দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যেভাবে বাড়ছে, সেভাবে মানুষজনের আয় বাড়ছে না, এটি এখন সাধারণের সবচেয়ে চরম বাস্তবতা। সরকারি ও বেসরকারি খাতে আয় বাড়ার সাথে যদি পণ্যের দামের সামঞ্জস্য না থাকে, তাহলে সমাজে বৈষম্য বাড়বে। মধ্যবিত্ত শ্রেণী ধীরে ধীরে নিম্ন আয়ের কাতারে নেমে যাবে, যা সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং আয়ের স্থবিরতা একসাথে চলতে থাকলে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা দ্রুত কমে যায়। এতে শুধু ভোগ কমে না, সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে মানুষের গড় আয় যেখানে ৮ শতাংশের আশপাশে বেড়েছে, সেখানে একই সময়ে দ্রব্যমূল্য বেড়েছে ৯ থেকে ১১ শতাংশ পর্যন্ত। ফলে আয় বাড়লেও মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমছে, বাড়ছে সংসার চালানোর চাপ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যমতে, দেশে মূল্যস্ফীতির হার দীর্ঘ দিন ধরে সহনীয় সীমার বাইরে অবস্থান করছে। বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ওপর সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি করছে। লক্ষণীয়, প্রায় সব নিত্যপণ্যের দাম গত এক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। রমজান মাস সামনে রেখে অনেক পণ্যের দাম নতুন করে বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, গ্যাস-বিদ্যুৎ, বাড়িভাড়া ও যাতায়াত খরচÑ সবকিছুর দাম ঊর্ধ্বমুখী। অথচ বেসরকারি খাতের বেশির ভাগ কর্মজীবীর বেতন বছরের পর বছর একই জায়গায় আটকে আছে। এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাপন দিন দিন অসহনীয় হয়ে উঠছে।
বিবিএসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ দিন ধরে ৯ শতাংশের উপরে অবস্থান করছে। এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরো বেশি। অনেকসময় তা ১২-১৪ শতাংশ ছাড়িয়েছে; কিন্তু বেসরকারি খাতে কর্মরত বেশির ভাগ মানুষের বেতন ও মজুরি বৃদ্ধি গড়ে ৭ থেকে ৮ শতাংশের বেশি হয়নি। এ দিকে আয় বাড়ার হার যদি মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম হয়, তাহলে বাস্তবে মানুষের আয় বাড়ে না; বরং কমে যায়। এটিকে বলা হয় ‘প্রকৃত আয় হ্রাস’। বর্তমানে দেশের বড় একটি জনগোষ্ঠী সেই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
বাস্তবতা হলো– দেশে বাজার ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, আমদানি ব্যয়ের চাপ, ডলার সঙ্কট ও কর কাঠামোর প্রভাব মিলিয়ে পণ্যের দাম বাড়ছে। কিন্তু আয় বাড়ার জন্য কার্যকর কোনো সমন্বিত নীতি না থাকায় সাধারণ মানুষকে পুরো চাপ বহন করতে হচ্ছে। ব্যয় বৃদ্ধিতে সঞ্চয়ের সক্ষমতা হারাচ্ছে অনেক পরিবার। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একটি বড় অংশ এখন নিয়মিত সঞ্চয়ের বদলে ধার ও কিস্তিনির্ভর হয়ে পড়ছে। এমন পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু ব্যক্তিগত জীবন নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ভোগ কমে গেলে উৎপাদন ও বিনিয়োগেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বাজারে নজরদারি জোরদার না হলে এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণ না করলে পণ্যের দাম আরো বাড়বে, এটি নিশ্চিত করে বলা যায়। পাশাপাশি এই অসহনীয় অবস্থা থেকে উত্তরণে শ্রমিক-কর্মচারীদের ন্যায্য মজুরি ও বেতনকাঠামো পুনর্বিন্যাস করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতো আমরাও মনে করি, পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারকে এক দিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, অন্য দিকে বেসরকারি খাতে বেতন ও মজুরি বাড়াতে বাস্তবসম্মত নীতিগত সহায়তা দিতে হবে। তা না হলে পণ্যের দাম ও আয়ের এ বৈষম্য সাধারণ মানুষের জীবনযাপন আরো সঙ্কটাপন্ন করে তুলবে।