সংসদে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চ হলো গত ৫ সেপ্টেম্বর। আওয়ামী সরকারের পতনের পর এটিই ছিল প্রথম বড় রাজনৈতিক কর্মসূচি। গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধেও এটিই প্রথম লংমার্চ।
আধুনিক রাজনীতি ও সামরিক ইতিহাসে ‘লংমার্চ’ শব্দটির উৎপত্তি ঘটে চীন থেকে। ১৯৩৪ সালে চীনের তৎকালীন শাসক চিয়াং কাইশেকের নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদী কুওমিনতাং বাহিনীর বিরুদ্ধে মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ‘রেড আর্মি’ দক্ষিণ-পূর্ব চীন থেকে উত্তর-পশ্চিম চীনের শানসি প্রদেশের উদ্দেশে মহাযাত্রা শুরু করে। প্রায় এক বছর ধরে (৩৬৮ দিন) কমিউনিস্ট বাহিনী নদী, পাহাড় ও দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে। এই যাত্রায় প্রায় ৮০-৯০ শতাংশ সৈন্য মারা যায়। তবে এটি চীনা কমিউনিস্ট পার্টিকে পুনর্গঠিত হতে সাহায্য করে এবং মাও সেতুং অবিসংবাদিত নেতা হয়ে ওঠেন। এই সামরিক অভিযাত্রাই পরে লংমার্চ হিসেবে স্বীকৃতি পায় এবং বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রেরণা ও প্রতীক হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে লংমার্চের ইতিহাস প্রায় সবার জানা। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ (১৯৭৬) রাজনীতির এক বহুল আলোচিত অধ্যায়। কারণ, সেটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে অভূতপূর্ব জাগরণ সৃষ্টি করেছিল।
১১ দলীয় ঐক্যজোট ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত লংমার্চের কর্মসূচি দেয় ছয় দফা দাবিতে। দাবির মধ্যে ছিল— রাষ্ট্র সংস্কারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জুলাই সনদ-সম্পর্কিত গণভোটের রায় দ্রুত বাস্তবায়ন; জুলাই গণহত্যার বিচার; গ্যাস, বিদ্যুৎ, তেল ও সারের সঙ্কট নিরসন; নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও মূল্যবৃদ্ধি রোধ করা; দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি শক্ত হাতে বন্ধ করা; প্রশাসনসহ সব ক্ষেত্রে দলীয়করণ ও জনদুর্ভোগ বন্ধ করা।

লংমার্চ কতটা সফল হবে সে বিষয়ে সরকারি দল নেতিবাচক মন্তব্য করেছিল। কেউ বলেছিলেন, এর সাথে জনগণের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। বিরোধী দল তাড়াহুড়া করছে। কেউ বলেন, রাজনৈতিক কর্মসূচি দিতেই পারেন; কিন্তু সমস্যা সমাধানের পরামর্শ সংসদে উপস্থাপন করাই কাম্য। তার মানে— লংমার্চকে তারা গুরুত্ব দিতে চাননি। এমনকি খোদ বিরোধী দলও যে এতটা সফলতা আশা করেনি তা বোঝা গেল লংমার্চের পর আয়োজকদের স্বীকারোক্তি থেকে।
প্রথম লংমার্চ সত্যিই অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল। বিপুল জনসম্পৃক্ততা সৃষ্টি করেছে এটি। যাত্রাপথে নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, ফেনী ও মিরসরাইয়ে পথসভায় মানুষের ঢল নেমেছে। জনসমুদ্রের জোয়ার দেখেছে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দান। এই গণজোয়ার দেখে সরকারি নেতা-মন্ত্রীদের কথার সুর পাল্টেছে। কিছুটা উষ্ণতা আঁচ করা যাচ্ছে। পানিসম্পদমন্ত্রী ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব বলেছেন, হুঙ্কার দেবেন না, ভয় দেখাবেন না। বিএনপি আন্দোলন-সংগ্রাম করে রাজপথ থেকে উঠে আসা দল।
বলেছেন, সরকারের দায়িত্ব নেয়ার ছয় মাস পার হচ্ছে। এখনই আন্দোলন শুরু করেছেন, এটা ঠিক না। এই লংমার্চে চিহ্নিত কিছু ব্যক্তি অংশ নিয়েছে। দেশের মানুষ লংমার্চ কর্মসূচি গ্রহণ করেনি।
সাধারণ একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘিরে বিএনপির এই প্রতিক্রিয়া অবাক করার মতো। মনে হচ্ছে যেন, বিরোধী দল সরকার পতনের আন্দোলন শুরু করেছে। অথচ লংমার্চের আগেই বিরোধী দল স্পষ্ট করে দেয়, সরকার পতনের লক্ষ্যে এই কর্মসূচি নয়। তবু সরকারের ভেতরে বাড়তি প্রতিক্রিয়ার একটি সূত্র মেলে স্বয়ং সরকারপ্রধানের প্রতিক্রিয়া থেকে। লংমার্চের দিনই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিরোধী দলের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। এটি ইঙ্গিত যে, বিরোধী দলের আন্দোলনকে সরকার ইতিবাচকভাবে নিচ্ছে না। ফলে সরকারি দলের মন্ত্রী-নেতারাও একই সুরে প্রতিক্রিয়া জানাবেন— এটিই স্বাভাবিক।
পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানির বক্তব্যের একাংশ সত্য। বিএনপি নামের যে দলটি রাজপথে আপসহীন সংগ্রাম করেছে সেটি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার। গত ১৭ বছরের বিএনপি না, গত ১৭ বছরে দেশ ও জাতির সবচেয়ে কঠিন সময়ে বিএনপি আন্দোলনের নামে আসলে হাস্যরসের জন্ম দিয়েছে। ‘ঈদের পরই চূড়ান্ত আন্দোলন’ এমন ঘোষণা শুনে একপর্যায়ে বিএনপির কর্মীরাও হাসি থামাতে পারতেন না। কেউ মুখ টিপে হাসতেন, কেউ মুখ চাপা দিতেন। সে প্রসঙ্গ এখনো হাস্যরসের জোগান দেয়।
সুতরাং বলাই যায়, বর্তমান বিএনপিকে রাজপথের দল দাবি করতে হলে নতুন প্রমাণ লাগবে। সেটি তো ক্ষমতায় থেকে সম্ভব নয়। ক্ষমতায় থেকে যেটি সম্ভব তা হলো— জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ ও দেশের প্রকৃত উন্নয়নের মাধ্যমে জনগণের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা অর্জন। সে কাজটিই বা বিএনপি কতটা করছে?
বিএনপি কী করছে সেটি দেখার আগে বলে নিই, সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলের কাজ সরকারের ভুল ত্রুটি দেখিয়ে দেয়া। জনগণের সমস্যা তুলে ধরা, এ বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ ও সমাধানে সরকারকে বাধ্য করা; ক্ষেত্র বিশেষে সাহায্য করা, উপায় বাতলে দেয়া। প্রয়োজনে নিজেরা ক্ষমতায় গেলে কিভাবে সংশ্লিষ্ট সমস্যার সমাধান করবেন তার সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা সংসদের মাধ্যমে জনগণের সামনে উপস্থাপন করা। বর্তমান বিরোধী দল গত ছয় মাস ধরে ঠিক সেই দায়িত্বই পালন করছে, যা তাদের করার কথা। কিন্তু কোনো চেষ্টাই সফল হয়নি। সংসদে আলোচনা, দৃষ্টি আকর্ষণ, ওয়াকআউট, বাদ-প্রতিবাদ— কোনো কিছুতেই সরকারের টনক না নড়লে কী করা! লংমার্চের যৌক্তিকতা এই জায়গায়।
এবার আসুন বিরোধী দলের লংমার্চ কর্মসূচির মূল দাবিগুলো খেয়াল করি। ছয় দফা দাবিতে সেই বিষয়টিই গুরুত্ব পেয়েছে যেসব ক্ষেত্রে গত ছয় মাসের সরকার সীমা লঙ্ঘন করছে, বুঝে, না বুঝে অথবা কারো প্ররোচনায়। বলা হয়েছে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে জরুরি সংস্কার কার্যক্রমে সরকারের অনীহা, সময়ক্ষেপণের কথা এবং কার্যত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি যে সংবিধান সেটি ধসিয়ে দেয়ার কথা। আছে জনগণের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধানে সরকারের ব্যর্থতার প্রসঙ্গ এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশ ও জাতির উন্নয়নের স্থায়ী প্রতিবন্ধক দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দলীয়করণ বন্ধের কথা।
কিভাবে সরকারি দল সংবিধানের অবজ্ঞা করছে? আমরা সংবিধান বিশেষজ্ঞ নই। সচেতন নাগরিক হিসেবে খোলা চোখে যেটুকু দেখি সেটুকুই কেবল বলতে পারি। বিএনপির বর্তমান সরকার সংবিধানের পাহারাদার হিসেবে বিপুল খ্যাতি পেয়েছে— এমন বিশেষজ্ঞ অনেক। কেউ কেউ সংবিধানের নাম জপতে জপতে এতটাই জজবায় পৌঁছে গেছেন যে, ‘গণদেবতার’ মন্দিরের দরজা পর্যন্ত খুলে গেছে। আর জপকারী পৌঁছে গেছেন রাজনীতির পুরোহিতের পর্যায়ে। সুতরাং গণভোটের রায় উপেক্ষা বা পায়ে দলা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোন মাত্রার স্খলন তা তাদের না বোঝার কথা নয়। সেই স্খলন তারা ঘটিয়েছেন রাষ্ট্রসংস্কারের জুলাই সনদ-সম্পর্কিত গণভোটের রায় পদদলিত করার মাধ্যমে। ভবিষ্যৎ রাজনীতির ইতিহাসে বিএনপির নেতিবাচক কর্মকাণ্ড বা ভুলের তালিকায় গণভোটের রায় প্রত্যাখ্যানের বিষয়টি মোটাদাগে লেখা হবে নিঃসন্দেহে। যেমন এই দলটির ওপর বর্তাবে জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে অর্জিত নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ ধ্বংস করার দায়ও।
তার চেয়েও যেটি বিস্ময়ের তা হলো— একটি নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘিরে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রতিক্রিয়া। এই অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়ার একটি কারণ সহজে বোধগম্য। জবাবদিহির মুখে পড়লে সেই ব্যক্তিই সবচেয়ে আগে তেড়েফুঁড়ে ওঠে যার নিজের মধ্যে সমস্যা আছে। বিএনপিরও সমস্যা আছে। তারা এমনকি গণতান্ত্রিক নিয়ম ও আচরণের মধ্যে থাকছে না।
বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে সরকারপ্রধানকে কটূক্তির দায়ে অভিযুক্ত তরুণ সিফাত আবদুল্লাহকে শুধু গ্রেফতারই করা হয়নি; তার বিরুদ্ধে পুরনো সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দেয়া হয়েছে। রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। এ ঘটনায় উদ্বেগের কারণ আছে এ জন্য যে, এ ধরনের ঘটনা একটি নয়।
খোদ প্রধানমন্ত্রীর এক সহকারী আছেন রাশেদ খান, যিনি বিরোধী দল ও এর নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অশ্লীল গালাগালির তুবড়ি ছোটান। তো, সিফাত আবদুল্লাহ গ্রেফতার হলে, রিমান্ডে গেলে, রাশেদ খান কেন নয়? আইন কি তবে উঁচু-নিচু ভেদে ভিন্নভাবে প্রযোজ্য? যেমনটি দেখেছি গত ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনে! দলীয়করণ নিয়ে কিছু বলা বাহুল্য মনে করছি। শুধু বলি, সরকারের প্রতিটি কাজ ও আচরণের ওপর মানুষ আগের চেয়েও বেশি নজর রাখছে। কারণ জনগণ ভোট দিয়ে এই সরকারকে ক্ষমতায় এনেছে। এই সরকার পথচ্যুত হলে ভোটাররা নিজেদের দায়ী ভাববেন। কষ্ট পাবেন, মর্মাহত হবেন। সরকার জনসমর্থন হারাবে।
লেখক : সিনিয়র সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত