বিশ্বের ইতিহাস মূলত যুদ্ধের নয়; ক্ষমতার কেন্দ্র বদলের ইতিহাস। একসময় রোমের পতাকা ইউরোপ ও ভূমধ্যসাগরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে এক ছাতার নিচে রেখেছিল। পরে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যগুলো পৃথিবীর মানচিত্র নতুন করে এঁকেছে। উনিশ শতকে সমুদ্রের ওপর ব্রিটিশ নৌশক্তি ও শিল্পবিপ্লবের সম্মিলিত সক্ষমতা জন্ম দিয়েছিল প্যাক্স ব্রিটানিকানার। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র যখন অর্থনীতি, সামরিক শক্তি, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে নিজের নেতৃত্বের অধীনে সংগঠিত করল, তখন সূচনা হলো প্যাক্স আমেরিকানার।

প্রশ্ন হলো— এটি কি অবসানের দিকে? নাকি আমরা এমন এক নতুন যুগের সূচনায় দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে আর কোনো একক রাষ্ট্র বিশ্বব্যবস্থার ওপর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক আলোচনায় আরেকটি শব্দ মাঝে মধ্যে উঠে আসছে, প্যাক্স জুডাইকা।

শব্দটি আকর্ষণীয়; কিন্তু একই সাথে কিছুটা অস্পষ্ট। কারণ প্যাক্স ব্রিটানিকা থেকে প্যাক্স আমেরিকানা ইতিহাসে সুনির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণযোগ্য ক্ষমতার কাঠামোকে নির্দেশ করে। বিপরীতে প্যাক্স জুডাইকা কোনো স্বীকৃত বা প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা নয়। এটি মূলত এমন একটি রাজনৈতিক-ভূরাজনৈতিক ধারণা, যার মাধ্যমে কেউ কেউ ইসরাইলি সামরিক শক্তি, প্রযুক্তিগত ঔৎকর্ষ, গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তার গভীর কৌশলগত সম্পর্কের ভিত্তিতে মধ্যপ্রাচ্যে গড়ে ওঠা নতুন শক্তির ভারসাম্যের ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন।

তাই আসল প্রশ্ন— ‘প্যাক্স জুডাইকা আসছে কি না’ তা নয়। আসল প্রশ্ন হলো— মধ্যপ্রাচ্যে কি এমন একটি নতুন নিরাপত্তা ও ক্ষমতার কাঠামো তৈরি হচ্ছে, যার কেন্দ্রে থাকবে ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের আঞ্চলিক মিত্ররা? যদি তা-ই হয়, তবে চীন, ইরান, সৌদি আরব, তুরস্ক এবং ভারতের অবস্থান কোথায়? বাংলাদেশের জন্যইবা এর তাৎপর্য কী?

প্যাক্স ব্রিটানিকা : যখন সমুদ্র ছিল সাম্রাজ্যের সীমানা

১৮১৫ সালে ওয়াটারলুর যুদ্ধের পর নেপোলিয়ন অধ্যায়ের অবসান ইউরোপে নতুন রাজনৈতিক ভারসাম্য তৈরি করে। সেই সময় ব্রিটেন শিল্পবিপ্লবের শক্তিতে ভর করে বিশ্বের প্রধান অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে উঠছিল।

তবে ব্রিটিশ আধিপত্যের প্রধান ভিত্তি ছিল সমুদ্র। রয়্যাল নেভি বিশ্বের প্রধান সামরিক ও বাণিজ্যিক সামুদ্রিক পথগুলোতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিল। ভারত ছিল সাম্রাজ্যের ‘মুকুটের রত্ন’। সুয়েজ খাল, ভারত মহাসাগর, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া— সব মিলিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল বৈশ্বিক বাণিজ্যের সুবিশাল জাল। পাউন্ড স্টার্লিং হয়ে উঠেছিল আন্তর্জাতিক অর্থনীতির প্রধান চালিকা। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের এই বৈশ্বিক আধিপত্যকেই বলা হয় প্যাক্স ব্রিটানিকা।

তবে ‘প্যাক্স’ বা শান্তি শব্দটির পেছনে রয়েছে এক ঐতিহাসিক বাস্তবতা। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মূল ভূখণ্ডে আপেক্ষিক শান্তি বিরাজ করলেও উপনিবেশগুলোতে চলেছে শোষণ, দুর্ভিক্ষ, দমন-পীড়ন ও রক্তক্ষয়ী সঙ্ঘাত। অর্থাৎ, এক পরাশক্তির ‘শান্তি’ প্রায়শই অন্য জাতির জন্য পরাধীনতা ও নিপীড়নের বাস্তবতা তৈরি করে।

এই শিক্ষা পরবর্তী প্যাক্স আমেরিকানা বোঝার ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক। কারণ, কোনো বৈশ্বিক আধিপত্যই নিরপেক্ষ নয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং আমেরিকার শতাব্দী

১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন শেষ হয়, ইউরোপ তখন ধ্বংসস্তূপ। ব্রিটেন যুদ্ধজয়ী হলেও অর্থনীতি ও অবকাঠামোগতভাবে নিঃস্ব। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তখন বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি শিল্প উৎপাদন ও অর্থনৈতিক শক্তির অধিকারী।

ওয়াশিংটন কেবল সামরিক বিজয় অর্জনেই ক্ষান্ত হয়নি; তারা একটি সুনির্দিষ্ট বৈশ্বিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। ব্রেটন ওডস সম্মেলনের মাধ্যমে মার্কিন ডলারকে আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থার কেন্দ্রে স্থান দেয়া হলো। আত্মপ্রকাশ করল আইএমএফ বিশ্বব্যাংক ও গ্যাট (পরবর্তীতে ডব্লিউটিও)। এর মাধ্যমে গড়ে তোলা হলো বিশ্ববাণিজ্যের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি। পাশাপাশি গঠিত হলো ন্যাটো এবং এশিয়া ও ইউরোপজুড়ে গড়ে তোলা হলো মার্কিন সামরিক ঘাঁটির দীর্ঘ শৃঙ্খল।

একটি রাষ্ট্রের নিজস্ব জাতীয় শক্তিকে বৈশ্বিক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সাথে যুক্ত করার এই রূপরেখাই ছিল প্যাক্স আমেরিকানার আসল চালিকাশক্তি। এটি কেবল মার্কিন সামরিক প্রভাব ছিল না; এটি ছিল— ডলার+সামরিক শক্তি+প্রযুক্তিগত একচ্ছত্রতা+কৌশলগত জোট+আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান+উন্মুক্ত বাজার।

সোভিয়েতের পতনের পর এই ব্যবস্থার সামনে আর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। নব্বই-পরবর্তী বিশ্ব তাই সাময়িকভাবে হয়ে উঠেছিল একমেরুকেন্দ্রিক। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, একমেরু বিশ্বব্যবস্থা কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

চীন : আমেরিকান শতাব্দীর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা

চীনের উত্থান প্যাক্স আমেরিকানার অস্তিত্বের সামনে সবচেয়ে বড় এবং দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ। তবে চীনের প্রভাব বিস্তারের কৌশল সোভিয়েত ইউনিয়নের থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন। সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল মূলত একটি সামরিক ও আদর্শিক প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু চীন একই সাথে অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী।

বিশ্বের সার্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল, শিল্প উৎপাদন, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর, অবকাঠামো এবং উদীয়মান ডিজিটাল প্রযুক্তিতে চীনের অংশীদারত্ব অপ্রতিরোধ্য গতিতে বাড়ছে। বেল্ট ও রুট ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই)-মাধ্যমে চীন কেবল রাস্তা বা বন্দর তৈরি করছে না; বরং অর্থনৈতিক আন্তঃসংযোগের এক দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। আফ্রিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্য এবং মধ্য এশিয়া থেকে দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত চীনের কৌশল হলো— অর্থনৈতিক পরনির্ভরতা তৈরির মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রভাব নিশ্চিত করা।

চীনের এই মডেল মার্কিন নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যবস্থার বিকল্প তৈরি করছে। তবে চীন এখনো যুক্তরাষ্ট্রের মতো সামরিক জোটব্যবস্থা তৈরি করতে পারেনি। ফলে প্রশ্ন দাঁড়ায়, চীন কি প্যাক্স আমেরিকানাকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপিত করবে; নাকি উভয় শক্তি একটি বহুমেরু ব্যবস্থায় সহাবস্থান করবে?

মধ্যপ্রাচ্য : নতুন বিশ্বব্যবস্থার পরীক্ষাগার

বিশ্বের ক্ষমতার পালাবদল সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে। মধ্যপ্রাচ্য কার্যত ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার মিলনস্থল। বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানিসম্পদ, বাণিজ্যিক নৌপথ, ধর্মীয়-সভ্যতাগত কেন্দ্র। গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবস্থানগুলোও এখানেই।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রই ছিল মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোর মূল স্থপতি। সেই একক নিয়ন্ত্রণ এখন ভেঙে পড়ছে : সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঐতিহাসিক সম্পর্ক বজায় রেখেই চীনের সাথে কৌশলগত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব জোরদার করছে।

ইরান একটি শক্তিশালী কৌশলগত অক্ষে যুক্ত হয়েছে চীন ও রাশিয়ার সাথে। তুরস্ক নিজেকে ন্যাটোর গণ্ডির বাইরে এনে স্বাধীন কৌশলগত কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছে। ইসরাইল সামরিক প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং গোয়েন্দা সক্ষমতায় আঞ্চলিক পরাশক্তিতে রূপ নিয়েছে।

একই সময়ে এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বজায় থাকলেও তার একচ্ছত্র প্রভাব হ্রাস পাচ্ছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্য আজ আর কোনো একক শক্তির নিয়ন্ত্রণে নেই, এটি এখন বহুশক্তির আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার এক জটিল মঞ্চ।

ইসরাইল : ছোট রাষ্ট্র, বড় শক্তি

ভৌগোলিক দিক থেকে ইসরাইল ক্ষুদ্র এবং জনসংখ্যায় নগণ্য। তবে রাষ্ট্রীয় ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় দেশটি এক বিশেষ অবস্থানে রয়েছে, যা ইসরাইলকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম নির্ণায়ক শক্তিতে পরিণত করেছে। এর সাথে যুক্ত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সুদৃঢ় সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতা।

এই ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক ভিত্তির ওপর নির্ভর করেই প্যাক্স জুডাইকা ধারণার জন্ম। ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোয় অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। এটিকে ‘বিশ্ব নিয়ন্ত্রণের ষড়যন্ত্র’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে কোনো কোনো ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণে। এই বিশ্লেষণের কেন্দ্রে রয়েছে ইসরাইলের সুনির্দিষ্ট পররাষ্ট্রনীতি, সামরিক সক্ষমতা, ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এর মতো আঞ্চলিক জোট এবং যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক কৌশলের সাথে এর মিথস্ক্রিয়া।

ইরানের প্রতিরোধ, সৌদির কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীন খেলোয়াড় তুরস্ক
ইসরাইলকেন্দ্রিক সম্ভাব্য আঞ্চলিক মেরুকরণের সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ও বড় বাধা ইরান। ইরানের শক্তি ইসরাইলের মতো প্রযুক্তি বা আকাশসীমার আধিপত্যে নিহিত নয়। ইরানের শক্তি তার বিপুল ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন প্রযুক্তি, বৈচিত্র্যময় ভৌগোলিক কৌশলগত অবস্থান এবং আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্কে।

বহু দশক ধরে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে একটি সুসংগঠিত ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ গড়ে তুলেছে, যা লেবানন, সিরিয়া, ইরাক ও ইয়েমেন পর্যন্ত বিস্তৃত। ফলে ইসরাইল-ইরান সঙ্ঘাত কোনো দ্বিপক্ষীয় সীমান্ত সঙ্ঘাত নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের মূল প্রাধান্য অর্জনের দ্বৈরথ। ইসরাইল-মার্কিন অক্ষ যদি আঞ্চলিক ব্যবস্থা পুনর্গঠন করতে চায়, ইরান তা প্রতিহত করতে সচেষ্ট থাকবে। এই সঙ্ঘাতের রেশ বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তায় সরাসরি আঘাত হানতে সক্ষম।

সৌদি আরবের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির সমীকরণকে আরো বহুমুখী করে তুলেছে। রিয়াদ ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বলয়ে থাকলেও, বর্তমান সৌদি নেতৃত্ব অনুধাবন করেছে, একটিমাত্র পরাশক্তির ওপর পুরো দেশের ভবিষ্যৎ বাজি ধরা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

তাই দেশটি এখন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া এবং ইউরোপের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক পরিচালনা করছে। চীনের মধ্যস্থতায় ইরানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন কিংবা বিআরআই এ যুক্ত হওয়া এবং সবশেষে মক্কা জোট— এ সবই সৌদি আরবের ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ অর্জনের অংশ।

তুরস্কের অবস্থান কৌশলগতভাবে বেশ অনন্য। দেশটি ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হওয়া সত্ত্বেও পশ্চিমাদের সম্পূর্ণ অনুগামী নয়। আঙ্কারা নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলেছে এবং রাশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ককেসাস, মধ্য এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকায় স্বাধীনভাবে প্রভাব বিস্তার করছে। ইউরোপ ও এশিয়ার মিলনস্থলে অবস্থিত হওয়ার কারণে কৃষ্ণসাগর ও ভূমধ্যসাগরের জলসীমায় তুরস্কের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্য পুরোপুরি বহুকেন্দ্রিক রূপ নিলে, সেখানে তুরস্ক শক্তিশালী ও স্বাধীন ক্ষমতার মেরু হিসেবে বিরাজ করবে।

প্যাক্স জুডাইকা নাকি প্যাক্স মাল্টিপোলারিস
আলোচনার পুরো বিষয়টি বাস্তবসম্মত বৈশ্বিক কাঠামোতে আনার চেষ্টা করা যাক। বিশ্ব কি সত্যিই প্যাক্স আমেরিকানা থেকে প্যাক্স জুডাইকার দিকে ধাবিত হচ্ছে? উত্তর— চেষ্টা হচ্ছে; সম্ভাবনা— না।

আমরা যা দেখছি তা প্যাক্স আমেরিকানার সম্পূর্ণ বিলুপ্তি নয়; বরং তার একচ্ছত্র আধিপত্যের ক্ষয়প্রক্রিয়া। যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের বৃহত্তম সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি এবং মার্কিন ডলার আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থার মূল ভিত্তি। তবে তার পাশাপাশি চীন তৈরি করেছে বিকল্প অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা। রাশিয়া সামরিক ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে প্রভাব বজায় রেখেছে। ভারত বর্ধনশীল অর্থনৈতিক কেন্দ্র হচ্ছে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও ইরান আঞ্চলিক স্তরে স্বতন্ত্র মেরু হিসেবে কাজ করছে।

অতএব, বিশ্ব কোনো একক প্যাক্সের অধীনে যাচ্ছে না; বরং উদ্ভব ঘটছে প্যাক্স মাল্টিপোলারিস বা ‘বহুমেরু ব্যবস্থার’-যেখানে কোনো একক শক্তির নয়; বরং বৈশ্বিক নিয়ম ও ভারসাম্য নির্ধারিত হবে ধারাবাহিক দরকষাকষি, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা, সাময়িক জোট এবং কৌশলগত দ্বৈরথের মাধ্যমে।

বিশ্বব্যবস্থার এই পরিবর্তনের সাথে শক্তির সংজ্ঞাও বদলে গেছে। উনিশ বা বিশ শতকে সাম্রাজ্যের শক্তি মাপা হতো সৈন্যসংখ্যা, নৌবহর ও কামান দিয়ে। একবিংশ শতাব্দীতে শক্তির পরিমাপ করা হয় : সেমিকন্ডাক্টর চিপ ও উন্নত অ্যালগরিদমে; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ে; সাইবার ও উপগ্রহ প্রযুক্তিগত প্রতিরক্ষায় এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল ও জ্বালানি নিয়ন্ত্রণে।

যে রাষ্ট্র বিশ্ব সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করবে, সে বৈশ্বিক অর্থনীতির মোড় ঘোরাতে পারবে। যে রাষ্ট্র কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় এগিয়ে থাকবে, তার সামরিক প্রাধান্য নিশ্চিত হবে। অর্থাৎ, ভবিষ্যতের প্যাক্স কোনো একক সামরিক শক্তিভিত্তিক হবে না— হবে প্রযুক্তিগত, আর্থিক, সামুদ্রিক এবং ডাটা সুরক্ষার জটিল মিশ্রণ।

বাংলাদেশের অবস্থান : কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন
আন্তর্জাতিক রাজনীতির এই বহুকেন্দ্রিক ও জটিল মোড়ে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব কোথায়? বাংলাদেশ কোনো সামরিক পরাশক্তি নয়, তবে তার ভূগোল তাকে দক্ষিণ এশিয়া ও বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে বসিয়েছে। বঙ্গোপসাগরের শীর্ষে অবস্থিত হওয়ায় বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে যোগাযোগের প্রাকৃতিক সেতু।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বাস্তবতার দিকে তাকালে দেখা যায়— তৈরী পোশাক রফতানি ও বাণিজ্যের জন্য পশ্চিমা বিশ্ব (যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ) অপরিহার্য। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও প্রবাসী শ্রমবাজারের জন্য মধ্যপ্রাচ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অবকাঠামো উন্নয়ন, অর্থায়ন ও বাণিজ্যের জন্য চীন প্রধান অংশীদার। ভৌগোলিক অখণ্ডতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বাণিজ্যে ভারত নিকটতম প্রতিবেশী। দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সহায়তায় জাপান বিশ্বস্ত মিত্র।

এই বহুমুখী কাঠামোর অর্থ হলো— বাংলাদেশের পক্ষে কোনো একক ‘ক্যাম্প’ বা ব্লকে যোগ দেয়া মুশকিল। বাংলাদেশকে বেছে নিতে হবে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন। ওয়াশিংটন, বেইজিং, নয়াদিল্লি, টোকিও, রিয়াদ ও আঙ্কারা, সবার সাথেই জাতীয় স্বার্থভিত্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখাই একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতা।

বহুমেরু বিশ্বে বাংলাদেশ নিতে পারে পাঁচটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল : ১. একক শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা পরিহার : অর্থনীতি, মেগা প্রজেক্টের অর্থায়ন, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কিংবা জ্বালানির উৎস বহুমুখী করতে হবে।

২. বঙ্গোপসাগরকে কৌশলগত সম্পদে রূপান্তর : গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার করা, ‘ব্লু ইকোনমি’ বা সুনীল অর্থনীতির পূর্ণ ব্যবহার এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যে শক্তিশালী অবস্থান তৈরিকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ করতে হবে।

৩. মধ্যপ্রাচ্য নীতির আধুনিকীকরণ : প্রবাসী শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষা এবং জ্বালানি নিরাপত্তার পাশাপাশি সৌদি আরব, তুরস্ক, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে সামরিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি বিনিময়ের মতো বহুমাত্রিক সম্পর্কের দিকে এগোতে হবে।

৪. চীন-ভারত দ্বন্দ্বে পেশাদার ভারসাম্য : এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে সংবেদনশীল কূটনৈতিক পরীক্ষা। চীন ও ভারত— উভয় দেশই ঢাকার ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ। একটি পক্ষকে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে অন্যকে দূরে ঠেলে দেয়া যাবে না।

৫. নীতিভিত্তিক স্বতন্ত্র অবস্থান : ইসরাইল-ফিলিস্তিন সঙ্ঘাত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কিংবা যুক্তরাষ্ট্র-চীন ভূরাজনৈতিক দ্বৈরথে বাংলাদেশের অবস্থান নির্ধারণ হওয়া উচিত আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসঙ্ঘ সনদ, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে।

ইতিহাসের চাকা নতুন করে ঘুরছে। এই বহুমেরু যুগে বাংলাদেশ কি পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার বলি হবে, নাকি নিজের ভূগোল ও কৌশলগত সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে উদীয়মান বৈশ্বিক ব্যবস্থার সুবিধা গ্রহণ করবে? এই প্রশ্নের উত্তরের ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক মর্যাদা।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত

mrkmmb@gmail.com