প্রতিবেশী দেশ কতভাবে শত্রুতা করতে পারে তারই টেক্সটবুক উদাহরণ হলো ভারত। সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্যে বাধা, মাদক পাচার, উজানে পানি আটকে দেয়ার পর দেশটি এখন দণ্ডিত শেখ হাসিনাকে নতুন টুল হিসেবে যুক্ত করেছে তালিকায়। শুরু করেছে ইঁদুর-বিড়াল খেলা। এক শ্রেণীর মিডিয়াকে দিয়ে নানা খবর ও হাসিনার সাক্ষাৎকার ছাপানোর সুযোগ তৈরি করে প্রতিনিয়ত বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার খেলায় মেতে উঠেছে। কিছু গণমাধ্যমও এই গণশত্রুকে তার বিষ উগড়ে দেয়ার জন্য নিজেদের জমিন ব্যবহারের উন্মুক্ত সুযোগ করে দিচ্ছে। এর মধ্যে সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের দিল্লি শাখা অন্যতম। গত জুলাই মাসে রয়টার্স তার সাক্ষাৎকার নিয়ে ডিসেম্বরে হাসিনার দেশের ফেরার উসকানিমূলক খবর প্রকাশ করে। এরপর সারাবিশ্ব থেকে আওয়ামী প্রচারণা মেশিন সক্রিয় হয়ে ওঠে। সর্বশেষ ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ওয়ালে আরেকটি সাক্ষাৎকার দিয়ে নাটকীয়ভাবে তার উত্তরাধিকার ঘোষণা করেছেন শেখ হাসিনা। বাস্তবতা বিবেচনায় তার এসব বক্তব্য পাগলের প্রলাপ হলেও দেশী-বিদেশী বিভিন্ন সংবাদ প্রতিষ্ঠান উৎসাহের সাথে তা ফলাও করে প্রচার করছে। এগুলোকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে বাঁচিয়ে রাখার দাওয়াই মনে করছে তারা।

ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়ার পর সেখানে তার মর্যাদা কী, কেউ জানে না। ভারত সরকার তাকে অতিথি হিসেবে স্বীকার করে মাঝে মধ্যে বিবৃতি দিলেও বিগত দুই বছরে একবারও তাকে প্রকাশ্যে আসতে দেখা যায়নি। কিছুদিন পর পর তিনি ভুতুড়ে অডিওবার্তা ছাড়েন। সন্দেহ সৃষ্টি হচ্ছে ওই অডিওবার্তা আসলে হাসিনার নিজের কি না। তবে হত্যা, খুন, জ্বালাও-পোড়াওয়ের হুমকি-ধমকির যে টোন হাসিনা নিয়মিত দিতেন তার সাথে সেগুলো মিলে যায়।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে লুকিয়ে থাকা আওয়ামী লীগাররা আশা করেছিলেন, দিল্লির ফরেন করেসপনডেন্টস ক্লাবে ৫ আগস্ট প্রকাশ্যে হাজির হয়ে তিনি সত্যিই স্বাধীন এবং ভারত সরকারের অতিথির মর্যাদায় রয়েছেন তার প্রমাণ দেবেন। সেটি না হওয়ায় আওয়ামী শিবিরে হতাশা ছড়িয়ে যাওয়ার পাশাপাশি দিল্লিতে তার আসল মর্যাদা নিয়ে পুরনো সন্দেহ আরো জোরালো হয়েছে। ২৯ আগস্ট দিল্লির ওই একই ভেনুতে আরেকটি অনুষ্ঠান আয়োজন করতে গেলে পুলিশ আওয়ামী লীগকে অনুমতি দেয়নি। এতে বোঝা গেল, হাসিনার ভার বহন করার মতো শক্তি আর অবশিষ্ট নেই নরেন্দ্র মোদি সরকারের। আওয়ামী লীগ ও হাসিনাকে তারা আর প্রকাশ্যে উসকানিমূলক কার্যক্রম চালাতে দিতে পারছে না।

পলাতক হাসিনা বিস্ময় সৃষ্টি করেন বাংলাদেশের আসার ঘোষণা দিয়ে। যেখানে বাংলাদেশের আদালতে তিনি ফেরারি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে খুঁজে পাচ্ছে না। আদালত তার খোঁজ চেয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েছে। দিল্লিতে পালিয়ে যাওয়ার দেড় মাসের মধ্যে ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর তার বিরুদ্ধে দেশে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। তিনি কোনো সাড়া না দিয়ে পালিয়ে রয়েছেন। দুই বছর ধরে তার অনুপস্থিতিতে বিচার কার্যক্রম চলেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন। বাংলাদেশ সরকার দিল্লির কাছে তার প্রত্যর্পণ চেয়ে তার পালিয়ে যাওয়ার শুরু থেকে আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক দুই পর্যায়ে দাবি জানিয়ে আসছে। দিল্লি এ ব্যাপারে সাড়া দিচ্ছে না।

পলাতক অবস্থা থেকে রয়টার্সে সাক্ষাৎকার দিয়ে হাসিনা জানাচ্ছেন, আগামী ডিসেম্বরে যেকোনো মূল্যে দেশে ফিরবেন। এ ধরনের হুমকি জগতে আর দ্বিতীয়টি দেখা যায়নি। যিনি জনরোষে পালিয়ে গেছেন, সরকার তার দণ্ড কার্যকর করার জন্য ধরে আনতে চাইছে, এমনকি তাকে বিচারিক প্রক্রিয়ায় সব ধরনের নিরাপত্তা দেয়ার আশ্বাসও দেয়া হয়েছে। তাতে তিনি সাড়া দিচ্ছেন না। এ অবস্থায় যেকোনো মূল্যে দেশে ফেরার হুমকির অর্থ বোঝা যায় না। উনি তাহলে দেশ ছেড়ে পালালেন কেন? তার চেয়ে বড় বিষয়, তিনি যদি সরকারের নিরাপত্তা না নিয়ে দেশে ঢোকেন, নির্ঘাত জনরোষে প্রাণ হারাবেন। যে সীমানা দিয়েই তিনি ঢোকার চেষ্টা করেন না কেন। গুম, খুন ও আয়নাঘরে বন্দিত্বের শিকার ভুক্তভোগীদের লাখ লাখ স্বজন ও দেশবাসী তাকে পেলে কী অবস্থা হতে পারে কল্পনা করাও দুরূহ।

হাসিনাকে ফেরত না দেয়ায় ভারত সরকারের সাথে সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। এর জেরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফরের আগ্রহ হারিয়েছেন। মোদি সরকারের পক্ষ থেকে বারবার চেষ্টা করেও তারেক রহমানকে রাজি করানো যায়নি। আগামীতে তার দিল্লি সফর হাসিনার প্রত্যর্পণে প্রভাব ফেলবে। হাসিনা নিজে বাংলাদেশে ফিরে এ সমস্যার সমাধান করে ফেলতে পারতেন। জুলাইতে রয়টার্সের কাছে সাক্ষাৎকারে ঘোষণা না দিয়ে তিনি সরাসরি দেশে চলে এলে দিল্লিও বেঁচে যেত। তারেক রহমানের বহুল প্রত্যাশিত সফরে বাধা দূর হতো।

হাসিনার রাজনৈতিক জীবন মিথ্যা, প্রতারণা আর শঠতায় ঠাসা। সাধারণত তিনি যা বলেন তা করেন না; আর যা করেন তা বলেন না। দেশে ফেরার তার অদ্ভুত হুমকি তেমনি একটি রাজনৈতিক চাল ছাড়া কিছু নয়। ৫ আগস্ট পালিয়ে যাওয়ার অল্প কয়েক দিন আগে তিনি ব্যবসায়ীদের সাথে এক বৈঠকে জোরকণ্ঠে বলেছিলেন, ‘শেখ হাসিনা পালায় না’। দিল্লি পালিয়ে যাওয়ার যেসব বিবরণ এখন ফাঁস হচ্ছে তাতে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, ভারতে পালানোর আয়োজন তিনি নিজেই করেছিলেন। না পালানোর যে দাবি ব্যবসায়ীদের সভায় তিনি করছিলেন, তারও কারণ আছে। ওই সময় জোর গুঞ্জন উঠেছিল, কোটা আন্দোলনের মুখে ভয়ে এক রাতে পালিয়ে অন্য কোনো দেশে চলে গিয়েছিলেন। কেউ কেউ বিমানের ফ্লাইট রেকর্ডও হাজির করেন ওই সময়। সারা দেশে তার পালিয়ে যাওয়ার গুজব ছড়িয়েছিল। সে জন্য তিনি জোরগলায় ওই ঘোষণা দিয়েছিলেন। যদিও প্রতিকূল অবস্থায় আরো কয়েকবার তার দেশ থেকে পালানোর রেকর্ড আছে। যখনই পরিস্থিতির অবনতি দেখতেন, তিনি বিদেশে চলে যেতেন। সেই হাসিনা মৃত্যুদণ্ড মাথায় নিয়ে দেশে ফিরবেন এটি তাই পাগলের প্রলাপ ছাড়া কিছু নয়।

জুলাই বাংলাদেশকে বদলে দিয়েছে। হাসিনা এখন বাংলাদেশের একজন শ্রমিক দিনমজুর কিংবা ফকিরের চেয়েও দুর্বল। তাদের ওপর কোনো হামলা কিংবা বঞ্চনা হলে প্রতিবাদ করার লোক আছে, হাসিনার জন্য রাস্তায় দাঁড়ানোর কেউ নেই। বিগত দুই বছরে দেশের কোথাও হাসিনার সমর্থনে একটি সফল মিছিলও কেউ করতে পারেনি। বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাস ও নাশকতার কিছু ঘটনা তারা ঘটিয়েছে।

হাসিনার সামনে এখন শুধু গুম, খুন, দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও গণতন্ত্র ধ্বংসের দায়ে বিচার অপেক্ষা করছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার পাশাপাশি তার সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দিয়েছেন। ভুক্তভোগী ও শহীদ পরিবারের ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে হসিনার ওই সম্পদ দিয়ে। ইতিহাসের পাতা থেকে তিনি সমূলে মুছে যাওয়ার তালিকায় রয়েছেন। তার উত্তরাধিকারীদেরও একই পরিণতির লক্ষণ প্রকাশিত হয়েছে। তার একমাত্র পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা রয়েছে। প্লট জালিয়াতির মামলায় পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড পেয়েছেন। আদালতের কাছে তিনি পলাতক। আয়ের কোনো উৎসা না থাকার পরও তিনি আমেরিকায় হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক। এই সম্পদের উৎস খোঁজা শুরু হলে তিনি বিপদে পড়বেন।

একমাত্র কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলও একই ধরনের মামলায় পাঁচ বছরের দণ্ড পেয়েছেন। পলাতক রয়েছেন। দুর্নীতি করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিচালক হয়েছেন। এ কাজে দেশের প্রভাবকে অন্যায়ভাবে কাজে লাগিয়েছেন। সংস্থার পরিচালক হওয়ার জন্য সনদ জালিয়াতি করে দুর্নাম কুড়িয়েছেন। ওয়ালের সাথে সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা নিজের সন্তান এবং দলের বিশিষ্ট কারো নাম উল্লেখ না করে তার উত্তরাধিকারী ঘোষণা করেছেন বয়সের ভারে ন্যুব্জ শেখ সেলিমকে। সেলিমের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মামলা রয়েছে। ক্ষমতায় থাকার সময় নানা অশালীন কর্মকাণ্ড করে ব্যাপক বিতর্কিত হয়েছেন তিনি। পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের ঠিকানা জানা গেলেও হাসিনার এই উত্তরসূরি ৫ আগস্টের পর কোথায় পালিয়েছেন, তার কোনো খোঁজ মিলছে না।

হাসিনার উত্তরসূরি মনোনয়নের বিষয়টি নিছকই রাজনৈতিক চালবাজি। তিনি কোনোভাবে জয় ও পুতুলকে উত্তরসূরি করতে পারছেন না। তার সন্তানরা এতটাই বিতর্কিত যে, রাজনৈতিক নেতা হওয়ার দৌড়ে তারা ইতোমধ্যে ছিটকে পড়েছেন। তিনি এমন একসময় উত্তরাধিকার ঘোষণা করলেন, যখন এই আশঙ্কা রয়েছে যে, তিনি আর মিডিয়ায় সামনে আসতে পারবেন না। ভারত সরকার বাধ্য হবে তার মুখে তালা দিতে। তাই আগেভাগে জানিয়ে রাখা এই কারণে যে, এই সুযোগে ভারত যেন কোনো একজনকে আওয়ামী লীগের নতুন নেতা হিসেবে সামনে ঠেলে দিতে না পারে। এমন হলে অচিরেই দলটির নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হতে পারে হাসিনার। দলীয় নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে থাকা মানে একটা লাভজনক ব্যবসা অধিকারে থাকা। আশির কোটায় থাকা সেলিমকে তাই কি নতুন নেতা হিসেবে সামনে ঠেলে দেয়া হলো?

লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত

jjshim146@yahoo.com