়। আমরা ডাকসুর বিজয়ীদের উষ্ণ অভিনন্দন জানাই। নির্বাচনে অংশ নেয়া অন্যদের প্রতিও আমাদের শুভকামনা।
ডাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ করা গেছে, ঠিক তেমনি এই নির্বাচন বানচাল করার জন্যও কম ষড়যন্ত্র হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীরা সব অপচেষ্টা রুখে দিয়ে ডাকসু নির্বাচন সম্পন্ন করেছে। নির্বাচন মানেই কে জিতবে আর কে হারবে- তা আগে থেকে নিশ্চিত করে বলার সুযোগ নেই। কিন্তু শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী জমানায় খুব সহজে আগেই বলে দেয়া যেত বিজয়ী প্রার্থীর নাম। কারণ নির্বাচনে হার-জিত নির্ধারণ করে দিতেন শেখ হাসিনা। ডাকসু নির্বাচনের শুরু থেকে যে ধরনের উৎসব-উদ্দীপনা ও ফলাফল প্রকাশ হওয়ার আগ পর্যন্ত উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এবং উৎসুক্য লক্ষ করা গেছে তাতে মনে হয়েছে, দেশে আবারো সুন্দর নির্বাচনের পরিবেশ ফিরে এসেছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ছাত্র-জনতা নির্বাচনের এমন শান্তিপূর্ণ পরিবেশই চেয়েছিল। আমরা মনে করি, আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্রের অভিযাত্রা শুরুর যে আকাঙ্ক্ষা জনগণের মধ্যে বিদ্যমান তাতে ডাকসু নির্বাচন ইতিবাচক প্রভাব রাখবে।
ঢাবি শিক্ষার্থীরা ডাকসুতে ব্যালটের মাধ্যমে শুধু শিবিরের প্রতিনিধিই নির্বাচিত করেননি, একই সাথে যারা এ দেশে বিভাজনের রাজনীতি করতে চায় তাদেরকেও লাল কার্ড দেখিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছেন। কারণ আমরা দেখেছি নির্বাচনের সময় শিবিরের ভিপি পদপ্রার্থী সাদিক কায়েমকে একটি বাম ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে পাকিস্তানি বলে ট্যাগ দেয়া হয়েছিল। বিগত সাড়ে ১৫ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবির ছিল চরম নির্যাতিত ছাত্র সংগঠন। ঢাবি ক্যাম্পাসে কার্যত তারা নিষিদ্ধ ছিল। কিছু সংবাদমাধ্যম ও বুদ্ধিজীবী তখন ছাত্রশিবিরের ওপর ছাত্রলীগের করা এসব নির্যাতনের পক্ষে সাফাই গাইত। ডাকসুর প্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে ঢাবি শিক্ষার্থীরা শিবিরকে তাদের প্রাপ্য মিটিয়ে দিলো।
শিক্ষাবিদরা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’টি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো জ্ঞান বিতরণ ও জ্ঞান সৃষ্টি করা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান বিতরণের কাজটি কোনোরকম করতে পারলেও জ্ঞান সৃষ্টিতে তার অবদান খুব নগণ্যই বলতে হয়। ফলে দেশও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে প্রত্যাশিত উপকার পাচ্ছে না। অন্য দিকে তার বদলে বছরের পর বছর ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠেছে রাজনীতির রণক্ষেত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অধিক রাজনীতিনির্ভর হওয়া থেকে অধিক জ্ঞানচর্চা ও জ্ঞান সৃষ্টিনির্ভর বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করার লক্ষ্যে ডাকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধিরা কাজ করবেন বলে আমাদের প্রত্যাশা।