সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে গত মঙ্গলবার অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটেছে। পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের ঘোষিত রায় নিয়ে স্বয়ং প্রধান বিচারপতির সাথে বচসায় জড়িয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও নোয়াখালী-১ আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন। বাগি¦তণ্ডার একপর্যায়ে আদালত মুলতবি করে পুরো বেঞ্চসহ এজলাস ছাড়েন প্রধান বিচারপতি। ঘটনার পর আর আদালত বসেননি।

এই ঘটনা দেশের আইন-আদালতের ইতিহাসে বিরলতম। ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন পরে দাবি করেন, আইনজীবীদের প্রতিনিধি হিসেবে তাদের স্বার্থের কথা বলা ‘তার দায়িত্ব’। সেই দায়িত্ব থেকেই তিনি জরিমানা মওকুফের জন্য প্রধান বিচারপতিকে অনুরোধ করেছিলেন।

কিন্তু গণমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনার পুরো বিবরণ থেকে স্পষ্ট, ব্যারিস্টার খোকন পেশাদারি সততার পরিচয় দিতে পারেননি। অসততা ও জালিয়াতির আশ্রয় নেয়ার কারণে জরিমানার রায় পুনর্বিবেচনার আর্জি জানানো পেশাদারিত্ব বা সততা— কোনোটিরই পরিচয় নয়। আইনের লোকেরাই সেটি ভালো বলতে পারবেন। যেমনটি বলেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল। তিনি জানান, একই বিষয়ে অন্তত পাঁচবার রিট আবেদন দায়ের এবং আগের মামলায় হেরে যাওয়ার তথ্য গোপনের অভিযোগে অর্থাৎ আদালতের সাথে ‘প্রতারণা এবং গুরুতর জালিয়াতির’ বিষয়টি বিবেচনা করেই আদেশ দেয়া হয়। সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার খোকনের কাছে এমন বক্তব্য ‘অপ্রত্যাশিত’ ছিল।

অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক জানান, রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত সংশ্লিষ্ট নারী আইনজীবী কোনো ‘উচ্চবাচ্য না করে’ আদালতের আদেশ মেনে নেন।

কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো— ব্যারিস্টার খোকন নিজে দণ্ডিত নারী আইনজীবীর সিনিয়র হিসেবে নথিভুক্ত। এখানে স্পষ্টতই স্বার্থের বিষয় জড়িত। আইনজীবীদের স্বার্থ রক্ষার কথা বলে ব্যারিস্টার খোকন নিজের জুনিয়রকে অসততার দায় থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন।

এই ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত। শুধু আইন-আদালত বা আইন পেশার লোকদের জন্য নয়, এ ঘটনা সারা দেশের জন্যও একটি মন্দ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। এমনকি দল হিসেবে বিএনপির ওপরও এর দায় বর্তাবে, কারণ খোকন ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচিত এমপি। স্বৈরশাসনের দিনগুলোতে আদালতের ওপর রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের সেই সংস্কৃতি ফিরে আসুক, এটি কেউ চায় না।

বিচারাঙ্গনের বিজ্ঞ বিচারক ও আইনজীবীদের কাছে জাতির প্রত্যাশা অনেক বড়। কিন্তু অন্য সবার মতোই আইন-আদালতে কর্মরত ব্যক্তিরাও সবসময় মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারেন না।

সম্প্রতি প্রধান বিচারপতি নিজেই দেশের আইনজীবীদের মধ্যে মামলার প্রতি যথেষ্ট দায়বদ্ধতা ও পেশাগত নিষ্ঠার অভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। গত ২০ জুলাই সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির এক অনুষ্ঠানে তিনি আইনজীবীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা যেন কেবল সেই পরিমাণ মামলা গ্রহণ করবেন, যতটা মামলা নিলে প্রতিটির প্রতি যথাযথ সময়, প্রস্তুতি ও মনোযোগ দিতে পারবেন। কারণ বাদির প্রতি সুবিচার করা আপনার লিগ্যাল, এথিক্যাল ও মরাল দায়িত্ব।’

বিচারাঙ্গনে শৃঙ্খলা ও সততায় ঘাটতি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। প্রধান বিচারপতি এক্ষেত্রে কঠোর হবেন এবং তার নেতৃত্বে বিচার বিভাগের মর্যাদা আরো সমুন্নত হবে— এটিই প্রত্যাশিত। একই সাথে আইনজীবীরাও পেশার মর্যাদা রক্ষায় সবসময় সচেষ্ট থাকবেন— এমনটিই দেশবাসী আশা করেন।