দেশে সরকারি চাকরি সবসময় বেশ আকর্ষণীয়। এই সুযোগে সরকারি চাকরি ঘিরে বহুকাল ঘুষ, অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর পরিস্থিতি বেশ পরিবর্তন হয়। দুর্নীতি-অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ অনেকটাই কমেছে। স্বচ্ছপ্রক্রিয়ায় সরকারি চাকরিতে নিয়োগ শুরু হয়। এমতাবস্থায় সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার নম্বর বণ্টনে নতুন নিয়ম করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এতে চাকরিপ্রার্থীরা নিয়োগবাণিজ্যসহ যেসব অনিয়মের আশঙ্কা প্রকাশ করছে, সেগুলো যৌক্তিক। সরকারকে চাকরিপ্রার্থীদের এই উদ্বেগ আমলে নিতে হবে।
চাকরির নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, তৃতীয় শ্রেণীর ১১-১২ গ্রেডের কর্মচারী নিয়োগে লিখিত পরীক্ষার নম্বর ১০০, তৃতীয় শ্রেণীর ১৩-১৬ গ্রেডের লিখিত পরীক্ষার নম্বর ৬০ এবং চতুর্থ শ্রেণীর অর্থাৎ ১৭-২০ গ্রেডের লিখিত পরীক্ষার নম্বর ২৫ করা হয়েছে। পক্ষান্তরে তৃতীয় শ্রেণীর ১১ ও ১২ গ্রেডের মৌখিক পরীক্ষা ৫০ নম্বর, ১৩ থেকে ১৬ গ্রেডের তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারীর মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ৪০ করা হয়েছে। এ ছাড়া চতুর্থ শ্রেণীর মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ২৫ করা হয়েছে। বর্তমানে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর নিয়োগে লিখিত ৯০ এবং মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ১০ রয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি বা জালিয়াতি রোধে এই নিয়ম করা হয়েছে। সরকারের এই যুক্তি দুর্বল। কারণ, এমসিকিউ কিংবা লিখিত পরীক্ষায় জালিয়াতি রোধ করা অসম্ভব কিছু না। কিন্তু মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর বেশি হলে অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ আরো বেড়ে যায়। সরকারকে এমসিকিউ কিংবা লিখিত পরীক্ষায় জালিয়াতি রোধে বরং কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
২০১৪ সালে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে বর্তমানে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগকে উদ্দেশ করে বলেছিল— বিসিএসে তোমরা লিখিত পরীক্ষাটা ভালো করে দাও, বাকি ভাইভা পরীক্ষাটা আমরা দেখব। বর্তমান সরকারদলীয় সংসদ সদস্য লুৎফুজ্জামান বাবর চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে তার নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘আগে যেমন জোর করে, ধাক্কাইয়া করতে পারছি, এখন পারব না। এখন মিডিয়া অনেক স্ট্রং। নিজের যোগ্যতায় রিটেন পাস ও শারীরিক যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। তারপর ভাইভাতে আমি ইনশাআল্লাহ সাহায্য করব।’
দলীয় শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের এসব কথায় এটিই প্রমাণ করে, নিয়োগের ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষায় পার হওয়া বেশ কঠিন। তাই লিখিত পরীক্ষার চেয়ে মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর বেশি দিয়ে অনিয়মের পথ প্রশস্ত করতে হবে!
বাংলায় একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ আছে। তা হলো— ‘ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়’। শেখ হাসিনার শাসনামলে কোটা বৈষম্য, অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির কারণে শিক্ষার্থীরা চাকরি নিয়ে যে ভোগান্তির শিকার হয়েছিলেন, তা দূর করতে তাদের একটি গণ-অভ্যুত্থান করতে হয়েছে। তাই সরকারি নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বৃদ্ধি নিয়ে তাদের উদ্বেগটা একটু বেশি। ইতোমধ্যে এই নিয়মের প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। বিরোধী দলের পক্ষ থেকেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, চাকরিপ্রার্থী শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ যথাযথভাবে আমলে নিয়ে সরকার মৌখিক পরীক্ষার নম্বর যৌক্তিকভাবে কমাবে।